গ্যালারিতে গুঞ্জন উঠল। পটেল যখন এগিয়ে ফলো-থ্রুর জমির উপর চোখ বুলিয়ে স্যান্ডার্সনের দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। স্যান্ডার্সন দৃষ্টিটা অগ্রাহ্য করল।
পাশের হিন্দি কাগজের লোকটির সামনে টেবলে বাইনোকুলার পড়ে। সরোজ ‘মে আই’ বলে অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করেই তুলে চোখে রাখল। স্যান্ডার্সনের মুখটা রাগে থমথম লাগছে। মার্কস এগিয়ে এসে কী বলল। ওভারে চারটি অতিরিক্ত রান ছাড়া ব্যাট থেকে রান আসেনি।
এবার টেনশন দেখা দিয়েছে। আলভাকে একটা ঝোড়ো ওভার দিল বয়েড। আলভা স্টাইলিশ স্ট্রোক প্লের জন্য খ্যাত। বিবেচকের মতো সে ডিফেন্সিভ, সতর্ক চোখে ওভারটা শেষ করল। ব্যাকফুটে বলগুলোকে সামলেছে। ওভারে রান হল না।
এখান ওখান থেকে বিদ্রূপাত্মক টিপ্পুনি মাঠে ভেসে গেল স্যান্ডার্সন যখন আবার শুরু করার জন্য ক্যাপটা অধিকারীকে দিতে এগোল। বোলিং মার্কের থেকে একটু বেশিই সে হেঁটে গেল। রামিন্দার স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে।
সরোজের মনে হল ভুল করছে। অবশ্য ব্যাটসম্যানভেদে এটা নির্ভর করে, কিন্তু সে নিজে কখনও ফাস্ট বোলার যখন বল করার আগে ফিরে যেতে থাকে তখন তার চলার দিকে তাকাত না। অন্যদিকে থাকিয়ে থাকত বোলার যখন বল ছাড়ার আগে লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছে তখনই সে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাত। ফাস্ট বোলারের দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকতে কীরকম যেন সম্মোহক বোধ আবিষ্ট করে ফেলে।
স্যান্ডার্সন বলটা একবার নিজের কপালে ঠুকে নিয়েই ঘুরল। এবং ছুটতে শুরু করল। রামিন্দার আদৌ বলটা দেখতে পেয়েছিল কি না সরোজের তাতে সন্দেহ আছে। যদি সে কিছুমাত্রও নড়ে থাকে তাহলে নিশ্চিতই স্কোয়ার লেগের দিকেই। বলটা তার বুকে লাগতেই সে কুঁজো হয়ে বসে দু’হাতে চেপে আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। স্যান্ডার্সন তখন কোমরে হাত দিয়ে জনতার দিকে তাকিয়ে। চিৎকার তুমুলভাবে এবং গালিগালাজও।
”শালা রাতভোর ড্রিঙ্ক করেছে, খেলবে কী করে?”
সরোজ বিরক্তি চেপে বাইনোকুলারের মালিককে বলল, ”কী করে জানলে? তুমি দেখেছ?”
”জানার কী আছে, রামিন্দার হেভি ড্রিঙ্কার সবাই জানে।”
মালয়ালাম সাপ্তাহিক বিড়বিড় করল : ”ইন্টিমিডেটিং বোলিং…খুন করতে চায়।”
সরোজ মৃদু স্বরে বলল, ”পুরো দোষটাই ব্যাটসম্যানের। এ-বল কোনো টেস্ট ব্যাটসম্যান যদি খেলতে না পারে তাহলে…”
রামিন্দারকে ঘিরে ভিড় এবং শুশ্রূষার তৎপরতা শেষ হল মিনিট দুয়েকেই যখন সে বুকে হাত বোলাতে বোলাতে পায়চারি করে আবার ক্রিজে দাঁড়াল। করতালি ধ্বনি তাকে দেওয়া হল উৎসাহ বর্ধনের জন্য।
কেমন যেন নড়বড়ে মনে হচ্ছে রামিন্দারকে। সরোজ ঝুঁকে ডানদিকে তাকাল। চারটে চেয়ার পরে অভয়ঙ্কর। চোখাচোখি হতেই সে মুখভাবে জানাল-কী বলেছিলাম? তারপর হাত নেড়ে বোঝাল-শেষ হয়ে গেছে।
স্যান্ডার্সনের পরের বলটা খাড়াই লাফিয়ে উঠল। রামিন্দারের গ্লাভসে অথবা ব্যাটের হ্যান্ডেলে লেগে স্লিপের মাথার উপর দিয়ে বাউন্ডারিতে পৌঁছে গেল। উচ্ছ্বাস জানাবার ব্যাপার নয়, কিন্তু জনতা জানাল। বাকি বলগুলো শর্ট, আঘাত করার জন্যই। প্রত্যেকটাই খেলতে গিয়ে সে ফসকাল এবং কোনোক্রমে টিকে গেল।
আলভাকে বিব্রত করার জন্য ফরোয়ার্ড শর্ট লেগকে একটু এগিয়ে আনা হল, স্লিপে এল আর একজন। গ্যালারিতে একটা জটলা পাকিয়ে উঠে হইচই শুরু হয়েছে, পুলিশের লাঠি দেখা যাচ্ছে। আলভা সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে স্টান্স নিল।
বয়েডের কাছ থেকে একটা শর্ট বল এবার প্রত্যাশিত। বস্তুত একটার জায়গায় তিনটে এল। চমৎকারভাবে পিছনে হেলে আলভা বলের গতিপথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। চতুর্থ বলে সে পিছিয়ে খেলল কিন্তু বলটা ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে গলে অফ স্ট্যাম্পটাকে জমি থেকে উপড়ে উইকেটকিপারের কাছাকাছি পৌঁছে দিল। আলভা পিছন ফিরে অনুমোদনের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ব্যাটটা একবার ফাঁকা চালিয়ে ফিরে আসতে শুরু করল।
তিন নম্বর, বলাবাহুল্য, ভবানীশঙ্কর। দীর্ঘ ছিপছিপে, সপ্রতিভ। সরোজ একমত শঙ্করের সঙ্গে, গ্যারি সোবার্সের মতোই ওর চলন। দীর্ঘস্থায়ী হাততালি নিয়ে ভবানী ক্রিজে পৌঁছল। রামিন্দারকে এখন অনেকটা ধাতস্থ দেখাচ্ছে। এগিয়ে এসে কথা বলল, ভবানী মাথা নেড়ে সায় দিয়ে গার্ড নেবার পর কাছের ফিল্ডারদের উপর দিয়ে চোখ আলতো বুলিয়ে স্যান্ডার্সনের বাকি দুটি বল সহজভাবে খেলল।
মাত্র দুটি বল। সরোজের মনে হল, ছেলেটি সেই ধরনের যারা সংকটের মুহূর্তে নার্ভের ক্ষমতাকে গুছিয়ে নিয়ে কাজে লাগাতে পারে…ম্যাচের দিন সকালেও হয়তো উৎকণ্ঠায় ছটফট করে, কিন্তু মাঠে একবার পা দিলেই নিজের উপর পুরো কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়, রিফ্লেক্সে বিদ্যুতের গতি আনে। এরাই বড়ো ব্যাপারের ব্যাপারি। ওর দুটি বল খেলা থেকেই সরোজ বুঝেগেল, অন্যেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছবার আগে মনটাকে তৈরি করে নিতে যত সময় নেয় ভবানীর যেন তার থেকেও বেশি সময় হাতে থাকে এমন একটা ধারণা দর্শকদের চেতনায় ঢুকে যায়। বড়ো খেলোয়াড়রাই শুধু এটা করতে পারে।
পরের ওভারে যথাসময়ে রামিন্দার ব্যাটটা নামাতে পেরেছিল বলেই বয়েডের পাজি ইয়র্কার সামলাতে পারল। দ্বিতীয় বল বুকের সামনে থেকে ঘোরাল লং লেগে। উইকেটের মধ্যে ওর দৌড়নোটা সরোজের কেমন যেন অপরিচ্ছন্ন লাগল। একদা শর্ট রান নেওয়ায় রামিন্দারকে অনেকে বিশ্বের অদ্বিতীয় বলেছে। দুটো রান সে পড়িমরি করে পেল। বয়েড বিড়বিড় করে মাথা ঝাঁকাল। তার পঞ্চম বল লেগ স্টাম্পে পড়ে অফ স্টাম্পের বেল তুলে নেবার পূর্বমুহূর্তে অধিকারীর চিৎকার ”নো-বল” প্রতিধ্বনিত হল। বয়েড দ্রুত ঘুরে অধিকারীকে কিছু একটা, নিশ্চয় খারাপ কথা, বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল।
