শুক্লাজি মৃদু হাসি দিয়ে প্রশংসাগুলি গ্রহণ করলেন। শঙ্কর চোখ টিপল। সরোজের স্পষ্ট মনে আছে, কিশোর পুত্রকে একদিন খেলা দেখাবার জন্য শুক্লা তাকে ধরেছিল কিন্তু সে মাঠে ঢোকার কোনোরকম পাসই জোগাড় করতে পারেনি। কীভাবে যেন অভয়ঙ্কর শেষদিনে ছেলেটিকে প্রেসবক্সে এনে খেলা দেখিয়েছিল। সরোজের মনে একটা অস্বস্তি ধরল, শুক্লা তার ব্যর্থতা বা গলদটাকে মনে রেখে থাকলে মুশকিলে ফেলতে পারে। তবে লোকটা সাদাসিধে হয়তো প্যাঁচ কষবে না।
”সরোজদা চলুন মাঠে যাই, ইন্ডিয়া টিম তিনটে পর্যন্ত নেট প্র্যাকটিস করবে, তারপর একবার হোটেলে যাব তারপর স্টোরি ফাইল করব।”
সরোজ চায়ের দাম দিতে যাচ্ছিল কিন্তু শুক্লাজির প্রবল আপত্তিকে অসম্মান করতে ভরসা পেল না। দুজনে একটা রিকশায় রওনা হল গ্রিন পার্কের উদ্দেশে।
”ডানহিল দিয়েছ?”
”কখন দিয়েছি! পাওয়া মাত্রেই পকেটে চালান করে দিয়েছে, মনে হয় না খায়। হয়তো ওপরওলাকে ভেট দেবে।”
”শঙ্কর তুমি এত ভালো বাংলা বলো কী করে? দেখলে তো সাহেব মনে হয় তোমাকে!”
”আমি তো দু’বছর বয়স থেকে কলকাতায়। পড়াশুনো ভবানীপুরে মিত্র ইন্সটিট্যুশন আর সেন্ট জেভিয়ার্স…পাড়ার ছেলেরা তো সবই বাঙালি, রাস্তায় রবারের বলও খেলেছি বহুদিন।”
”কে কে আছেন বাড়িতে?”
”গ্র্যান্ডমাদার আর মেইড সারভেন্ট…কাজিনরা থাকে বেলুড়ে, ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা আছে…আত্মীয়টাত্মিয় আছে চণ্ডীগড়ে।”
”তুমি দু’বছর থেকে কলকাতায়, চণ্ডীগড়ে জন্মেছ?”
শঙ্কর হাসল। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। উলটোদিক থেকে রিকশায় আসছে মহারাষ্ট্র ক্রনিকলের বাসু যোগলেকর আর ‘প্রত্যহ’ কাগজের তরুণ লাহিড়ি। সরোজকে দেখে যোগলেকর হাত তুলল, শঙ্করকে এখনও কেউ চেনে না। বাসুর সঙ্গে সরোজের প্রথম পরিচয় কানপুরেই, একই হোটেলে ‘সিধালোক’-এ তারা ছিল।
”ওরা কোথাকার, ইংরেজি কাগজের?”
শঙ্কর ইংরেজি কাগজের লোক, তাই সব ইংরেজি কাগজকে সে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে।
”বাসু যোগলেকর, যে হাত তুলল, মারাঠি কাগজের আর তরুণের বাংলা।”
শঙ্কর নিরুৎসুক হয়ে গেল। সরোজ সিগারেট ধরাবার জন্য দেশলাইয়ের দুটো কাঠি নষ্ট করে রিকশার গতি কমার জন্য একটা মোড়ের অপেক্ষায় থেকে বলল, ”বাড়িতে তুমি আর ঠাকুমা, বাবা-মা?”
”একজন মন্ট্রিয়েলে অন্যজন বারমিংহামে।”
শঙ্কর দুটো তালু ছড়িয়ে ব্যবধানটা বোঝাল। সরোজ মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। শঙ্করের মুখে ভাবের বদল হয়নি।
”বাবা পাঞ্জাবি মা ইংলিশ। ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাবা কানাডায় চলে যাবার আগে আমাকে ঠাকুমার কাছে রেখে যায়, এখনও টাকা পাঠায়। রেস্টুরেন্ট বিজনেসে আছে, অবস্থা ওখানকার স্ট্যান্ডার্ডে ভালোই। আমায় যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি।”
”কেন, গেলে তো ভালোই হত।”
”তা হত।”
শঙ্করের শুকনো স্বর আরও কৌতূহল থেকে সরোজকে নিরস্ত করল। হয়তো গূঢ় কোনো কারণ আছে।
ইস্পাতের চাদরে তৈরি সবুজ পাল্লার গেটটা অল্প ফাঁক। সেখানে কয়েকজন পুলিশ আর ছোটোখাটো ভিড়। নেট প্র্যাকটিসে ক্রিকেটারদের কাছের থেকে দেখার, অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য সর্বত্রই এই ঝামেলাটা তৈরি হয়। ”নেহি নেহি, ভাগো ভাগো।” শুনতে শুনতে এবং ব্যাটন আন্দোলন দেখতে দেখতে ওরা ভিড়ের কাছে পৌঁছতেই কলরবটা আচমকা থমকে গেল। সবাই শঙ্করের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। পুলিশদের মুখে তটস্থ ভাব দেখা দিল।
ইতস্তত ভাব কাটিয়ে সাহসী একটি কিশোর অটোগ্রাফ বইটা শঙ্করের দিকে এগিয়ে ধরল।
”ন্যেও, ন্যেও, নট ন্যাও।”
নিখুঁত সাহেবি বিকৃত উচ্চচারণে কথা ক’টা বলে শঙ্কর খুব ব্যস্ত ভাব দেখিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকতেই পুলিশ ব্যাটন চালিয়ে তার জন্য রাস্তা পরিষ্কার করতে শুরু করল। সরোজের ভয় ছিল, এইসব ক্ষেত্রে মাথামোটা পুলিশরা ভিতরে যেতে দিতে চায় না, বিশেষত এই রকম শহরে যেখানে বড়োমাপের খেলা ক্বচিৎ হয়। কড়াকড়ি দেখাতে এরা বদ্ধপরিকর। ওপরওলার নির্দেশ দ্বিগুণ উৎসাহে পালন করে।
শঙ্কর মুখ ফিরিয়ে ইশারায় সরোজকে অনুসরণ করতে বলল। তখন সরোজের কানে এল, ”এর নাম কী রে?” ”কী জানি বোধহয় বয়েড হবে।”
ভিতরে ঢুকে শঙ্কর বলল, ”বহু জায়গায় এই সুবিধেটা পাই, চেহারাটার জন্য মা’কে তখন মনে মনে ধন্যবাদ দিই।”
”হ্যাঁ, এখনও কটা চামড়া, কটা চোখ দেখলে এদেশের লোকে আলাদা খাতির দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পুলিশরা তো অশিক্ষিত গাঁইয়া, শিক্ষিতরাই আহ্লাদে গলে যায় যদি সাহেব তাদের সঙ্গে কথা বলে কি সাহেবদের সেবা করার সুযোগ পায়। সব টেস্ট সেন্টারেই দেখবে, সাহেব জার্নালিস্টরা কী খাতিরটা পায়!”
”আমাকে কী ভেবেছিল বলুন তো?”
সরোজ পা থেকে মাথা পর্যন্ত শঙ্করকে দেখে নিয়ে ওকে খুশি করার জন্যই বলল, ”নিউজিল্যান্ড টিমের কেউ!”
শঙ্করের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল হাসির আভায়। ”আপনার কি তাই মনে হয়?”
”নিশ্চয়। পাক্কা ক্রিকেটারের মতো তোমায় লাগছে।”
”আপনার সঙ্গে ভুবুর আলাপ আছে?”
”না।”
”করিয়ে দেব। চমৎকার ছেলে, হইচইয়ে, কোনো অহংকার নেই…।”
”শুনেছি একটুতেই মাথা গরম করে ফেলে, লঘুগুরু জ্ঞান থাকে না।”
”সে আর এমন কী।” শঙ্কর কাঁধ দুটো উঁচু করল। ”যে ক্লাস অফ ক্রিকেটার, যে লেভেলে ও পৌঁছেছে সেখানে যা টেনশন, খুব হাই স্ট্রাং হয়ে লড়তেই হয়।”
