সরোজ এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার আগে আধো ঘুম অবস্থায় সে যখন হালকাভাবে অচেতনার গভীরে নেমে যাচ্ছিল তখন বীণাকে বলতে শুনছিল, ”সরোজ মনে হচ্ছে আমি প্রেগনান্ট, তুমিই করেছ, জামসেদপুরে। তোমাকে বিয়ে করতে হবে।”
”তাহলে আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাতের অমিল বাবা মানবেন না, আমাদের ফ্যামিলি যে কী গোঁড়া তা তুমি জানো না। সবকিছু থেকেই বঞ্চিত করবেন। তা ছাড়া আমি চাকরিও করি না… তুমি অ্যাবোর্শন করিয়ে নাও।”
”আমি তো একটা চাকরি করছি… দুজনের তাতে চলে যাবে। তুমি স্টেট ক্রিকেটার, গ্র্যাজুয়েট, যে-কোনো ফার্মেই পেয়ে যাবে এক সময়।”
”আমাদের বংশে বাপ-মায়ের মনোমতো পাত্রীকে ছাড়া বিয়ে করা যায় না। আমি নিরুপায়, একমাত্র ছেলে আমি…”
”সরোজ এইসব মধ্যযুগীয় কথা এ যুগে অচল। আসলে বিন্দুমাত্রও তুমি ভালোবাসনি, ভালোবাসার ক্ষমতাও তোমার নেই। বাপের সুপুত্তুর সেজে পালাবার গর্ত খুঁজছ…বিট্রেয়ার, ভুল করেছি আমি একটা মেরুদণ্ডহীনকে ভালোবেসে। তুমি চিরকাল বুকে হাঁটবে, কোনোদিনই বড়ো হতে পারবে না, কোনোদিনই টেস্ট খেলতে পারবে না।”
তিন
গোঙানির মতো একটা আওয়াজ মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই সরোজ ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। হাতঘড়িতে সময় দেখেই সে প্যান্টটা টেনে নিয়ে পা গলাল।
প্রেসপাস আনতে হবে কমলা টাওয়ার থেকে। দরজায় চাবি দিয়ে দু’পা গিয়েই আবার ঘরে ফিরে এল। বীণার শালটা খাটের উপর পড়ে রয়েছে। ভাঁজ করে হ্যান্ড-গ্রিপের মধ্যে রেখে জিপটা টেনে দিয়ে ভাবল তালাটা লাগিয়ে দেবে কি না। হোটেলে ঘর থেকে কোথাও এখনও পর্যন্ত তার কোনো জিনিস চুরি যায়নি। তবু সে ছোট্ট তালাটা লাগাল। জিনিসটা বীণার!
রিসেপশন কাউন্টারে সকালের দাড়িওলা যুবকটিই রয়েছে। চাবিটা তার হাতে দিয়ে সরোজ জানতে চাইল, কোনো ঘর খালি হবার সম্ভাবনা আছে কি না। যুবক মাথা নাড়ল, তবে যদি কেউ ঘর ছাড়ে তাহলে সরোজকে জানাবে, এই আশ্বাসটুকু দিল।
”কমলা টাওয়ার এখান থেকে কতদূর? হেঁটে যাওয়া যাবে?”
”তা যাবে, তবে আপনি রিকশা নিন। নতুন লোক, চিনে বার করতে অসুবিধে হবে।”
আগের বার সরোজকে প্রেসপাস আনতে যেতে হয়নি। তার কাগজের ফোটোগ্রাফার নিরঞ্জন নিজের পাস আনার সময় তারটাও নিয়ে এসেছিল। এবার নিরঞ্জনের বদলে আসছে রামকুমার দাস। মাস দুয়েক হল বিয়ে করেছে। বউকে সঙ্গে আনবে, উঠবে সম্পর্কিত এক শালার বাড়ি। রামকুমারের সঙ্গে সরোজের ভালো আলাপ নেই। ছেলেটি বছরখানেক চাকরি করছে। পোশাকে ফিটফাট। স্যুট এবং টাই পরা অবস্থায়ই সরোজ ওকে বেশিরভাগ দিন দেখেছে। কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ক্যামেরা এবং টেলিলেন্সের ব্যাগটা বিদেশি। ছবির পিছনে ওর লেখা ক্যাপশন থেকে সরোজের মনে হয়েছে লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি তবে ছবি ভালো তোলে। সে শুনেছে রামকুমার উদ্ধত প্রকৃতির, ধরাকে নাকি সরা জ্ঞান করে।
রামকুমারের সঙ্গে মাঠে ছাড়া দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বস্তুত টেস্টম্যাচের সময় ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে রিপোর্টারদের যোগাযোগ প্রায় থাকেই না। দুজনের কাজের ধরন এবং বসার জায়গাও আলাদা। ছবি তোলা, স্থানীয় কোনো স্টুডিয়োর সঙ্গে ব্যবস্থা করে ফিল্ম ডেভেলপ করিয়ে রোলটা কাউকে দিয়ে বা নিজে এয়ারপোর্টে বা এয়ারলাইন্স অফিসে গিয়ে কলকাতার প্লেনে রোলের প্যাকেটটাকে ধরিয়ে দেওয়া-এইসব কাজেই ফোটোগ্রাফাররা ব্যস্ত থাকে। প্লেনের সময় অনুযায়ী ওদের কাজের সময়। তবে সাধারণত লাঞ্চের পরের ছবি নেবার আর সময় থাকে না, ফিল্ম ডেভেলপ করার জন্য ছুটতে হয়। দিনের খেলার শেষ দিকে শুধু একবার ওরা রিপোর্টারের কাছে আসে এয়ারলাইন্সের চালান নম্বরটা ম্যাচ রিপোর্টের সঙ্গে কলকাতার অফিসে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। দমদমে নম্বরটা দিয়ে অফিসের লোক তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা হস্তগত করতে পারে।
মল রোড দিয়ে রিকশাটা কিছুটা গিয়েই ডানদিকের একটা রাস্তা ধরল এবং একটু পরেই বাঁদিকে ঘুরে ঢুকল একটা নোংরা গলিতে। দু’ধারে জুতো, স্টেশনারি, মুদি, দর্জি, মিষ্টি আর পানের দোকান। গলিটা এক এক জায়গায় এমনই সরু দুটি মোটর মুখোমুখি হলে ছোটোখাটো সংকট তৈরি হবে। একটা কবিরাজি দাওয়াখানা আর পাঠশালা পেরিয়ে, গর্তে চাকা পড়ার ঝাঁকুনিটা সামলে অবশেষে রিকশাটা থামল কমলা টাওয়ারের ফটকে। কমলাপৎ পদমপৎ সিংঘানিয়া প্রতিষ্ঠিত সারা ভারতে ছড়ানো বিশাল ব্যবসাবাণিজ্যের সদর দফতর কিনা এইরকম এক গলিতে! সরোজ অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রিকশাওলাকে বিদায় দিয়ে ভিতরে ঢুকে বাঁদিকে অনুসন্ধানের জায়গায় খোঁজ নিল। নাম ও আগমন-উদ্দেশ্য জেনে নিয়ে, সামনের ঘরে তাকে অপেক্ষা করতে বলে লোকটি ফোন তুলল।
দশ মিনিট পর পানের পিক-লাঞ্ছিত সিঁড়ির কোনাগুলি এড়িয়ে সরোজ দোতলায় একটি ঘরে ঢুকল। একটি লোকের মুখোমুখি হয়ে টেবলের বিপরীতে তিন-চারজন বসে। সরোজ ঘরে ঢোকার সময় সম্ভবত জোরালো তর্ক চলছিল, তার রেশটুকু সে শুনতে পেল।
”ওরা যদি দুটো পায়, তাহলে আমরাও দুটো পাব। এ-ব্যাপারে কোনো পক্ষপাতিত্ব হলে….।”
সরোজের মনে হল লোকটি স্থানীয় কাগজের। স্যুট-টাই পরা, ঠোঁটের কোণে পানের রস লাগা, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ এই লোকটিকে, সরোজের যতদূর মনে পড়ে, গতবার সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া বাড়তি একটা লাঞ্চ বাক্স পাবার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে দেখেছিল।
