”আরে বাবা সব খবর সব জায়গায় পাওয়া যায় যদি ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে কান রাখতে পারো। লাস্ট ইয়ারে রঞ্জি ফাইনাল খেলতে বোম্বাই যখন দিল্লি গেছল তখন ওখানেই প্লেয়াররা সবাই জেনেছিল। রামিন্দার আর পারবে না।”
”ব্যাপারটা কী?”
সরোজের মনে হল কথাগুলো শোনা দরকার সেজন্য এদের দলে ভিড়লে ওরা স্বচ্ছন্দ হবে। টেবলে দুটো বাড়তি গ্লাসের একটা তুলে নেবার সময় একটা কাবাব মুখে ফেলল। শঙ্কর ব্যস্ত হয়ে গ্লাসে রাম ঢেলে দিল, একটু বেশিই। খালি গ্লাস দুটোতেও ঢালতে গেল। তরুণ আর অভয়ঙ্কর একসঙ্গে জানাল আর তারা খাবে না।
”তরুণদা আগাম সেলিব্রেট করছেন ভুবুর সেঞ্চুরির, সরোজদা জল না সোডা?”
”নিশ্চয়। হোক সেঞ্চুরিটা আবার খাওয়াব। একটা বাঙালি ছেলে কতদিন পর যে…সত্যি বলতে কী এইবার প্রেসবক্সে একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারব। এতকাল তো দিল্লি বোম্বাই মাদ্রাজই শুধু জ্যাঠামশাই হয়ে থেকেছে।”
সরোজ জল ঢেলে গ্লাসটা ভরতি করে বড়ো চুমুক দিল। ”রামিন্দারের কী হল, পারবে না কেন?”
”ও যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে তখন ওর বউ একজনের সঙ্গে অ্যাফেয়ার শুরু করে। এ বিগ সিন্ধি বিজনেসম্যান। ফিরে এসে রামিন্দার জানতে পেরে ভীষণ শকড হয়।”
অভয়ঙ্কর কাবাবের জন্য ঝুঁকল। সরোজ প্লেটটা তুলে এগিয়ে ধরল। দুটো তুলে নিয়ে অভয়ঙ্কর বলল, ”আচ্ছা বানিয়েছে কিন্তু।”
”আনাচ্ছি আর একটা।”
শঙ্কর দরজা খুলে বেরোল। সরোজ জিজ্ঞাসু চোখে অভয়ঙ্করের দিকে তাকাল।
”বউকে ঘরে বন্ধ করে রাখল, হুইপ করল কিন্তু বউ আর বদলাল না, সে-মেয়ে গোঁ ধরেই রইল- রামিন্দারের সঙ্গে থাকবে না। জানোই তো কীরকম ক্রুড, রাফ, আনএডুকেটেড আর বদরাগি। কন্টিনিউয়াস সাত দিন বউকে না খেতে দিয়ে রেখেছিল, এক গ্লাস জল পর্যন্ত নয়।
”এসব খবর কোথা থেকে কী করে পেলে?” তরুণের চ্যালেঞ্জ জানাবার ভঙ্গিটা আসলে উসকানিই।
”আরে বাবা বলেছি না, দিল্লির ক্রিকেটার সার্কলে সবাই জানে।…বউ একদিন পালিয়ে সোজা তার প্যারামারের কাছে চলে যায়, সে তাকে দিল্লির বাইরে একজায়গায় লুকিয়ে রাখে। এদিকে রামিন্দার সেই বিজনেসম্যানের অফিসে গিয়ে রিভলভার দেখিয়ে বলে, বউকে বার করে দাও। অফিসে হইচই কাণ্ড, পুলিশ এসে রামিন্দারকে অ্যারেস্ট করে। সে মামলা এখনও মেটেনি। যাই হোক, লোকটা চেয়েছিল রামিন্দার ডিভোর্স করুক, ও একদমই রাজি নয়। এরপর দু’বার অ্যাটেম্পট হয়েছে ওর লাইফের উপর। প্রথমবার ওর দুটো পাঁজরা ভাঙে স্কুটার অ্যাকসিডেন্টে, আকবর রোডে একটা ট্রাক এসে ধাক্কা মেরেছিল। দ্বিতীয়টা বিড়লা মন্দিরের কাছে রাত্রে গুন্ডারা পিটিয়েছিল, কাগজে এসব বেরোয়নি, দু’মাস হাঁটুতে প্লাস্টার নিয়ে বিছানায় ছিল। এখন ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটায়, কখন-যে আবার অ্যাটেম্পট হবে।”
”অভয়ঙ্কর বলছে এজন্যই ও খেলতে পারছে না, আর পারবেও না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে ওর ব্যাটিং টেকনিকটাই ভুল।” তরুণ অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে সরোজের দিকে তাকাল।
”তিন হাজারের ওপর রান পেয়েছে ভুল টেকনিকে?”
”তখন সাইড অন ব্যাট করত কিন্তু যখন থেকেই ও স্টান্স বদলাল, টু আইড, চেস্ট অন খেলতে শুরু করল তখন থেকেই ট্রাবলে পড়ল।”
সরোজ বিরক্ত বোধ করল। এইসব পণ্ডিতি কথাবার্তা তার কাছে হাস্যকর লাগে। মাদ্রাজ থেকে তরুণের একটা রিপোর্টে পড়েছিল, ম্যাকগ্রেগরের ব্যাটিং গ্রিপে ভুল আছে বলে স্লিপে দু’বারই ধরা পড়েছে। লোকটার ন’টা সেঞ্চুরি আছে টেস্টে।
গ্লাসটা শেষ করে টেবলে রাখা মাত্রই তরুণ সেটায় আবার ঢালার জন্য বোতলটা তুলে নিল। সরোজ স্মিত চোখে তাকিয়ে। শঙ্কর ঘরে ঢুকে বলল, ”এখুনি আনছে।”
”সব থেকে ট্র্যাজিক ব্যাপার হল”, অভয়ঙ্কর গলা নামিয়ে বলল, ”রামিন্দার দিল্লি থেকে পালাতে চায়। বোর্ডের কাছে পারমিশন চেয়েছিল হায়দরাবাদে খেলার জন্য, পারমিশন পায়নি।”
সরোজ লক্ষ করল তরুণের মুখ। ওর কাছে এটা একটা খবর। নিশ্চয় কাল স্টোরি করবে।
”যেজন্য এত ঝামেলা সেই ডিভোর্সটা দিয়ে দিলেই তো হয়, গন্ডগোল আর থাকবে না। আমি হলে তাই করতাম।”
শঙ্কর এককথায় রামিন্দার সমস্যা মিটিয়ে দেবার পথ বাতলাল।
”তুমি এই পাঞ্জাবিকে জানো না শঙ্কু।” অভয়ঙ্কর নিচু গলাতেই বলল, ”ভীষণ রিভেঞ্জফুল। ও একদিন বদলা নেবেই। বউকে যদি খুন করে তাহলে আশ্চর্য হব না।”
একসময় আলোচনা ভবানীশঙ্কর, ফরজন্দ আলি, ভাণ্ডারকর, রেডিয়ো কমেন্টেটর ইত্যাদি ছুঁয়ে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে চলে আসতে তরুণ ঘুম পাচ্ছে বলে উঠে গেল। আর এক প্লেট কাবাব এল। অধিকাংশ শেষ করল সরোজ।
”সরোজদা আপনি একটু হুঁশ রাখবেন।” অভয়ঙ্কর হাসি টিপে রেখে বলল।
”কেন?” ভ্রূ কুঁচকে সরোজ বোঝার চেষ্টা করল।
”আপনার গ্রেট ফ্রেন্ড এসেছে…কমলা টাওয়ারে ঢুকতে দেখলাম…কামদার।”
”সেরেছে।” ভয় পাওয়া ভাব চোখে মুখে ফুটিয়ে সরোজ উঠে দাঁড়াল। এম এস কামদার একদা তিনটি সরকারি ও আটটি বেসরকারি টেস্ট খেলেছেন। বয়স এখন সত্তর। ছোটো ছোটো কাগজের জন্য টেস্টম্যাচ রিপোর্ট করার ইচ্ছায় প্রথমে তিনি কাগজের সম্পাদকদের জ্বালিয়ে মারেন এবং তিন-চারটি কাগজের বরাদ্দ নিয়ে প্রেসবক্সে এসে সাংবাদিকদের ব্যতিব্যস্ত রাখেন। যা টাকা পান তাতে টেস্ট কেন্দ্রে যাওয়া থাকা-খাওয়ার খরচটা উঠে যায়। তবে অনেক জায়গাতেই চেনাশোনা লোকের বাড়িতে ওঠেন আর খাওয়াটা এর-ওর ঘাড় দিয়ে সেরে নেবার চেষ্টায় থাকেন। ওর প্রধান দুর্বলতা, মদ্যপানে। সামান্য পান করেই মাতাল হয়ে চেঁচামেচি আর গালিগালাজ শুরু করে দেন। কেউ খাওয়াবে বললে এই বয়সেও মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে রাজি।
