-বাবা।
সানু ডাকছে। মাথা তুলল দিনেশ।
-চার আনা পয়সা দেবে। বাবু, সাণ্টে, সোনা, ওরা সবাই চিড়িয়াখানা যাচ্ছে।
থেমে গেল সানু দিনেশের মুখের ভাঁজগুলোকে বিশ্রীভাবে নড়ে উঠতে দেখে। ভয়ে পিছিয়ে গেল সে। টেবিলের পাশেই ছাতাটা নজরে পড়ল দিনেশের।
-চিড়িয়াখানা যাবি, ফুর্তি করবি, পড়াশুনো বুঝি চুলোয় গেছে। খাবি কি দুদিন পরে, চিড়িয়াখানা দেখে কি পেট ভরবে?
নির্মমভাবে দিনেশ ছাতা দিয়ে সানুকে পিটতে শুরু করল। মাধবী উঠে এসে সানুকে বাঁচাল। সানু কাঁদেনি। মার খাওয়া ওর অভ্যাস আছে।
-ছেলেকে মেরে কি হবে। তেজ দেখাতে হয় তো বাইরে যাও। মুরোদ কত, তা’ত বোঝাই গেছে।
চেয়ারে বসে পড়ল দিনেশ। অবসন্ন লাগছে। বগলের তলা জবজব করছে। বুকের ওপর দিয়ে ঘাম নামছে। কোমরের কসিতে আটকে গেল। আবার আর একটা স্রোত নামছে। এটাও বাধা পেল। গলার কাছে একটা ব্যথা। ঢোঁক গেলা যাচ্ছে না। চোখের পাতা চটচট করছে, জড়িয়ে যাচ্ছে। আঙুলগুলো তখন থেকে বাঁকানোই আছে। বইয়ে কি অক্ষর লেখা। এটা কি বই? পাঁজি। আজ কি বার? বেস্পতির তেরস্পর্শ কাকে বলে। শুক্রপুষ্ট বটিকার বিজ্ঞাপন পাঁজিতে কেন! ধাড়ি লোকেরা এগুলো পড়ে? নিশ্চয় পড়ে, নইলে টাকা খরচ করে ব্যবসার বিজ্ঞাপন দেবে কেন! মাধবী রোগা হয়ে গেছে। ও খুব খাটে। ভাল কিছু খাওয়া উচিত। টনিক খাওয়া উচিত। মাধবী টিকটিকি। ওকেও শুষে নিয়েছে সংসার। আমরা সবাই টিকটিকির ছানা। সংসারটা টিকটিকি। আমরাই আবার কখনো কখনো আরশুলা হয়ে যাই। মাধবীকে কি কখনো চুষে খেয়েছি? হয় তো হবে। ও বড় ভাল। মেয়েকে ও ভালবাসে। আমিও বাসি। রমাকে একটা বুড়ো হাবড়ার হাতে তুলে দিচ্ছিলুম। মাধবী হ’তে দিল না। মাধবী ভালো। ওকি আজ আসবে না। আসতে আজ এত দেরি হচ্ছে কেন?
.ঘুমোতে চাইছে না রমা। সারাদিনের খাটাখাটুনির পর ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করলেই ঝুরঝুরে কয়লার গুঁড়ো পড়ে। পড়তে পড়তে ঢিপি হয়ে যায়। তখন চোখ আটকে যায়। অন্ধকার কয়লার গুঁড়োর মতো। ঘুম অন্ধকারের মতো। অন্ধকার এখন দরকার নেই। ঝকঝকে আলো, বিয়ে বাড়ির আলোর মতো রঙ বেরঙের আলো, মনের মধ্যে জ্বলে উঠেছে। সুর উঠছে। সানাইয়ের সুর। শাঁখ বাজছে। ছাঁদনাতলা, পিঁড়ি, সাতপাক, মালাবদল, শুভদৃষ্টি। বর বড় না কনে বড়। সম্প্রদান, বাসর।
ঘুম আসছে। রমা মুখের সামনে হাত নাড়ল। যেন ওতেই তাড়ান যাবে অন্ধকার। বাসরঘরে অন্ধকার কোথায়! ফিসফাস, শাড়ির খসখস, হাসি, একটা দুটো গান, ঠাট্টা, ছাদে হুড়োহুড়ি, গলিতে খুরি গেলাসের শব্দ, কুকুরের চীৎকার। সেণ্টের গন্ধ, ঘিয়ের গন্ধ, গা গুলোচ্ছে।
উঠে বসল রমা। জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল। কান্না, কান্না, কান্না। কনকাঞ্জলি, দুধ উথলানো, ল্যাটা মাছ ধরা, এবাড়ি-ওবাড়ির জানলা বারান্দায় অচেনা ভিড়, তারপর রাত পুইয়েই আর একটা দিন। তত্ত্ব আসবে, আবার হৈ চৈ, ছাদে ম্যারাপ, হাতভরা যৌতুক-উপহার, চেনা মুখ, সেণ্ট-ঘি’র গন্ধ। বাড়ি শান্ত, শরীর ভারভার, ঠাট্টা তামাসা, পা-চলে না, একটা ঘোর। ফুল, ফুল, ফুল। নতুন তোশকের গন্ধ, পরিষ্কার চাদর, বন্ধ দরজা, কেউ হেসে ফেলল, আলো নিভে গেল। ফুল, ফুল, ফুল।
এখন ঘুম পাচ্ছে। কালকেই বিশ্বকে বলতে হবে একটা আলাদা বাড়ির কথা। এ বাড়িটা নোংরা, নড়বড়ে, ঘিঞ্জি। আর কি! জানলায় পর্দা, একটা ভাল আয়নাতে নিজের মুখ দেখলে ভয় করবে না। সঙ্গে একটা যদি বারান্দা পাওয়া যায়! ফেরিওলা গেলেই চট করে ডাকা যাবে, পাশের বাড়ির সঙ্গে গল্প করা যাবে। দূর থেকে বিশ্বকে আসতে দেখা যাবে। আর কি? পাতলা চিনে মাটির কাপ। একটা ছেঁকনি। কলাই-চটা কাপে চা খেলে অসুখ করে, ন্যাকড়ায় চা ছাঁকলে বিশ্রী দেখায়। আর কি চাই! কি জানি, ঘুম পাচ্ছে। জুতো সাফ করার বুরুশ, ধোপাবাড়ির ফর্দ রাখার খাতা, আর, আর যদি একটা রেডিও হয়। রেডিও থাকলে ঘরটাকে ঝকমকে দেখাবে। যমুনার কলের গান আছে। দুবার শুনলেই গানগুলো একঘেয়ে হয়ে যায়। যমুনা বলেছিল, সিনেমায় নাকি মেয়েরা বাগানে ফুল তুলে খোঁপায় গোঁজার সময় গান গায়। ও ভীষণ সিনেমা দেখে। অত দেখা খারাপ। কথাবার্তা, চালচলন কেমন যেন আলাদা ঢঙের হয়ে যায়। গেরস্থ ঘরে ওসব আর ক’দিন মানায়। কিন্তু তাই বলে সিনেমা দেখা কি বন্ধ থাকবে! মোটেই না। মাঝে মাঝে দেখব। কান্নাকাটির বইগুলো একদম দেখব না। যাবার সময় হেঁটে যাব। পাশাপাশি। আভা বলেছিল রাস্তায় বেরোলে ও ঘোমটা দেয় না, বোঝাই যায় না বিয়ে হয়েছে কি না, সিঁদুর খুব সরু করে দেয়। এতে নাকি সুবিধেই হয়, ছেলে-ছোকরারা খাতির করে। আমার খাতিরে দরকার নেই। ওতে নিন্দে হয়।
পাশ ফিরল রমা। এবার আর জাগা নয়। অনেক রাত হয়েছে। পাশের বাড়ির নির্মল-কাকার বৌ ছেলের ঘুম ভাঙিয়ে কলতলায় নিয়ে গেছে। ঠিক ঘড়ি ধরে ওর সব কাজ। এরপর দুধ খাওয়াবে। নির্মলকাকা খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সকাল হতে আর ক’ঘণ্টাই বা বাকি। আর জেগে থাকা নয়।
গরম লাগছে। আহা রে। সানু হাতটা এমনভাবে ছড়িয়ে রাখে যেন লেগেছে বোধ হয়। তবু ঘুম ভাঙল না ছেলেটার। সারাদিন যা দুষ্টামি করে, ঘুমোলেই কাদা, ঘুমোলে ছোট ছেলেরা ভারী হয়ে যায়। বড় মানুষ হয় কি? ছেলেটা রোগা হয়ে যাচ্ছে। এখন বাড়ের সময়, ক্ষিদেও বাড়ে। ভাত খেতেই ওর যত অরুচি। আলুকাবলি আর চাটনি খেলেই কি হাড়ে মাস লাগবে। ওরই বা দোষ কি। যা বাজার আসে, সেই একঘেয়ে রান্না, বড়দেরই তো অরুচি আসে।
