”আপনি আবার এসব লিখে দেবেন না তো? দেখুন আপনাকে বিশ্বাস করে বলে ফেলছি তারপর…।”
”আরে না না, আমি এসব ব্যাপার নিয়ে কখনও লিখি না।”
”তারপর ভুবু মেয়েটাকে নিয়ে সবে বিছানায় ঝাঁপিয়ে…আর সেই সময়ই ঘরের বেল বেজে উঠল।”
শঙ্কর হতাশার ভঙ্গিতে কাঁধ আর হাত দুটো ঝুলিয়ে মাথা হেলিয়ে দিল। সরোজ বুকের মধ্যে হালকা বোধ করল।
”লন্ড্রির লোক এসেছিল ফরজন্দের প্যান্ট ডেলিভারি দিতে। ও তো ওদিকে দরজা বন্ধ করে কমোডের ওপর বসেই আছে। ভুবু দরজা ধাক্কিয়ে বার করল। মেয়েটা চলে যাবার পর ও ভুবুকে বলতে লাগল, এসব কোরো না, এসব করলে খেলা নষ্ট হয়, তুমি ট্যালেন্টেড, সবে টিমে এসেছ এখন শুধু বড়ো রান পাবার জন্য কনসেনট্রেট করো, হেলথের দিকে নজর রাখো। ভুবু ওকে এক ধমক দিয়ে বলেছে, জ্যাঠামো করতে হবে না, আগে টেস্ট খেল তারপর উপদেশ ঝাড়বি।”
সরোজ শুনতে শুনতে তাকিয়েছিল নেটের দিকে। নাগাড়ে বল করে যাচ্ছে ফরজন্দ আলি। রিস্ট স্পিনার, ক্ল্যাসিকাল ডেলিভারি। বাঁ কাঁধটা ব্যাটসম্যানের দিকে, মাথাটা ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তোলা বাঁ হাতের পাশ দিয়ে তাকাচ্ছে, ডান হাতটা একটা চাকার বেড় নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে, পিচ থেকে বাউন্স পাচ্ছে ওর বল। ডেলিভারির পরই মুখে উদ্বিগ্নতা। বলটা তার উদ্দেশ্যমতো কাজ করেছে কি না তাই নিয়ে ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার বয়স কম, মাত্র কুড়ি।
লেগস্পিনারকে এই বয়সে টেস্টে নামিয়ে দেওয়াটা কি ঠিক হবে? যদি মার খায়? হয়তো ভেঙে পড়বে, চুরমার হয়ে যেতে পারে। সারা জীবনের মতো। এইভাবে অকালে অনেকেই তো ঝরে গেছে!
সিলেক্টররা কি ঝুঁকি নেবে? ওকে খেলিয়ে যদি ম্যাচ হারে? সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান রাজেন্দ্র ত্রিবেদি অফস্পিনার ছিল, একটি মাত্র টেস্ট খেলেছে, ঝুঁকি নেয়নি কখনও, গতানুগতিক চিন্তা কিন্তু একটা টেস্টে এগিয়ে, এখন হয়তো ওকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা যায়! এদের দিয়ে সাবধানে কাজ করিয়ে নেওয়া, ঠিক সময়ে বল করতে আসা, মার খেলে আড়াল করা ক্যাপ্টেনের এটা বিরাট দায়িত্ব। রবি আনন্দ কি তা পারবে? আনন্দ নিজেও বোলার তবে স্পিনার নয়। এখনও পর্যন্ত এগারোটা টেস্ট ম্যাচে ভারত ওর অধিনায়কত্বে এইসবে একটা ম্যাচে জিতল। বড়োদরের ট্যাকটিসিয়ান নয়, মৃদু চরিত্র, অত্যন্ত থিয়োরি ঘেঁষা, বাঁধা গতে চলে, ব্যক্তিত্ব কম।
”যাক মেয়েটা তাহলে বেঁচে গেল নাকি আবার আসবে?”
”সরোজদা এরা জেনেশুনেই আসে…বাজি ফেলে বলতে পারি আবার আসবে।”
”কত বাজি? আমি বলছি আসবে না।”
”একশো টাকা। নাকি বেশি হয়ে যাচ্ছে…বেশ তাহলে বড়ো একটা রাম, হবে?”
”আমি হারলে দেব। আর জিতলে…আচ্ছা দিল্লি যাচ্ছ তো?”
”নিশ্চয়।”
”ওখানেই নোব।”
”শেষকালে এমন একটা কিছু বলবেন যে আমার সাধ্যের বাইরে হয়ে যাবে…”
”আরে না না টাকার ব্যাপার নয়, একটা অন্য জিনিস, ভুবুকে নিয়ে একজনের বাড়িতে একটু যেতে হবে।”
”ওহহ এই ব্যাপার, আমি ভাবলুম…সে হয়ে যাবে, নো প্রবলেম।”
সরোজ হাঁফ ছাড়ল। নিজের চোখেই দেখেছে ভবানীর সঙ্গে ওর হৃদ্যতা, সুতরাং শঙ্করকে খুশি রাখলে বীণার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ায় অসুবিধে হবে না। আজ দিনটা ভালোই যাচ্ছে। হোটেলে এসে বিপদে পড়ে রেহাই পেয়েছে, প্রেসপাস পেতে ঝামেলা হয়নি। একটা কার্টেন রেইজার গোছের একঘেয়ে জিনিস পাঠাতে হবে, সেটারও একটা ছক মোটামুটি মনে মনে তৈরি হয়ে গেছে-ফরজন্দকে খেলাবার জন্য জোর সওয়াল করবে। অবশ্য সিলেক্টরদের মধ্যে সুনীল কাঞ্জিলাল ছাড়া তো সিলেক্টরদের কেউই বাংলা পড়তে জানে না। সুতরাং সে কী লিখল বা না লিখল তাতে কিছুই যায় আসে না। কাঞ্জিলালের সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হত। ভবানীকে নাকি ও-ই ঝগড়াঝাটি করে টিমে ঢুকিয়েছে। ছেলেটার আশাতীত পারফরম্যান্স নিশ্চয় কাঞ্জিলালকে এখন তুঙ্গে তুলে রেখেছে।
সরোজ নেটের পিছনে ডেকচেয়ারে বসা মুখগুলোর মধ্যে কাঞ্জিলালকে দেখতে পেল না। ফরজন্দ নেট থেকে বেরিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসল। ফেন্সিংয়ের ওধারে শ’খানেক ছেলে। আজ রাতেই প্রথম বারোজন ঠিক হয়ে যাবে। উইনিং কম্বিনেশনকে নাড়ানাড়ি হয়তো করবে না। তাই হলে ও এবারও আসছে না টিমে।
”দু’একটা পয়েন্ট-ফয়েন্ট দিন সরোজদা, শুধু কি গসিপ পাঠাব?”
”কী আর পয়েন্ট দেব।” সরোজ সতর্ক হল। ”পয়েন্ট তো তুমি দেবে। আসল জিনিস হল ভেতরের খবর, তোমার তো সোর্স রয়েইছে। উন্নি ভালো অ্যানালিসিস করে, তোমার ডেস্ককে বলে দাও ইউ এন আই থেকে নিয়ে একটা কিছু বানিয়ে তোমার লেখাটার শুরুতে বসিয়ে দিক। রাতে টিমের নামগুলো বলবে, মনে হয় না বড়ো রকমের কোনো অদলবদল হবে।”
”রামিন্দারকে নাকি বসিয়ে দেবে যদি এবারও ফেল করে, ভুবু এইরকম একটা কানাঘুষো শুনেছে।”
সরোজ উৎকর্ণ হল। রামিন্দারের কথাটা তার মাথায় হালকাভাবে একবার এসেছিল। ইংল্যান্ডের সঙ্গে গত সিরিজে ফেল করেছে, ন’টা ইনিংসে একশো সত্তর রান। শেষ তিনটে সিরিজে একটা সেঞ্চুরি, দুটো ফিফটি। এবার মাদ্রাজে শূন্য আর তিন। সিনিয়র প্লেয়ার, পঞ্চান্নটা টেস্ট খেলেছে, এগারোটা সেঞ্চুরি। তিন হাজারের উপর রান। চট করে বসাবে না তবে ভবানী এসে যাওয়ায় নিশ্চয় বিপদ বোধ করছে।
