সদ্য চুনকাম করা দেয়ালে ইংরেজিতে ‘প্রেসবক্স’ এবং ব্লক ও গেট নম্বর লেখা। তির দিয়ে দেখানো একটা সবুজ লোহার গেট। ওরা সেটা অতিক্রম করে ছোট্ট একটা দরজায় দুটি লোক দাঁড়িয়ে আছেন দেখল। এটা প্লেয়ার্স ড্রেসিংরুমে যাবার দরজা। ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে গ্যালারির পিছনে ফাঁকা জমি আর যাতায়াতের পথ। ওখানে নানাবিধ খাবারের স্টল বসবে কাল থেকে। ধুলোর ঝাপসা দেয়াল উঠেছে। ওরা আর এগোল না, কাঠের গ্যালারির মধ্য দিয়ে একটা সরু পথে ঢুকে পড়ল।
গ্রিন পার্ক মাঠের ঘাস দেখে সরোজ অবাক হল। গতবছর দেখেছে লালচে ঘাস, জায়গায় জায়গায় টাক, মাটি বেরিয়ে। আর এখন তার সামনে বেশিক্ষণ চোখ রাখা যায় না এমন দাউদাউ সবুজ। তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, ”বাহ!”
”সরোজদা, ফেন্সিং ডিঙিয়ে এখান থেকেই মাঠে নামতে হবে, পারবেন?”
”দ্যাখো না পারি কি না।”
ব্যস্ত হয়ে সরোজই আগে ডিঙোল। কোমর সমান উঁচু ফেন্সিংয়ের মাঝামাঝি একটা ফোকরে এক পা ঢুকিয়ে অন্য পা ঘুরিয়ে সে সাইকেলে চড়ার মতো উঠল এবং সাইকেল থেকে নামার মতোই পা ঘুরিয়ে সে অন্যধারে নামল। শঙ্কর শুধু ডান হাতে ফেন্সিংয়ের উপরটা ধরে হাইজাম্প দেওয়ার মতো শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে তুলে মাঠের মধ্যে পড়ল সাবলীলভাবে।
”শঙ্কর, রিয়েলি তোমাকে ক্রিকেটারের মতোই লাগছে।”
”সরোজদা প্লিজ কল মি শঙ্কু।”
মাঠের অপর দিকে কয়েকটা কংক্রিটের থাম অসমাপ্ত অবস্থায়। নির্মাণের কাজ চলছে, পাকা স্ট্যান্ড আর প্যাভিলিয়ন হবে। দূরে বিরাট উঁচু, ইটের তৈরি একটা চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ওদিকটাকে মিল-এন্ড বলে রেডিয়োয় ধারাবর্ণনা দেবার সময়। মাঠের ওদিকেই নেট পড়েছে। মাঠের মাঝে দড়ি দিয়ে ঘেরা ধূসর পিচ। সবুজের মাঝে শুকিয়ে আসা পাঁচড়ার মতো। কয়েকটি লোক শল্যচিকিৎসকের তীক্ষ্ন চোখে পিচের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। দূর থেকে সরোজ চিনতে পারল দুজনকে, ইউ এন আই-এর উন্নি আর ডেইলি মেলের রতন মেনন। পিচ দেখে কী যে ওরা বুঝছে! ভারতে সব টেস্ট সেন্টারে তো একই পিচ, স্লো টার্নার, পাঁচ দিনই ঝিমিয়ে থাকবে। ব্যাটসম্যান আর বোলারেরই নয় সাংবাদিক, দর্শকদেরও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় পাঁচ দিন ধরে। এই নিউজিল্যান্ড টিমটা মাদ্রাজে সাতাশি রানে যে কী করে হারল সরোজের কাছে তার একটাই কারণ মনে হয়-অতি বাজে ব্যাটিং সাইড। মধু ভাণ্ডারকরের স্পিন এমন কিছু ভয়ংকর নয় যে ম্যাচে বারোটা উইকেট পেয়ে যাবে। চিপক আর গ্রিন পার্ক ইডেন আর ফিরোজ শাহ কোটলা একই তো উইকেট! বয়স হয়ে গেছে, একান্নটা টেস্ট খেলে ফেলেছে। বাঁ হাতটা গত আট বছরে কত হাজারবার যে ঘুরিয়েছে! ওর বলে আগের মতো আর নীচ থেকে চটকানি হয় না, বাউন্সও কমে গেছে। স্রেফ ফ্লাইটের চতুরালিতে উইকেট তো পেয়ে যাচ্ছে! আরও পাঁচটা উইকেট পেলেই দু’শো হবে, কোনো মারাঠি বোলার এখনও পায়নি। সেন্টিমেন্টাল কারণেই যে ভাণ্ডারকরকে খেলানো হচ্ছে এটা সবাই বোঝে। দু’শো না হওয়া পর্যন্ত টেস্ট খেলবেই। তার থেকেও বড়ো কথা, সিলেকটরদের এবং বোর্ড মেম্বারদের কেউ কেউ ওর প্রতি স্নেহপ্রবণ। হায়দরাবাদের লেগব্রেক বোলার ফরজন্দ আলি এখনও টেস্ট খেলেনি, মাদ্রাজের মতো এখানেও তাকে পনেরোজনে রাখা হয়েছে। ছেলেটি গতবছর থেকেই তৈরি টেস্ট খেলার জন্য।
শঙ্কর এগিয়ে গেছে ভারতীয় নেটের দিকে। সরোজের মনে হল, রাজীব তারিখ ব্যাট করছে। গত পাঁচ বছরে একুশটা টেস্ট, কখনওই পুরো সিরিজ খেলেনি, সর্বোচ্চচ বাহান্ন রান। ল্যাটা ওপেনিং ব্যাটসম্যান হওয়াটাই নাকি ওর বড়ো ব্যাপার।
”হ্যালো সরো।”
উন্নি নিয়মরক্ষার মতো বলল।
”হ্যালো। কবে এসেছ?”
”আজ সকালে।”
”হ্যালো মেনন।”
”হ্যালো, সরোজদা আপনি মাদ্রাজে যাননি?”
”না।”
ওরা দুজন আধময়লা প্যান্ট-বুশশার্ট পরা এক শীর্ণ প্রৌঢ়ের সঙ্গে কথা বলছিল। বোধহয় পিচ এঁরই তত্ত্বাবধানে তৈরি। আন্দাজে এরা কাজ করে মান্ধাতার ফর্মুলায়। যা বলে তার উলটোটাই ঘটে। নিশ্চয় বলছে থার্ড ডে থেকে বল দারুণ ঘুরবে! সরোজ গুড লেংথের কাছে জমির দিকে সরে গেল। সকালে জল দেওয়া হয়েছে, তারপর রোল। মাটি সামান্য ফাটাফাটা, মাকড়সার জালের মতো। ঘাস প্রায় কিছুই রাখা হয়নি, যা রয়েছে, গিঁটওলা, প্রায় মরা। স্পিনারদের বল ঘোরাতে নাকি সাহায্য করবে।
সরোজের মনে পড়ল, দিল্লির সঙ্গে ইডেনের খেলা ম্যাচটার কথা। ঠিক এই পিচ, এই ঘাস। বাংলার ড্রেসিংরুমে উত্তেজনা, ম্যাচ জিততে চলেছে। ফোর্থ ইনিংসে দিল্লিকে তিনশো চব্বিশ রান করে জিততে হবে হাতে পাঁচ ঘণ্টার মতো সময়। পারবে না। পিচ রোল করে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, এবার সুবীরের বল লাট্টুর মতো ঘুরবে। ক্যাপ্টেন আলোক দত্ত বলেছিল, ”স্টেডি সরোজ, এবার ক্যাচ উঠবে হাত ভরে, আঁকুপাকু করার দরকার নেই, প্রত্যেকটা নিতে হবে, একটাও যেন স্টাম্প মিস না হয়।” পাঁচ ঘণ্টা নয়, তিন ঘণ্টাতেই খেলা শেষ হয়ে যায়। দিল্লি দু’উইকেটে তিনশো সাতাশ তুলেছিল। তাতে ছিল অনন্তরামের দু’ঘণ্টায় একশো তেষট্টি, রঞ্জিত শর্মার আধ ঘণ্টায় চুয়ান্ন। সুবীর উইকেট এবং মেডেনও পায়নি একত্রিশ ওভারে দেড়শোর ওপর রান দিয়ে। একটা ক্যাচও সরোজের কাছে আসেনি। গিঁটওলা ঘাস কোনো সাহায্যে আসেনি, উইকেটও ভাঙার বদলে আরও জমাট বেঁধে যায় রোল করার জন্য।
