মুখ তুলে বীণা বিপন্ন চোখে মেয়ের দিকে তাকাল। রোজার চোখ নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। মুঠি শিথিল।
”আঙ্কল আপনি বললেও আসবে না?”
সরোজ ওর করুণ মুখ, মুষড়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরে কষ্ট পেল। এইরকম অনুরোধ জীবনে কখনও আসেনি। যদি আসত সে মুহূর্তেই নাকচ করে দিত। এখনই সে তাই করত, শুধু এই মেয়েটির জন্য সে সোজাসুজি না বলতে পারছে না। সারল্য ছাড়াও রোজার সারা অবয়বে এমন কিছু একটা ব্যাপার যার টান সে অনুভব করছে।
”আমি চেষ্টা করব, তবে বেশি আশা কোরো না, হ্যাঁ চেষ্টা করব।”
”মা, অটোগ্রাফ বইটা আঙ্কলকে দাও না… আপনি ইন্ডিয়া আর নিউজিল্যান্ড টিমের সইগুলো জোগাড় করে দিতে পারবেন তো?”
সরোজ আবার বিব্রত বোধ করল। এসব কাজ যে কীভাবে করতে হয় তা সে বুঝে উঠতে পারে না। ক্রিকেটারদের সঙ্গে ছুটতে ছুটতে বাচ্চচা ছেলেরা অটোগ্রাফ বইটা বাড়িয়ে দিয়ে কাকুতি-মিনতি করছে এমন একটা ছবি তার চোখে ভেসে উঠল। অসম্ভব। কিছু সাংবাদিককে সে দেখেছে ড্রেসিংরুমে বা হোটেলে গিয়ে বা নেট প্র্যাকটিসের সময় সই জোগাড় করে। তাদের মতো কাউকে কানপুরে পেলে রোজার বইটা গছিয়ে দেওয়া যাবে। আর না পেলে পরিষ্কার বলে দেবে হল না, সময় করে উঠতে পারিনি।
”দাও চেষ্টা করে দেখব।”
রোজা চেয়ারের সারির ভিতরে এসে ঝুঁকে হুকে ঝোলানো চামড়ার থলিটা নামিয়ে ছোট্ট বইটা বার করে সরোজের হাতে দিল।
”দিল্লিতে আমি আপনার কাছ থেকে বইটা নিয়ে নেব।”
”কী করে?”
”আমি তো খেলা দেখতে যাবই।”
”ওর বাবা যে কমপ্লিমেন্টারি টিকিট পায়! বহু টাকার অ্যাড ওদের কোম্পানি স্যুভেনিরে দেয় তো। প্যাভিলিয়ন ব্লকের টিকিট পায়।”
”আপনাকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।”
”নিউজিল্যান্ড টিমে দু-তিনজন ছাড়া সই নেবার মতো এমন কে আর আছে?”
সরোজ অটোগ্রাফ বইটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে হালকা স্বরে বলল। প্রথম পাতায় এক জনপ্রিয় গজল গায়কের সই, তারিখটা চার মাস আগের। দ্বিতীয় পাতায় কেন্দ্রীয় এক রাষ্ট্রমন্ত্রীর দস্তখত, একই তারিখ। অস্ফুটে বলল, ”বইটা তো প্রায় নতুনই।”
”সই ভরতি চারখানা বাড়িতে পড়ে আছে।”
বীণা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল। চোখে উদ্বেগ। ”বাড়িতে এসো দেখাব।”
সরোজ হাসিমুখে রোজার দিকে তাকাল বীণার কথাটা এড়িয়ে গিয়ে।
”ম্যাকগ্রেগরের সই কেনবার মতো নয়? বারোটা সেঞ্চুরি!”
রোজা তার মায়ের চেয়ারের হাতলে বসল। তর্ক করার জন্য তৈরি সে। এই ধরনের আলোচনায় ঢুকতে সরোজের ভালো লাগে না। শুধু সংখ্যা দিয়ে বড়ো-ছোটো মাপ কষা। ম্যাকগ্রেগরকে এখনও সে ব্যাট করতে দেখেনি, রোজাও দেখেনি।
”ক্রিস বয়েড? এখন তো ওয়ার্ল্ডের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন! আটাত্তরটা উইকেট, সাতশো আটাশ রান। টোনি পিকার্ড? গত বছর টেন্টব্রিজে একাই তো নিউজিল্যান্ডকে জিতিয়ে দিচ্ছিল, পাঁচ বলে তিন উইকেট! ওর মতো অফস্পিনার এখন ইন্ডিয়ার আছে কি?”
সরোজ হাসিসমেত মুখটা বীণার দিকে ফিরিয়ে বলল, ”রোজা এখন কী পড়ছে?”
”ফার্স্ট ইয়ার আর্টস, ইকনমিক্স অনার্স… লেডি শ্রীরামে পড়ছে। বড্ড তর্ক করে…যে-কোনো সাবজেক্টে। আমার সঙ্গে তেমন জমে না, বাবাকে পেলে শুরু হয়ে যায় দুজনের।”
”পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব, তবে ক্রিকেটটা বাদ দিলেই ভালো হয়।”
সলজ্জমুখে রোজা উঠে দাঁড়াল। আবার সরোজের চেয়ারে সে ফিরে যাবার পর বীণা বলল, ”প্লিজ একটু চেষ্টা কোরো, খুব আশা করে আছে।”
”করব। তবে বুঝতেই পারছ, নিশ্চিত করে তো এসব ব্যাপারে…।”
সরোজ বলতে চেয়েছিল, খেলোয়াড়রা যে-ভাষা পড়তে পারে, সেই ভাষার লোককেই সমীহ করে, তাদের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করে। ভারতে বাংলা জানা বড়ো বড়ো খেলোয়াড় ফুটবলে ছাড়া আর কোথায়? বাংলা কাগজের লোক বললে বেশিরভাগই তো দেঁতো হাসি দেখিয়ে দেয়। বহুভাষী এই দেশে খেলোয়াড়দের কাছে কদর ইংরেজি কাগজের আর ম্যাগাজিনের, এই ভাষাটাকেই ক্রিকেটাররা খাতির করে, যেহেতু ভারতের সর্বত্র এই ভাষার কাগজ ওরা দেখতে পায়। আমি বাংলা কাগজের লোক, একমাত্র ভবানীই হয়তো আগ্রহ নিয়ে কথা বলবে কিন্তু অনুরোধ রাখাটা অন্য ব্যাপার। শুনেছি ও বেপরোয়া উদ্ধত প্রকৃতির উড়নচণ্ডে, লঘুগুরু জ্ঞানটা কম।
”গায়ে দেবার জন্য তুমি গরম কিছু আনোনি?”
সরোজ লঘুভঙ্গিতে বলল, ”এ-ব্যাপারেও আমি একদম বদলাইনি।”
”সেকী! কী শীত এই ডিসেম্বরে কানপুরে-দিল্লিতে পড়ে তা কি জানো?”
”তিন-চারবার দিল্লিতে, একবার কানপুরে ডিসেম্বরে থেকেছি, শীত লাগেনি।”
”আমার কাছে একটা শাল আছে ওটা রাখো, বেশি বাহাদুরি কোরো না।”
রাত্রে আমিষ না নিরামিষ খাবে জানার জন্য রেস্টুরেন্টের লোক জিজ্ঞাসা করতে করতে এদিকে এগিয়ে আসছে। সরোজ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। এবার সে নিজের জায়গায় যাবে।
”এখানে বসেই খেয়ে নাও।”
”আমি রেলের খাবার খাই না।”
সরোজ সরু পথটায় বেরিয়ে এল। তাকে দেখে রোজাও উঠে দাঁড়িয়েছে, সরোজ হাত নেড়ে ডাকল।
”এবার নিজের চেয়ারে বোসো, ডিনার সার্ভ করার সময় হয়ে গেছে। ভেজ না নন-ভেজ?”
”আমরা দুজনেই ভেজ।” বীণা বলল।
এরপর সরোজ নিজের চেয়ারে চলে আসে। কালোকোট পিছন থেকে ঘাড়ের কাছে মুখ এনে বলেছিল, ”আমি বলে দিয়েছি আপনি নন-ভেজ খাবেন…বাঙালি তো…ঠিক বলিনি?” সরোজ ”হুঁ” বলে ঘাড় ফিরিয়ে যোগ করে, ”আমি রাতে খাব না, ওটা আপনার জন্য।” পাশের ছেলেটি এক সময় তাকে বলেছিল, ”অনেক খবর রাখে রোজা, ক্রিকেটের পোকা।”
