আজকের কার্টেন রেইজারের প্রথমেই এই ঘটনাটা লিখলে কেমন হয়? সরোজ হালকা বোধ করল। বরাবরই, শুরুটা কীভাবে করবে, তাইতে সে ব্যতিব্যস্ত হয়। একই খেলোয়াড়, একই পিচ একই কথা বারবার লেখা! বিদেশিদের ভালোমন্দর জন্য মাথাব্যথা ভারতীয় সাংবাদিক, পাঠক করবে কেন?
তাহলে কী লিখবে? মনে পড়ল রেস্টুরেন্টে শঙ্করের কথাগুলো। ইদানীং যেভাবে টেস্টম্যাচ খেলা হচ্ছে, নীরস বিরক্তিকর একঘেয়ে, শুধু ড্র আর ড্র, তাতে রসালো ড্রেসিংরুম-কেচ্ছা ছাড়া আর তো কিছুই লেখার থাকে না। সম্বল একমুঠো শব্দ, তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতি টেস্টে প্রতিদিন খরচ করে যাওয়া। লিখতেও তার এখন ক্লান্তি লাগে। পাঠকরা কাগজ খুলে কী পড়বে? তাদেরও তো একঘেয়ে খেলার রিপোর্ট পড়ে পড়ে ক্লান্তি এসে গেছে। অন্য কিছু তারা এবার চায়। কন্ট্রোভার্সি, অবজ্ঞা, ঝগড়া, ঈর্ষা, দোষারোপ, হাতাহাতি, সিনেমার ম্যাগাজিনগুলোয় যেরকম বেরোয়!
সরোজ মন্থরভাবে নেটের দিকে এগোল। স্লিপ ক্যাচিং প্র্যাকটিস করছে অর্ধচন্দ্র হয়ে পাঁচজন, বল মারছে ম্যানেজার মনোহরণ। শঙ্কর আর ভবানী একটু একান্তে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভবানীর হাতে বল, লোফালুফি করছে, আর শঙ্কর কিছু যেন মজার কথা শুনে হাসছে। সবাই কাজে ব্যস্ত অথচ ভবানী অলসভাবে সময় কাটাচ্ছে? ভ্রূ কুঁচকে উঠল সরোজের।
শঙ্কর হাত নেড়ে তাকে ডাকছে। সরোজ এগিয়ে গেল।
”আপনার সঙ্গে তো ভুবুর আলাপ নেই?”
”অল্প মানে মুখচেনা আর কী?”
ঠোঁট ছড়িয়ে ভবানী হাত বাড়াল। সরোজ তালুটা ধরল। কড়া চেটো, আঙুলগুলো ইস্পাতের শিক মনে হল।
”এত তাড়াতাড়ি নাম করে বিখ্যাত হবে জানলে আলাপ করে রাখতাম।”
”আমি আর কী করলাম, আপনারাই তো লিখে বিখ্যাত করেছেন।”
সরোজ মাথা নাড়ল হাসতে হাসতে। খুবই বালকোচিত কথা শুনতে হল এমনভাবে সে ডান হাত তুলে ধরল যেন ভবানীকে থামাতে।
”তোমার বায়োডাটাটা যে একটু চাই।”
ভবানী কিছু বলার আগেই ব্যস্ত হয়ে শঙ্কর বলল, ”ভাববেন না সরোজদা, আমি আপনাকে দিয়ে দেব। ওর লাস্ট পাঁচ বছরের সব আমার কাছে আছে।”
”সব মানে?” ভবানী কৃত্রিম ভয় পাওয়ার মতো চোখ করল।
”না না ওসব ব্যাপার নয়। খেলার দিকের সব-কোন কোন ক্লাব, কে কোচ-”
‘প্লিজ শঙ্কু, আমায় কেউ কোচ করেনি। এখন অনেকেই ক্লেম করছে কিন্তু আমি, সত্যি কথা বলতে, যা কিছু শিখেছি সবই দেখে দেখে।”
”আমি তো সরোজদাকে তাই-ই বলতাম, ভুবু সেলফ মেড ক্রিকেটার। আপনি তো এখান থেকে টেলিগ্রাফ অফিসে যাবেন ডেসপ্যাচ পাঠাতে, তারপর?”
”তারপর আর কী, সোজা হোটেল?”
”রাত্রে খাবেন কোথায়, ফুটু-তে?”
”তা ছাড়া আর যাব কোথায়?”
”এক কাজ করুন, আমি আপনাকে রাত আটটা না…ন’টা নাগাদ ডেকে নেব। দুজনে একসঙ্গে খেতে যাব আর তখন আপনাকে ভুবু সম্পর্কে যা যা জানতে চান বলে দেব, কেমন?”
”ঠিক আছে। ভবানীর কি প্র্যাকটিস হয়ে গেছে?”
ভবানী আড়চোখে ক্যাচিং প্র্যাকটিসের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোনা তাচ্ছিল্যে মুচড়িয়ে বলল, ”একবার তো আপনাদের দেখিয়ে করতেই হবে, নয়তো লিখে দেবেন ঘোষাল অসুস্থ কি ইনডিসিপ্লিনড। ম্যানেজারটাও টিপিক্যাল ইডলি-সম্বরা, হোটেলের লবিতে কাল বসেছিল, ঘড়ি নিয়ে, কে কখন ফিরছে নোট করছিল।”
”মনোহরণ ভালো ফিল্ডার ছিল, ফিটনেস নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করা ছাড়া মানুষটা ভালো।”
”চেনেন নাকি?” শঙ্কর বলল।
সরোজ মাথা নাড়ল।
”ভুবু, যথেষ্ট বিশ্রাম নিয়েছ… এবার এসো।”
মনোহরণের স্বরে হুকুম বা নির্দেশ নয়, অনুরোধ। ভবানী হাত তুলে মনোহরকে ”ওকে” এবং সরোজ আর শঙ্করকে হাসিমুখে ”চলি” বলে মন্থর চালে ফিল্ডারদের দিকে এগোল।
”একদম সোবার্সের মতো হাঁটাটা।”
”সোবার্সকে দেখেছ?”
”না।”
”খুব হাসছিলে দেখলাম, ব্যাপার কী?”
”ব্যাপার কিছুই নয়। অটোগ্রাফের জন্য মেয়েরা হোটেলের লবিতে যা কাণ্ড করছে। যাকে পাচ্ছে তারই সই নিচ্ছে। ঠুকরালের ভাই দেখা করতে এসেছে তারও সইয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। যত বলছে আমি জীবনে ক্রিকেট ব্যাটই হাতে নিইনি ততই মেয়েরা অবিশ্বাস করছে। বেচারাকে সই দিয়ে তবে রেহাই পেতে হল। রবি আনন্দের বউ এসেছে, তারও সই চাই! ভুবুর ঘরে লাস্ট কুড়ি ঘণ্টায় আটটা ফোন এসেছে মেয়েদের।”
”সইয়ের জন্য?”
শঙ্কর মুচকে হাসল। ”ফোনে তো আর সই করা যায় না, ওরা সই নয় ভুবুকে চায়। রেস্ট ডে-তে ভুবু কি ফ্রি থাকবে তাহলে ওকে নিয়ে লখনউ বেড়াতে যাবে। একজন বলেছে, ‘তুমি কি ঘরে একা তাহলে গল্প করতে যাব, ভীষণ এক্সাইটেড বোধ করছি তোমার ছবি দেখে, রাতে ঘুম হচ্ছে না।’ তবে ক্লাস ব্যাপার হয়েছে আজ, একটা মেয়ে সোজা চলে গেছে ভুবুর ঘরে। তখন ও খালি গায়ে শুধু শর্টস পরা।…ঠাট্টা করেই এমনি বলেছিল, চুমু দিলে তবে সই দেবে। ব্যস, মেয়েটা ওমনি গলা জড়িয়ে…ভুবুর রুমমেট ফরজন্দ, তার তো ভির্মি লাগার মতো অবস্থা। ছেলেটা অত্যন্ত ভদ্র আর ঠান্ডা, দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ে, মেয়ে দেখলে চোখ নামিয়ে নেয়, তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সে এক মজার কাণ্ড।”
”তারপর?”
সরোজের বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা পাথর জমে ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। সেটা তার হৃৎপিণ্ডের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে শুরু করেছে। অনেকটা এইরকমই টাটার গেস্ট হাউসের ঘরে ঘটেছিল তার ব্যাপারটা। তবে বীণার সঙ্গে সম্পর্কটা তখন যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছল।
