হোটেলে রিসেপশনে চাবি চেয়ে জানল মান্না চাবি নিয়ে উপরে গেছে আধঘণ্টা আগে। তিনতলায় এসে বন্ধ দরজায় টোকা দিল। ভিতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে, দরজার তালার হাতলটা মুচড়ে ঠেলতেই খুলে গেল।
ঘরে আলো জ্বলছে। আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে মান্না, হয়তো ঘুমোচ্ছে। বাড়তি একটা লোহার ফোল্ডিং খাট, তাতে বিছানা।
সরোজ জুতো না খুলেই খাটের বাইরে পা দুটো বার করে রেখে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। মিনিট পাঁচেক পর খসখস শব্দ হতে মুখ ফিরিয়ে দেখল মান্না বগল চুলকোচ্ছে।
”আপনি বাইরে খেতে যাবেন নাকি ঘরে বসে হোটেলের খাবারই খাবেন?”
মান্না জবাব দিল না। চুলকুনি বন্ধ করে আবার নিথর হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর মান্নার গলা কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে এল, ”শরীর ভালো নয়।”
”যে-কাজে বেরিয়েছিলেন হয়েছে?”
”অনেকটা।”
সরোজের মনে হল লোকটি কথা বলতে অনিচ্ছুক। আর কিছু সে জানতে চাইল না। টেবলে ইংরেজি খবরের কাগজ দেখে সে হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে প্রথমেই খেলার পাতায় চোখ বোলাল।
বিমান থেকে নামা নিউজিল্যান্ডারদের গ্রুপফোটো, প্রত্যেকের গলায় মালা। ভারতীয়রা একদিন আগে এসেছে তাই আর গ্রুপফোটো নেই। নেটে ব্যাট করা ভবানীর ডাবলকলাম ছবি। ছেলেটাকে এখন খবরের কাগজ ধরেছে। বহু কাল পর একটা নতুন মুখ পেয়েছে, তা ছাড়া ওর আসাটাও নাটকীয়। ডেবুতেই ডাবল সেঞ্চুরি, ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম। বদ্ধ ডোবায় বড়ো একটা পাথর ফেলে যতটা তরঙ্গ তোলা যায়, ভবানী তা করেছে। রামিন্দরেরও একটা।
ছবি, ব্যাট হাতে চেয়ারে বসে। তলায় লেখা : এটাই কি ওর শেষ টেস্ট? নাকি গ্রিন পার্ক দেবে ওকে সবুজ জীবন? সরোজের মনে হল, রামিন্দরের চোখে উদ্বেগ আর শঙ্কা যেন লুকোনো নেই। সরোজ কাগজটা রেখে আবার পাশে তাকাল। মান্নার কপালটুকু কম্বল থেকে বেরিয়ে।
”হয়েছে কী?”
”কিছু না।…ঠান্ডা লেগেছে।”
”আচ্ছা আপনি কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?”
সরোজ নাক কুঁচকে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিল।
”না তো!”
কম্বল নামিয়ে রবীন মান্না হাসিমুখ বার করলেন।
”একটা এক্সপেরিমেন্ট করলাম…বিয়ার খেয়েছি তার গন্ধ পান কি না।”
”য়্যাঁ!….কতটা? কখন খেয়েছেন?”
”দুপুরে, এক গ্লাস। ওরা ধরে পড়ল খেতেই হবে। বড্ড স্ট্রেস আর স্ট্রেইন যা কাজ আমার। তাহলে গন্ধ পাননি। ঠিক বলছেন?”
”একদম নয়।”
”আসলে কী জানেন, কলকাতায় একবার খেয়ে বাড়ি ফিরতেই বউ যা শুরু করে…কান্নাকাটি, আমার মাকে ডেকে এনে… সে এক এলাহি ব্যাপার। গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করালে আর ছুঁতে পারবে না। আরে মশাই আমি কি কচি খোকা? মাঝেমাঝে ঠিকই চালিয়েছি, ধরতে পারেনি।”
”নিজের পয়সায় খান না পার্টি খাওয়ায়।”
সরোজ অত্যন্ত স্বাভাবিক নিরুৎসুক স্বরে বলল যেন মান্না আহত না হয়। লোকটার কৃপাতেই তো ঘরে আশ্রয় মিলেছে!
”এমনভাবে ধরে-না কী বলব!” মান্না কম্বল ছুড়ে উঠে বসল উত্তেজিত হয়ে। ”আমি জানি এটা অন্যায়। লোকগুলো সুবিধা নেবে বলেই খাওয়ায়। কিন্তু কী জানেন, খেতে বেশ ভালোই লাগে। মনটাও বেশ ভালো হয়ে যায়। তবে ওই মাপা এক বোতল বিয়ার। গড়ের মাঠে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, ছোটো এলাচ দেওয়া মিঠে পান মুখে দিয়ে তবে বাড়ি ফিরি।”
”এখানে তো বউ নেই একটু বেশি খেতে পারতেন?”
”না না মাতালটাতাল হয়ে শেষে কেলেঙ্কারি করে ফেলব। তবে আমি একটা ব্যাপার ঠিক করে রেখেছি, যতদিন চাকরি করছি ততদিনই, তারপর আর ছোঁব না।”
”তার মানে খাওয়াবার লোক যখন আর পাবেন না…”
”দ্যাটস ইট। নিজের পয়সায় এসব বিষ আর খাব না। উফফ ঠিক ধরেছেন তো, এই না হলে রিপোর্টার।
সরোজ ঘড়ি দেখল। শঙ্কর কী বলেছিল সেটা মনে করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে গেল। ও আসবে না আমি যাব ওর হোটেলে? কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করে স্মৃতির টুকরোগুলোকে জোড়া দিতে ব্যর্থ হয়ে সে উঠে পড়ল।
”খেতে চললেন?”
”হ্যাঁ। আপনি তো ঘরেই থাকবেন?”
”অম্বলের মতো হচ্ছে, বড্ড বেলা করে রুটি আর মাংস খেয়েছি।”
”যদি কেউ আসে তো বলবেন সঙ্গম হোটেল হয়ে ফুটু-তে গেছি। মনে থাকবে?”
”নিশ্চয়।”
মিনিট চারেক হেঁটে সরোজ সঙ্গমে পৌঁছল। দোতলায় উঠে শঙ্করের ঘরের দিকে যেতে যেতেই শুনতে পেল বন্ধ দরজার ওপারে খুব চড়া গলায় কথা হচ্ছে। কেউ যেন কিছু একটা বোঝাতে চাইছে, আর কেউ যেন তা মানতে চাইছে না।
দরজায় টোকা দিতেই ভিতর থেকে শঙ্করের গলায় ”কাম ইন” শুনে সরোজ নব ঘুরিয়ে পাল্লা খুলল।
তিনটি লোক। শঙ্কর, তরুণ আর অভয়ঙ্কর। টেবলে রামের বড়ো বোতল তার তিন-চতুর্থাংশ খালি। টেবলে দুটি খালি গ্লাস এবং শঙ্করের হাতে একটি। দুটি প্লেটে কাবাব আর কাঁচা পেঁয়াজ, লংকা, শশা।
”ইয়া সরোজদা, আসুন আসুন। সরি আপনার ওখানে যেতে পারিনি। দেখতেই পাচ্ছেন…গ্লাস নিন একটা।” শঙ্কর দু’হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল।
”এত চেঁচাচ্ছিল কে, অভয়ঙ্কর?”
”সরোজদা আপনি তো প্রবীণ লোক, অনেক প্লেয়ার দেখেছেন, রঞ্জি ট্রফিতেও খেলেছেন।” তরুণ চেয়ারে সিধে হয়ে বসল। ”আচ্ছা বলুন তো রামিন্দর রান পাচ্ছে না কেন?”
”আমি জানি তাই বলেছি ওর মেন্টাল ডিজেস্টার ঘটেছে।”
”তুমি বোম্বাইয়ের লোক আর রামিন্দরের বাড়ি দিল্লি, ওর ঘরের এসব খবর পেলে কী করে?” তরুণের এই গলাই সরোজ বাইরে থেকে শুনেছে।
