”কোথায় আছে কামদার?”
”জানি না।”
”আর নয়, এবার কেটে পড়ি।” সরোজের সঙ্গে সঙ্গে অভয়ঙ্করও বেরিয়ে এল।
সিঁড়ির কাছে এসে সরোজ ”ওহ ভুলে গেছি, এক মিনিট।” বলেই শঙ্করের ঘরে ফিরে এল।
”তরুণ রাম এনেছে, কাবাব কিছুটা শেয়ার করব।”
সরোজ দুটো দশ টাকা নোট টেবলে রাখল।
”একী একী! না না সরোজদা…”
”কোনো আপত্তি নয়, দাদা দিলে নিতে হয়।”
সরোজ দ্রুত বেরিয়ে সিঁড়িতে অপেক্ষমাণ অভয়ঙ্করের কাছে এসে বলল, ”ওর কলমটা আমার কাছে রয়ে গেছল।”
”ছেলেটা কেমন?”
”ভালো।”
”ঘোষালের খুব বন্ধু।”
”হ্যাঁ।”
হোটেলের ঘর অন্ধকার ছিল। আলো জ্বেলে দেখল মান্না গভীর ঘুমে। নিঃশব্দে সে পোশাক বদলে বিছানায় উঠল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে বীণার মুখটা চোখে ভেসে এল। একটু পরে সে-ও ঘুমিয়ে পড়ল।
চার
ভারত টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রবি আনন্দ ঝুঁকি নিয়ে বীরত্ব দেখাবার মানুষ নয়। তা ছাড়া, গ্রিন পার্ক উইকেটে নতুন বলে পনেরোটা ওভার কাটিয়ে দিতে পারলে একটু ধৈর্যবান প্রথম শ্রেণির ব্যাটসম্যান ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত খেলে যেতে পারবে এই নিউজিল্যান্ড বোলিংকে।
দুই আম্পায়ার, পুনার নন্দন অধিকারী আর আহমেদাবাদের ছটু পটেল মাঠে নেমেছে তাদের পিছনে জেরি মার্কস আর তার দল। অধিকারীর এটা প্রথম টেস্টম্যাচ।
ফুটবল টিমের মতো নিউজিল্যান্ডাররা মাঠে নামল। একসঙ্গে ছুটে উইকেটে পৌঁছে হাত তুলে দর্শকদের অভিবাদন জানিয়ে, কেউ ছোটাছুটি, কেউ ব্যায়াম শুরু করল। ফিটনেসে যেন টইটম্বুর। সরোজের কাছে মজা পাবার মতো ব্যাপার এটা। এর আগে এমন করে কোনও টেস্ট দলকে সে নামতে দেখেনি। গুরুগম্ভীর চালে ক্যাপ্টেন আস্তে আস্তে হাঁটবে, হাতের বলটা বড়োজোর সামান্য লোফালুফি করতে পারে! তার কয়েক হাত পিছনে টিমের অন্যান্যরা। এটাই রেওয়াজ ছিল। আর এখন? বদলে যাচ্ছে ক্রিকেটের হালচাল। অস্থির, অশান্ত, ছটফটে ভঙ্গির দ্বারা এখনকার ছেলেরা ব্যাপারটাকে উত্তেজক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চেহারা দিচ্ছে। টিভি আর বিজ্ঞাপনের টাকা এটা করিয়েছে।
সরোজ এক্সারসাইজ বুক খুলে প্রথম পাতায়, তারিখ, বার, সময় লিখে অপেক্ষা করতে লাগল ভারতের দুই ওপেনারের মাঠে নামার জন্য।
প্যাভিলিয়নের দিকে সাইট স্ক্রিনের পাশে জমি থেকে চওড়া রকের মতো চার-পাঁচটা ধাপ, তাতে টেবল চেয়ার পাতা, মাথায় শামিয়ানা। টেবলে পিন দিয়ে আঁটা কার্ডে কাগজের নাম লেখা। এই হল প্রেসবক্স। দ্বিতীয় ধাপে সরোজের দু’পাশে স্থানীয় হিন্দি কাগজে দুজন আর মাদ্রাজের ইংরেজি দৈনিক ও ত্রিবান্দ্রামের মালয়ালি সাপ্তাহিক। পিছনে সর্বোচ্চচ ধাপে দুটি সাহেব আর বোম্বাই দিল্লির ইংরেজি দৈনিক। অভিজাত শ্রেণি হিসাবে ওই ধাপটা গণ্য হবে। লাঞ্চ এবং টি-এর পাঁচটি কুপন একজন নাম মিলিয়ে মিলিয়ে বিতরণ করে গেছে।
কে নামবে আলভার সঙ্গে? আজ প্রেসবক্সে পৌঁছে, অন্যান্যদের সঙ্গে ”হ্যালো, হাউ আর ইউ”গুলো সারতে সারতে সরোজ শুনেছিল রামিন্দার নাকি ওপেন করতে চাইছে না। থ্রি ডাউন নামতে চায়।
”সরোজদা, শুনেছেন নাকি কিছু কেন রামিন্দারা ওপেন করতে চাইছে না?” তরুণ উঠে এসে ফিসফিস করে জানতে চাইল।
”না, আমি তো এই প্রথম শুনেছি। তুমি কিছু জানো কি?”
”না। শঙ্কুকে দেখছি না বোধহয় ভবানীর কাছে গেছে। ও এলে হয়তো ঠিক খবর পাওয়া যাবে।”
তরুণ পিছনের ধাপে ডানদিকে নিজের চেয়ারে ফিরে গেল।
মাঠ ঘিরে তুমুল হাততালি, চিৎকার শুরু হতেই সরোজ গলা উঁচিয়ে দেখল আলভা আর রামিন্দার নামছে। শঙ্করও সেই সময় নিজের চেয়ারে এসে বসল।
প্রথম ওভার খেলবে রামিন্দার। মিল এন্ড থেকে বল করবে বয়েড। গরম রোদ, ফুরফুরে বাতাস। আমেজটা শীতের। মাঠের আলো যথেষ্টই। প্রেসবক্সের শামিয়ানাটা না থাকলে ভালোই লাগত। এই সময় বীণার শালটা গায়ে জড়াতে পারলে মন্দ লাগত না। কিন্তু সে ঠিক করে ফেলেছে, ব্যবহার করে শালটাকে ময়লা করবে না। হাতাওলা সোয়েটারেই চালিয়ে নেবে।
বয়েডের প্রথম বল শর্ট লেংথ, অফের বাইরে এবং যথেষ্ট জোরে। রামিন্দার ছেড়ে দিল। লাইন এবং লেংথ খোঁজার সন্ধানটা বয়েড চালিয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার সম্মতি ছাড়াই বলটা বেশি সুইং করে যাচ্ছে। রামিন্দারকে ঈষৎ অস্বচ্ছন্দ মনে হল। কোনো রান হল না প্রথম ওভারে।
মার্কস বলটা ছুড়ে দিল থার্ডম্যান থেকে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসা স্যান্ডার্সনের উদ্দেশে। সরোজ নড়েচড়ে বসল। ছেলেটি বাঁ হাতে জোরে বল করে। এখন নাকি বিশ্বের সবথেকে দ্রুত। প্রথম বল ফুলটস। আলভা বলটা ঘুরিয়ে দিয়ে থার্ডম্যান থেকে একটা রান নিল। রামিন্দারও একইভাবে একটা রান পেল। ওভারটা শেষ। বয়েড এবার রামিন্দরকে। কিছুটা অনিশ্চিতভাবে রামিন্দার ওভারপিচ হওয়া বলগুলোকে খেলল। এবার স্যান্ডার্সনের সামনে আলভা। প্রথম বলেই একটা রান প্রথম ও দ্বিতীয় স্লিপের মধ্য দিয়ে। রামিন্দার এগিয়ে এসে গুডলেংথ জায়গাটায় ঝুঁকে দেখছে। দু-তিনবার ব্যাট দিয়ে ঠুকল। স্যান্ডার্সন মাথা নেড়ে যেন কিছুর অনুমোদন জানাল। ওভারটা সে শেষ করল দশটা বলে।
পর পর তিনটে নো-বল ডাকল অধিকারী। তৃতীয় ডাকের পর স্যান্ডার্সন অধিকারীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকিয়ে নিয়ে বল করতে ফিরে গেল। রামিন্দার বল তিনটি খেলার চেষ্টা করেনি। চতুর্থটা এতবড়ো ওয়াইড হল যে সোজা থার্ড স্লিপ বলটা পেল।
