বয়েড বোলিং মার্কে ফিরল যেন খুশিয়াল মেজাজে। হবে নাই বা কেন। সরোজ ভাবল, ওর প্রত্যয়ের যথেষ্টই কারণ আছে। বয়েড এবং রামিন্দার, দুজনেই বুঝতে পারছে ফিল্ডিং আর বোলিংয়ের মারমুখীন সামগ্রিক চাপটা একটানা বজায় রাখার প্রতিক্রিয়া এবার শুরু হয়েছে। অন্য খেলোয়াড়দের চোখে প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের সাহসের একটা মাপ থাকে। তবে গাড্ডায় পড়লেও ভয়টা অনেকখানি কাটিয়ে দিতে পারে পরিচিত পরিবেশ, এমনকী স্লিপ ফিল্ডারদের বকবকানিও ব্যাটসম্যানকে সহজ করে দিতে পারে। সরোজের ইচ্ছা হচ্ছে চেঁচিয়ে রামিন্দারকে বলে-তাড়াহুড়ো নয়, সময় নাও। চারপাশটা দ্যাখো, তাকাও। শুষে নাও তোমার বহু দেখা মুখ, চলাফেরা, রং, শব্দ, এমনকী ওই চিমনির ধোঁয়াও।
বয়েডের শেষ বলটা কোথায় পড়ল সরোজ দেখতে পেলে না, রামিন্দার পা বাড়িয়ে ঝুঁকে পড়ায়। তবে ব্যাটের কানায় লাগার আওয়াজ এবং উইকেটকিপারের নিশ্চিত উল্লাস শুনতে ভুল হয়নি। রামিন্দার আউট।
ঝুঁকে ডানদিকে তাকাল সরোজ। অভয়ঙ্করের মুখ হাসিতে ভরা। পাশের লোককে বাঁ হাতের তালু উলটে ব্যাটের মতো করে ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ আর ডান হাত দিয়ে বলটা কোথায় লেগেছিল দেখাচ্ছে।
”হি ইজ ফিনিশড।”
কথাটা কানে এল সরোজের। বুকের গভীরে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। সে দুঃখ পাচ্ছে রামিন্দারের জন্য। ব্যক্তিগত জীবন যদি সত্যিই ওর খেলার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে থাকে তাহলে শেষ হয়ে গেছে। হয়তো ওর শেষ টেস্টম্যাচটি সে দেখছে।
রামিন্দার সত্যিই কি ভীত? ওকে খুনের চেষ্টা হয়েছে অথচ জ্যামাইকায় দুটো বল বুকে একটা কপালে লাগা সত্ত্বেও সে সাড়ে ছ’ঘণ্টা ভারতীয় ইনিংসে প্রবেশের একটা দরজা বন্ধ করে রেখেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাস্ট বোলারদের কাছ থেকে। হারা ম্যাচ ড্র হয়। মাত্র দু’বছর আগের ঘটনা।
ধীরে ধীরে রামিন্দারের প্রত্যাবর্তনটি সরোজ মনে গেঁথে রাখল। ঠিক করে ফেলল আজ সে এইটাই বর্ণনা করবে। মাঠ ছাড়ার আগে ব্যাটটা চোখের সামনে ধরে সে কী যেন দেখার চেষ্টা করল তারপর অদ্ভুত একটা বোকার মতো কিংবা বলা যায় শিশুর মতো অর্থহীন হাসি হেসে সে দর্শকদের আড়ালে চলে গেল।
দীপক ঠুকরাল বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এখন দেশের সেরা। মাদ্রাজে একটা পঞ্চাশ করেছে। হাততালি বুঝিয়ে দিল, বড় রান তার কাছে থেকে পাওয়ার আশা করা হয়েছে। ভবানী, নিশ্চয় ব্যাটে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। গুরু যেন আর একটি শিষ্যের জন্য প্রতীক্ষারত। ঠুকরাল ক্রিজের কাছে পৌঁছতেই সে এগিয়ে গেল। কয়েক বার মাথা নাড়া, হাত দিয়ে ব্যস্ত না হবার ভঙ্গি এবং ভবানী আবার স্যান্ডার্সনের সম্মুখীন।
প্রথম বলটা সে কাট করল এবং থার্ডম্যানের তিন হাত দূর দিয়ে সেটা বেরিয়ে গেল তার নড়ার আগেই। পরের বলে কভারে মার্কস প্রস্তুরীভূত হয়ে থাকল। তৃতীয় বলটা ওভারপিচ এবং ফলো-থ্রুতে ব্যস্ত সান্ডার্সন হাত দিয়ে থামাতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিল। চতুর্থটি অফ স্টাম্পে ঠুকে দেওয়া এবং শর্ট মিড উইকেট বৃথাই হাত তুলে লাফাল। পঞ্চমটি গুড লেংথ এবং মিডল স্টাম্পে, ভবানী যেন জানতই এমন এক অলস ভঙ্গিতে এক পা বেরিয়ে এল এবং বলটি সাইট স্ক্রিনের দু’হাত সামনে জমিতে নামল।
ষষ্ঠটি সন্ত্রস্ত, ভীত, লেগস্টাম্পের বাইরে দিয়ে পালিয়ে গেল এবং ভবানী ফিরেও তাকাল না।
চার মিনিটের মধ্যে গ্রিন পার্ক দাউদাউ করে উঠল। হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মতো মাঠের বৃত্তটি খ্যাপা চিৎকারে ভেঙে পড়ার অবস্থায়। সরোজ কৌতূহলী চোখে দু’পাশে তাকাল। দাঁড়িয়ে উঠে দু’হাত মুঠো করে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তরুণ চিৎকার করে যাচ্ছে কিন্তু আর্তনাদের মতো একটা আওয়াজ ছাড়া মুখ দিয়ে কিছু বেরোচ্ছে না। শঙ্কর দ্রুত উঠে এসে কানে কানে বলে গেল, ”আজ অন্তত দু’ডজন ফোন আসবে।” সরোজ মাথাটা হেলিয়ে মেনে নিল। ”সিক্সটাকে কী বলব, স্ট্রেট ড্রাইভ?” সরোজ একইভাবে মাথা আবার হেলাল।
নতুন বলের ঝোড়ো দাপট এখনও প্রাণবান তবে ধীরে ধীরে সেটা একসময় স্তিমিত হয়ে আসতই। কিন্তু তার আগেই ভবানী এক ফুঁয়ে ঝড়টাকে সরিয়ে নিশ্বাস ফেলার জায়গা বার করে আনল। পাঁচটা বলে কুড়ি রান। উঁচু পর্যায়ে ব্যাট করার সময় বল ধরে ধরে নির্বাচন করে মারার ব্যাপারটা অনেকটা পুষিয়ে দেয় অত্যন্ত তীক্ষ্ন একটা সচেতনতা। সরোজ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, বড়োদরের বোলার এরপর কী করবে, সেটা ফর্মে থাকা ভালো ব্যাটসম্যান আন্দাজ করে নিতে পারে। এবং ভবানী ফর্মে রয়েছে।
মাথা নীচু করে সরোজ খাতায় লিখে যাচ্ছিল আগের ওভারে তার মনে যেসব ছবি ফুটে উঠেছিল তার বিবরণ। দাবি জানানো একটা চিৎকার এবং সেটাকে ডুবিয়ে তার পিছনে বিরাট হতাশার ধ্বনিতে সে চমকে মুখ তুলে দেখে ঠুকরাল ব্যাট ঘাড়ের কাছে তুলে পাটলের তর্জনীর বা মুখের দিকে অবিশ্বাসভরা চোখে তাকিয়ে।
”কী হল?”
”এল বি ডব্লু।” পাশের লোকটি বলল। পাঁচ নম্বরে অধিনায়ক রবি আনন্দ। হুঁশিয়ার ব্যাট। তিনটি উইকেট ৪১ রানে হারাবার পর এবার নাছোড়বান্দা কাউকে চাই ইনিংসটাকে পোক্তভাবে গাঁথার জন্য। আনন্দ যে সেই কাজের জন্যই নেমেছে সে বুঝিয়ে দিল বয়েডকে মেডেন দিয়ে।
