”ভবানী আর কী বলল রামিন্দার সম্পর্কে?”
”ওর সঙ্গে তেমন কথা বলে না, নিজের ঘরে কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে শুয়েই থাকে।”
”এগুলো তুমি লিখো। রামিন্দার খুবই ভালো ব্যাটসম্যান, ব্যাড প্যাচ সকলেরই আসে, ওরও এসেছে, আবার ঠিক বেরিয়ে আসবে।”
সরোজ দেখল তরুণ লাহিড়ী তার দিকেই আসছে। নাদুসনুদুস, ফরসা, বেঁটে, নস্যি রঙের স্যুট আর মেরুন টাই।
”সরোজদা কোথায় উঠেছেন, মধুছন্দায়? আমি ওর পিছনেই সঙ্গমে, আপনার ওখানে ঘর খালি থাকলে বলবেন।”
”শঙ্করও সঙ্গমে, ওকে চেনো তো?”
শঙ্কর হাত বাড়িয়ে দিল।
”শঙ্কর গ্রুবাল, নিউজ ডে।”
”তরুণ লাহিড়ী, প্রত্যহ। আপনাকে কোথায় দেখেছি যেন, বোধহয় স্টেট অ্যাথলেটিকস মিটে!”
তরুণের তালু থেকে হাতটা ছাড়িয়ে শঙ্কর হাসল মাত্র। নিজেকে ভারিক্কি দেখাবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।
”কিছু পেলেন-টেলেন?”
”নাহ, তুমি?”
”সবাই সুস্থ আছে। পারিখের ডান হাতের কেড়ে আঙুলটা ফিল্ড করতে গিয়ে লেগেছিল, এখন ঠিক আছে। ওদের প্র্যাকটিসে আসার কোচটা দেরি করে হোটেলে গেছল, আর কী! ও হ্যাঁ, ভবানীশঙ্করকে মেয়েরা ছেঁকে ধরছে সই নেবার জন্য…ওহ বহুদিন পর একটা বাঙালি টেস্ট খেলছে, শুধু খেলাই নয়, রীতিমতো দাপটে…পিচটা দেখে আপনার কী মনে হল? গ্রাউন্ডসম্যান তো বলল থার্ড ডে থেকে বল ঘুরবে।”
”তোমার কী মনে হচ্ছে?”
”তাই মনে হল।”
”তাহলে তাই লিখে দাও।”
”ভুবু সম্পর্কে কী লিখবেন?”
শঙ্কর গম্ভীর স্বরে জানতে চাইল তবে চোখ উদ্বিগ্ন। ও-যেন ভবানীশঙ্করকে ইজারা নিয়েছে, ভালোমন্দ প্রচারের দায়টাও।
”এখানে রান পাবে।”
”বলছেন?”
তরুণ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠে বলল, ”পাবে না মানে, আলবাত পাবে। দেখুন আবার ও সেঞ্চুরি করবে।”
”বাজি?”
”নিশ্চয়, দশ টাকা।”
”বেশ।”
শঙ্কর খুশি। বন্ধুর উপর আস্থা যে দেখাবে তাকেই ওর পছন্দ।
”রাতে কী করছেন, আসুন না আমার ঘরে, একটা ছোটো রাম আছে।”
”শঙ্কু আমি এবার টেলিগ্রাফ অফিসে যাব, ওখান থেকে হোটেলে, তিনতলার এগারো নম্বর, ঘরেই থাকব। তরুণ চলি।”
মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় দেখল, ভবানীশঙ্কর মাঠটা চক্কর দিয়ে জগ করছে। খেলার ব্যাপারে ছেলেটা সিরিয়াস। সরোজের ভালো লাগল।
ইংরেজি অক্ষরে বাংলা, তা-ও পরিচ্ছন্ন বড়ো হাতের, লিখতে একটু বেশিই সময় লাগে। টাইপটা জানলে সুবিধা হত। সরোজ প্রথমে বিব্রত বোধ করত, বিরক্তও। কয়েকবার ইংরেজিতেই রিপোর্ট পাঠিয়েছিল কিন্তু বার্তা সম্পাদক আপত্তি করেন। ”রোমানে পাঠান। প্রত্যেকের নিজস্ব একটা লেখার স্টাইল থাকে। ইংরেজি থেকে তর্জমা করলে সেটা নষ্ট হয়ে যায়।” এই ছিল তাঁর প্রধান যুক্তি। সরোজ বলেছিল, রোমানে রিপোর্ট পাঠালে অন্য ধরনের অসুবিধাও যে আছে। ”ধরুন, কথাটা কাঠ হয়ে গেল। আমি কাঠ লিখলাম ইংরেজিতে কে এ টি। সেটা বাংলায় হত, কাত! ব্যাপারটা বোঝাই গেল না বা অন্য মানে হয়ে গেল।”
জবাব পায়, ”ওরকম একটু-আধটু তো হতেই পারে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।”
সরোজ প্রায় এক কলাম লিখল টেস্ট ম্যাচের নির্বাচকদের ও দল গড়ার, পিচের চরিত্র এবং ফলের সম্ভাবনা নিয়ে। নিউজিল্যান্ডের কারুর সম্পর্কে তার চাক্ষুষ ধারণা নেই। তাদের এড়িয়ে গেল। ফরজন্দ সম্পর্কে দুটি প্যারা আলাদাভাবে লিখল। লেগ স্পিনার চাই সাহেবদের বধ করতে আর এই ছেলেটির মধ্যে সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নির্বাচকরা কি সাহসী হবেন ওকে খেলাতে?
সম্ভাবনা শব্দটা বসিয়ে সে ভেবেছিল, এতটা বলা কি ঠিক হল! ফরজন্দকে সে কখনও ম্যাচে দেখেনি। তারপর ভাবল, সবাই বলছে, উইকেটও প্রচুর পেয়েছে। গত মরশুমে বোম্বাইয়ের তেরোটার মধ্যে, আটটা উইকেট ওরই ছিল। এলেম না থাকলে কি হয়? রামিন্দারের সম্পর্কে লিখল, নিশ্চয় রানে ফিরে আসবে। কানপুর পিচ ওর ভাগ্য ফিরিয়ে দেবে। এই মাঠে ওর দুটো সেঞ্চুরি আছে, ইত্যাদি।
ভবানীশঙ্করকে নিয়ে একটু মুশকিলে পড়ল। কিছুই জানে না। বাঙালি সেন্টিমেন্টে যা সুড়সুড়ি দেবে এমন জিনিস লিখতে তার আগ্রহ নেই। ওসব তরুণ লাহিড়িদের ব্যাপার। লোভ হল শঙ্করের কাছে শোনা ঘটনাটা লিখে ফেলার। কিন্তু নিরস্ত হল। এসব খেলো জিনিসের সঙ্গে খেলার কী সম্পর্ক?
সরোজের মাথা গরম হয়ে উঠল। এই সব আজেবাজে ব্যাপার লিখে লিখেই ওদের সিনেমা স্টারদের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খেলোয়াড়রা শ্রদ্ধা পাবে মাঠের মধ্যে তাদের কাজকর্মের গুণে। মচমচে তেলেভাজার মতো তাদের মাঠের বাইরের কীর্তিকলাপগুলোকে খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনে সাজিয়ে খদ্দের ধরার যেন একটা হুজুগ এসে গেছে। এসব তার দ্বারা হবে না।
লেখাটা জমা দিয়ে সরোজ যখন রাস্তায় এসে দাঁড়াল তখন বিকেল প্রায় শেষ। সে হোটেলের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল। টেস্ট ক্রিকেট খেলা হবে কিন্তু ঘরমুখো সাধারণ মানুষজনের মধ্যে তার কোনও প্রতিক্রিয়াই নেই। ঠিকই, কেন থাকবে? সরোজ নিজেকেই জবাব দিল। ক্রিকেট সে ভালোবাসে, নয়তো একসময় গভীরভাবে খেলেছিল কেন? কিন্তু এখন তার মনে হয়, এটা এদেশে বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। এখন যেন পাঁচ দিনের দুর্গাপুজোর মতোই পাঁচ দিনের এই টেস্টম্যাচ। হইচই ছাড়া আর কিছু নয়। পিকনিকের মতো ব্যাপারটা। খাবার নিয়ে সকালে বেরিয়ে পড়া, সারা দুপুর রোদে বসে কিছু একটা অঘটনের জন্য অপেক্ষা। তারপর ফিরে যাওয়া। এত বছর ভারত খেলছে অথচ একটা ফাস্ট বোলার বেরিয়ে এল না। বিদেশে গিয়ে পরের পর শুধু হেরে আসা। অথচ তাই নিয়ে এইসব হুজুগেদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কাজকর্ম ফেলে পাঁচ দিন ধরে মাঠে বসে কী পায়? সেই তো একঘেয়ে ঠুক-ঠুক। নিস্তেজ পিচে একই ধরনের বল। অবধারিত একটা ড্র। আর নানান বিশেষণে ভূষিত করে তাকে প্রশস্তি গাইতে হবে যদি কেউ সেঞ্চুরি করে ফেলে বা পাঁচটা উইকেট পায়।
