ঘুমের ঘোরে রমাকে জড়িয়ে ধরল সানু।
মুখের নাল চক চক শব্দ করে গিলে ফেলল ও। খরখর করে নেংটি ইঁদুর কি যেন করছে তোরঙ্গের তলায়। মুখে হুশ শব্দ করল রমা। সানু চমকে উঠল। রমাকে জোরে আঁকড়ে ধরল।
শিরশির করছে বুকটা যেখানে সানুর মাথাটা ছুঁয়ে আছে। ওর একটু নিচেই চামড়াটা ছড়ে গেছে। একদিন বুকের কাছে, সানুর মত এমনি করে নরম তুলতুলে কাদার মত কেউ হয়তো শুয়ে থাকবে। কচি দুটো হাত দিয়ে হাতড়াবে বুকের কাছটা, ছেলেবেলায় সানু যেমন করত। মা’র কাছে ও আর ক’দিন ছিল, আমিই তো বুকে-পিঠে করে এতো বড়টি করলুম। আজ মিছিমিছি ছেলেটা মার খেল চার আনা পয়সার জন্য। কেউ জানে না তোরঙ্গগুলোর পেছনে লুকনো কৌটোটার কথা। টাকা আড়াই বোধ হয় জমেছে। গুনতে গেলেই তো দেখে ফেলবে। কালকেই সানুকে পয়সা দোব। না আর নয়। এবার ঘুম। সকাল থেকেই তো আবার কাজ। বিশ্ব চাকরি পাচ্ছে। বড় আশা, বড় কামনা করে লাভ কি। জীবন কি চায়। সুখ, নির্ঝঞ্ঝাট শান্তি, হাসি, সম্মান ব্যস। বিশ্ব টাকা আনবে। ঘর বাঁধবে। আমায় নিয়ে সংসার করবে। এবার ঘুম। এবার শান্তি। এবার ঘুম। এবার অন্ধকার। আলো নিভল। ফুল, ফুল, ফুল।
পাঁচ
চেনাশুনো কেউ আছে কিনা, খুঁজে বার করার জন্য এধার ওধার তাকাতে চায়। এতগুলো টেবিল চেয়ার, তাই চট করে চেনা মানুষদেরও খুঁজে বার করা যায় না। আলাদা করে প্রত্যেক টেবিলে নজর করতে হয়।
আবার প্রত্যেক টেবিলের লোকও, যখনই কেউ ঢোকে, ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। চেনা কাউকে দেখলে হাত তুলে জানান দেয়।
প্রথম দিন থেকেই চিনুর অস্বস্তি লেগেছিল এই খুঁজে বার করার ব্যাপারটায়। আজও ধাতস্থ হয়নি। সারা ঘরের লোক তাকিয়ে থাকে। অতগুলো চাউনি একপলকের জন্য হলেও বিব্রত করে। সকলেই বসে আর সে দাঁড়িয়ে, ফলে যেন সে একটু আলাদা হয়ে পড়ে। কিন্তু একবার বসে পড়লেই, সমান। আর আলাদা মনে হয় না।
চিনু যখন ঢুকল কেউ হাত তুলে জানান দেয়নি। ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা। দু’তিনটে টেবিল একদম খালি। আরগুলোয় দু’চারজন ক’রে।
অমল বসেছিল একটেরেয়। দক্ষিণ দিকের জানলাটার ধারে। জানলা থেকে ঝুঁকে ট্রাম রাস্তা দেখা যায়। চেয়ার থেকে দেখা যায় আকাশ আর একটা কি গাছ যেন।
দুটি ছেলে কথা বলছে অমলের সঙ্গে। চিনুকে দেখে ওরা একটুক্ষণ চুপ করল।
-আমাদের কিন্তু খুব আশা ছিল আপনি একটা দেবেন।
-বললুম তো লেখা ছেড়ে দিয়েছি।
-আবার লিখুন তাহলে। আপনারা যদি লেখা ছাড়েন,-
ছেলেটি হাসল। অমল বিরক্ত হয়ে চিনুর দিকে নজর দিল।
-তোকে খুঁজছিলুম। খুব দরকার আছে।
-তাহলে কবে নাগাদ আসব?
-বললুম তো, লেখাপত্তর ছেড়ে দিয়েছি।
স্বরটা রূঢ় শোনাল চিনুর কানে। ছেলে দুটি তবুও হাসল। নমস্কার করে চলে গেল।
-পত্রিকা বার করবে। ভগবান জানে কেন বার করবে। কবির জন্যে একটা পয়সাও খরচ করবে না। ভাবখানা এমন যেন ছাপিয়ে করবে। লিখতে যেন খাটনি নেই।
অনেকবার শোনা কথা। চিনু আলোচনাটা গায়ে না মেখে জিজ্ঞেস করল।
-দরকার কি বলছিলি!
-কিছু না, ওদের তাড়াবার জন্য বলেছিলুম।
-আর সব কোথায়?
-আসেনি। দুটো টাকা আছে, মানে যোগাড় করে দিতে পারিস? রেলওয়েতে লোক নেবে। একটা অ্যাপ্লিকেশন করব।
-কোথায় দেখলি, কাগজে?
-হ্যাঁ!
অমল চুপ করে গেল। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
-চিনু, তুইও একটা অ্যাপ্লিকেশন কর। পড়াশুনো যদি না করিস তাহলে এমন করে বসে থাকারও কোন মানে হয় না।
এটাও চিনুর অনেকবার শোনা কথা। আড্ডার হৈ চৈ-য়ের মধ্যে হয়ত কেউ বলেছে। কিন্তু আজকের শোনাটা একটু অন্যরকমের, কেন-না, অমলের বলার ঢঙ, সুর সবই আলাদা মেজাজের। চুপ করে রইল চিনু।
-এটা আমি ঠেকে শিখেছি। আর কিছু না হোক বি. এ. ডিগ্রিটার বাজার দাম আছে, সামাজিক মূল্যও আছে। তা তুই যতই নিজেকে পণ্ডিত ঠাওরাস না কেন। খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে তো হবে।
-কফি খেয়েছিস দেখছি।
চিনু টেবিলের তিনটে কাপ দেখল। জল ভর্তি তিনটে গ্লাসও রয়েছে।
-হ্যাঁ, ওরাই খাওয়াল। কেন যে ওরা কাগজ বার করে।
এক গ্লাস জল খেল চিনু। একটি মেয়ে দুটি পুরুষের সঙ্গে ঢুকল। কে যেন বলেছিল কলেজে পড়ার সময় ওর কী একটা খারাপ রোগ হয়। এখন পড়া ছেড়েছে, বাড়িতেও থাকে না। বাজি ফেলে ওকে চোখ দিয়ে কী যেন ইঙ্গিত করেছিল অমল। এক কাপ কফি পেয়েছিল।
অমল তাকিয়েছিল উঁচুতে। স্কাইলাইটগুলো দিয়ে আলো এসেছে। কাচের ধুলো ছেঁকে নিয়েছে আলোর তীব্রতা। সাদা দেয়ালে ঘা খেয়ে কতটুকুই বা আর এতবড় ঘরের অন্ধকারকে দুর্বল করতে পারে। মেয়েটি তার সঙ্গীদের নিয়ে বসল চিনুর পিছন দিকে। অমল চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিল সামান্য, যাতে চিনুর দিকে তাকাতে গেলে ওদের না দেখতে হয়।
ঘাড় ফিরিয়ে চিনু পিছন দিকে তাকাল।
-কি দেখছিস।
-আজকের দুটো নতুন মনে হচ্ছে।
-তা’তে কি হয়েছে?
অমলের সুরটা ঝাঁঝালো। উত্তর দিতে পারল না চিনু। পা দুটোকে আরো ঠেলে দিয়ে ইজিচেয়ারে বসার মত করে বসল অমল। ঘাড়টা রাখল চেয়ারের পিঠের কানায়, হাত দুটো বুকে।
-ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় একটা মেয়েকে ভালবেসেছিলুম। ওই বয়সেই বোধ হয় যথার্থ ভালবাসা যায়। মেয়েটার স্বাস্থ্য ছিল। একে দেখে মনে পড়ল।
-সাধারণতঃ তাই হয়।
-মোটাদের আমি ঘেন্না করি।
