তবে একটা ব্যাপারে শঙ্করের প্রতি তার অবচেতনে বিতৃষ্ণা ঘনিয়ে উঠেছে। ছেলেটি সর্বোচ্চচ পর্যায়ের অর্থাৎ টেস্টমানের ক্রিকেট বোঝে না বলল এবং সেজন্য কোনোরকম জড়তা বা কুণ্ঠা ওর মধ্যে নেই। ও এসেছে ঝগড়াঝাটি, রসালো কথাবার্তা, অপ্রীতিকর ঘটনা অর্থাৎ কেচ্ছা জোগাড় করার জন্য। যেসব খবর তারিয়ে তারিয়ে পাঠকরা পড়বে, যেসব খবরের সঙ্গে খেলার মূল উদ্দেশ্য বা প্রেরণার কোনো সম্পর্ক নেই। পাঠকদের মনের মধ্যে সুপ্ত নীচ প্রবৃত্তি খুঁচিয়ে তুলে একটা নোংরা আবহাওয়া তৈরি করে পাঠক সংগ্রহ করার, কাগজের বিক্রি বাড়ানোর এই পন্থা সরোজ কখনও মেনে নিতে পারেনি। ইদানীং এই পথে অনেকেই যাচ্ছে, সরোজের যাবার ইচ্ছা নেই। খেলার মাঠে খেলা হচ্ছে, তুমি দেখছ, খেলার দোষত্রুটি, ভালোমন্দ যা বুঝলে সেটাই তোমার রিপোর্ট করার বিষয়। কিন্তু কী একটা হাওয়া যেন আসছে, শুধু মাঠের মধ্যের খেলা নয়, তার আড়ালে যে-জগৎ রয়েছে তার খবরও প্রকাশ্যে টেনে আনা দরকার হয়ে পড়ছে। এটাও নাকি জরুরি যেহেতু তা ঘটনা। ‘সব কাগজেই বেরিয়েছে খেলার পর কোচের সঙ্গে ফুটবল সেক্রেটারির গালাগালি হয়েছে, টেন্টের মধ্যে হাতাহাতিও হয়েছে, একজন ফুটবলার কোচকে শুয়োরের বাচ্চচা বলেছে আর তোমার লেখায় এসব কিছুই নেই…খেলার পর করো কী, মুড়ি চিবোতে চিবোতে অফিসে চলে আসো, টেন্টে যাও না কেন?’ ক্রীড়া সম্পাদক রমেন গুহঠাকুরতা এই বলে গত ফুটবল সিজনে ধমকেছিল বিমলেন্দুকে। বিভাগের অন্যরা মুখ নামিয়ে তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে কাগজ-কলম নিয়ে।
সরোজ এই ধরনের খবর সংগ্রহের বিরোধী। গুহঠাকুরতা তা জানে, তবে সিনিয়র রিপোর্টার বলে সাধারণত চুপ করে থাকে। মৃদু অনুযোগ ‘এটা দিলে সরোজ লেখাটা ভালো খুলত’ বা ‘মিস করে গেলে অমন জব্বর ব্যাপারটা !’-এর বেশি কখনও বলেনি। তবে সরোজ শুনেছে আড়ালে তার সম্পর্কে ‘মান্ধাতাপন্থী…নীতিবাগীশ…আধুনিক রিপোর্টিং-এর কিসসু জানে না’ ইত্যাদি গুহঠাকুরতা বলেছে। আর একবার শুনেছিল, ‘একটা অপদার্থ। বেঙ্গলের হয়ে একটু-আধটু খেলেছে, দু-চারটে খেলার উপর লেখা বেরিয়েছিল এখানে সেখানে তাই চাকরিটা পেয়ে গেছল। তখন কাগজের যা চরিত্র ছিল আর এখন… দুনিয়াটা যেভাবে র্যাপিড বদলে গেছে তার সঙ্গে কাগজও বদলাতে বাধ্য। জার্নালিজম যেখানে এসেছে তাতে ও এখন হলে চাকরিই পেত না।…টোটালি মিসফিট।’
কথাগুলো মনে পড়লেই সরোজের হাত কাঁপতে শুরু করে উত্তেজনায়। তার ব্লাডপ্রেশার উঁচুর দিকেই, ডাক্তার উত্তেজিত হতে বারণ করেছে কিন্তু স্মৃতিকে কাজ করা বন্ধ করতে বললে শুনবে কেন? সে লক্ষ করল তার হাতে সুপের চামচটা থরথর কাঁপছে। মনে মনে সে বলে চলল ‘কুল ডাউন, কুল ডাউন সরোজ… ঠান্ডা হও, ঠান্ডা হও।’
”কিছু বললেন?” শঙ্কর ঝুঁকিয়ে দিল মাথাটা।
”এখান থেকে কোথায় যাবে এখন?”
”বড়ো টেলিগ্রাফ অফিসটা পাশেই একবার টেলেক্স ব্যবস্থাটা দেখে নেব। ওখানে আসল লোকটা কে… এক প্যাকেট ডানহিল তার হাতে ধরিয়ে দিতে হবে তো।” শঙ্কর মুখ টিপে হাসছে। সরোজের মনে হল একে পেলে গুহঠাকুরতা খুশিই হবে।
শঙ্করের খাওয়া শেষ হচ্ছে তখন সরোজের জন্য চাওমিন টেবলে এল।
”আপনি এখান থেকে কোথায় যাবেন?”
”একবার মাঠে যাব।”
”আজ কিছু পাঠাবেন? কার্টেন রেইজার?”
”হ্যাঁ। একটা তো পাঠাতেই হয়।”
”আমি টেলেক্স ইনচার্জের সঙ্গে একবার মোলাকাতটা করে আসি। ওখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করব তারপর একসঙ্গে মাঠে যাব।”
সরোজ ঘাড় নাড়ল। শঙ্কর নিজের বিল চুকিয়ে অ্যাডিডাসের একটা নীল রঙের স্পোর্টস কিটব্যাগ বগলে ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল। সরোজের মনে হল ওর জুতোটাও বিলিতি। জিজ্ঞাসা করতে হবে কখনও দেশের বাইরে গেছে কি না।
শঙ্করকে খুঁজতে সরোজ টেলিগ্রাফ অফিসে টেলেক্সের রিসিভিং কাউন্টারের কাছে দাঁড়াল। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে সে ঘুরতে লাগল নানান ঘরে উঁকি দিয়ে। অবশেষে ওকে দেখতে পেল সদর গেটের কাছে ফাঁকা জায়গাটায় যেখানে টেলিগ্রাফ বাড়ির সীমানা-রেলিং ঘেঁষে ফুটপাথে ত্রিপলের চালার নীচে চায়ের দোকান। শঙ্করের সঙ্গে গলাবন্ধ খয়েরি গরম কোট ও ধুতিপরা এক গৌরবর্ণ মাঝবয়সি লোক চায়ের গ্লাস হাতে। এগিয়ে যেতে যেতে সরোজের চোখে পড়ল, লোকটির টিকিতে গিঁট বাঁধা এবং কপালে লাল ফোঁটা। এঁকে সে চেনে।
”সরোজদা আসুন আলাপ করিয়ে দি…মণীশ শুক্লা এখানকার একজন অফিসার মাঠে টেলেক্স ক্যাম্পে থাকবেন আর ইনি সরোজ বিশ্বাস, কলকাতার বাংলা কাগজ প্রভাত সংবাদের নাম শুনেছেন নিশ্চয়…”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি তো আগে একবার এসেছেন আমার মনে পড়ছে…ই সুধনিয়া, বাবুকে চা দে।”
রেলিংয়ের ওধারে চায়ের দোকানের ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে মণীশ শুক্লা বললেন।
”আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না, আমি সারাক্ষণ মাঠে থাকব…রাত আটটা পর্যন্ত আমাদের ক্যাম্প খোলা থাকবে আর এখানে তো সব সময়ই পাবেন। টেস্টম্যাচের জন্যই আমাকে স্পেশাল ডিউটি দেওয়া হয়েছে।
চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে সরোজ কিঞ্চিৎ কৃতার্থ ভঙ্গিতে বলল, ‘শুক্লাজি আপনার মেমারি অদ্ভুত শার্প, ঠিক চিনতে পেরেছেন তো! জানো শঙ্কর ইনি হেল্প না করলে আমার একটা কপিও ঠিক সময়ে অফিসে ল্যান্ড করত না। হয় কলকাতার লাইন জ্যাম নয় লাইন ডাউন, সে কী অবস্থা! আমি তো কপি এঁনার হাতে জমা দিয়ে নিশ্চিন্তে হোটেলে চলে যেতাম। তখন অবশ্য এত রিপোর্টারের ভিড়ও ছিল না।”
