”হাই সরোজ।”
‘বম্বে মনিটর’-এর সুদর্শন অভয়ঙ্কর-প্রেসবক্সে ডাকনাম অভয়-হাত তুলে জানান দিল। সরোজও ছোট্ট করে হাত তুলে টেবলের ওধারের লোকটিকে তার আগমন-উদ্দেশ্য বলতে যাচ্ছিল।
”এই নিন আপনার পাস, রেডিই আছে।”
সরোজ তার হাত থেকে সেফটিপিন লাগানো গোলাপি কার্ডটা হাতে নিয়ে, দেখে নিল তার এবং কাগজের নাম লেখা আছে কি না।
”আমাদের ফোটোগ্রাফার কি তার পাস নিয়ে গেছে?”
”আধঘণ্টা আগে এসেছিলেন।”
”থ্যাঙ্ক ইউ।”
সরোজ তাকাল অভয়ের দিকে।
”কখন এসেছ, কোন হোটেলে?”
”আজই, যে হোটেলে তুমিও উঠেছ?”
”আমি ঘর পাইনি, আর একজনের সঙ্গে শেয়ার করে আছি।”
”কানপুরে এই এক সমস্যা, ভালো হোটেল…”
”তুমি মাঠে যাচ্ছ তো।”
সরোজ থামিয়ে দিল অভয়কে। কথা বলতে শুরু করলে, বিশেষত অভিযোগ সংক্রান্ত হলে, আর থামতে চায় না।
”যাব।”
”তাহলে ওখানেই দেখা হবে।”
নরম তীক্ষ্ন রোদ্দুর। হাওয়া না থাকায় অত্যন্ত মোলায়েম লাগছে। গরম জামা পরার দরকারই হয় না। কমলা টাওয়ার থেকে বেরিয়ে সরোজ হেঁটে মল রোডে এল। এবার খেতে হবে। যতদূর মনে পড়ছে ‘ফুটু’ নামের চিনা রেস্টুরেন্টটা কাছাকাছি কোথাও। বড়ো টেলিগ্রাফ অফিসটা ছাড়িয়ে একটু এগোতেই সে ফুটু পেয়ে গেল।
ভিতরটা প্রায়ান্ধকার। জনা চারেক মাত্র লোক। সে ঢুকতেই তারা ফিরে তাকাল।
ডানদিকে দেয়ালের দিকে মুখ করে সবে বসেছে, তখন পিছন থেকে শুনতে পেল কে যেন বলল। ”সরোজদা!”
মুখ ফিরিয়ে দেখল কোণের চেয়ার থেকে উঠে একটি ছেলে তার দিকে আসছে। জিনস, সাদা পোলো গলা গেঞ্জি তাতে বড়ো লাল-সবুজ অক্ষরে ”লাভ মি” লেখা। আলো কম হলেও কোঁকড়ানো চুলগুলো যে ঈষৎ বাদামি তা বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘকায়, প্রায় ছ’ফুট, বলিষ্ঠ বাহু, চওড়া কাঁধ, সরু কোমর। মুখটা লম্বাটে, টিকোলো নাক, দাড়িগোঁফ কামানো এবং গায়ের রং তামার সঙ্গে চুন মেশানো। প্রথম দর্শনেই মনে হবে সাহেব এবং খেলোয়াড়। সরোজ কলকাতায় একে দু-তিনবার দেখেছে, স্টেট অ্যাথলেটিকস মিটে আর সাউথ ক্লাবে। আলাপ নেই। বয়স তেইশ-চব্বিশের মধ্যেই, নাম জানে না, কোন কাগজের তা-ও জানে না।
”সরোজদা কখন এলেন? প্রেসপাস কালেক্ট করেছেন?”
পরিষ্কার কলকাতার টানে বাংলা। সরোজ অবাক হল।
”হ্যাঁ।”
”কলকাতা থেকে আর কেউ নেই, শুধু আমরা দুজন। বসতে পারি?”
”নিশ্চয়। ভালোই হল, একা একা ভালো লাগে না।”
”আমারও।”
বয় মেনু কার্ড সরোজের সামনে রেখে গেল।
”আমার অর্ডার আমি দিয়ে দিয়েছি, শুধু আপনার বলুন।”
সরোজ কার্ডে চোখ বুলিয়ে দেখল সারা ভারতে চিনা রেস্টুরেন্টগুলোতে যা পাওয়া যায় এখানেও তাই। দামও প্রায় এক।
”সুপ, চিকেন অ্যাসপারাগাস আর মিক্সড চাওমিন।”
সরোজ পরিচিত খাদ্যের বাইরে রসনার অভিযানে যেতে রাজি নয়।
”আপনি বোধহয় আমার নাম জানেন না।”
সরোজ অপ্রতিভ হেসে মাথা নাড়ল।
”শঙ্কর সিং গ্রুয়াল। ড্রাইভিং শেখায় যে গ্রুয়াল স্কুল আমি কিন্তু তাদের কেউ নই। নিউজ ডে-র স্পোর্টস ডেস্কে আছি প্রায় দেড় বছর, এই প্রথম বাইরে বেরোলাম।”
”তোমাকে দু-একবার দেখেছি।”
”টেনিসে?”
”হ্যাঁ, সাউথ ক্লাবে আর অ্যাথলেটিকসেও।”
”ও-দুটো আমার খুব ফেভারিট স্পোর্টস। স্পোর্টস এডিটারের কাছে চেয়ে নিয়ে কভার করেছিলাম।”
”ক্রিকেট করেছ?”
”না। ক্রিকেট জানি, স্কুল টিমে খেলেছিও কিন্তু খুব ডেপথে কখনও যাইনি।”
”তাহলে একেবারে টেস্টম্যাচ দিয়েই শুরু করছ।”
”হ্যাঁ।” শঙ্কর একগাল হাসল। ”মাদ্রাজ টেস্ট করতে গিয়ে অরুণদা এমন পা মচকালেন… দুজন ছুটিতে, ভোম্বলদা রাজি নন, ওঁর মেয়ের পরীক্ষা, তাই…তা ছাড়া আমি তো ঠিক ম্যাচ রিপোর্ট করব না, সাইড লাইটস, ড্রেসিংরুম রিজের ওপরই বেশি জোর দেব, গসিপ কলামে যেমন বেরোয়, আর ইন্টারভিউ এইসব-ভুবু আমার অনেক দিনের বন্ধু তো ভেতরের খবর ঠিক পেয়ে যাব!”
শঙ্করের সামনে বয় একপ্লেট চপসুয়ে রেখে গেল।
”আমি কি শুরু করে দেব…ঠান্ডা হয়ে গেলে….।”
”না, না, তুমি আরম্ভ করো। চিনে খাবারের এই এক ঝামেলা ঠান্ডা খেতে একদমই ভালো লাগে না।”
সরোজ এতক্ষণ কথা শুনতে শুনতে মেপে নিচ্ছিল ওকে। ছেলেমানুষ, অনভিজ্ঞ, বাহাদুরি দেখাবার লোভ সামলাতে পারে না কিন্তু কাজের এবং খাটিয়ে। মনে হচ্ছে খোলামেলা আমুদে, সঙ্গ ছাড়া থাকতে পারে না, ফর্ম্যালিটিজের ধার ধারে না।
”কবে এসেছ, উঠেছ কোথায়?”
”কাল রাতে, উঠেছি আপনার পিছনেই সঙ্গম হোটেলে। বাজে ঘর আর যত টিভি আর রেডিয়োর লোকে ভরা। সকালে গরম জলই পেলাম না।…”
”আমি কোথায় উঠেছি জানলে কী করে?”
”প্রেসপাস নিতে গেছি তখন মোটা বেঁটে একজন বোধহয় বোম্বের, আমি কলকাতা থেকে এসেছি শুনে বলল আপনি মধুছন্দায়।”
”অভয়া, সুদর্শন অভয়ঙ্কর। যেখানেই যায় প্রথমেই খোঁজ নেয় কে কে এসেছে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেনি, রুম চার্জ কত, ঘর কমফর্টেবল কি না, ফুড কেমন?”
”না।”
”করবে।”
সুপ এসে গেছে। ধোঁয়া উঠছে। ঠান্ডা করার জন্য চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে সরোজ ভাবতে শুরু করল। রোজার অটোগ্রাফ বুকে সই করানো আর দিল্লিতে ওদের বাড়িতে ভবানীকে নিয়ে যাওয়া-এই দুটো কাজ একে দিয়েই করাতে হবে অবশ্য যদি রাজি হয়। তার থেকেও বড়ো কথা, ওর কথাবার্তার মধ্যে সত্যতা আছে কতখানি?
