”তার জন্য এতদূর আসা! বললেই পারতিস বাড়িতে গিয়ে দেখা দিয়ে আসতাম।” সরোজ মিটমিট হেসে বলেছিল।
”বাড়িতে নয়, বাড়িতে নয়, কলেজে একদিন আসুন তাহলে খুব ভালো হয়।”
সুজাতা ব্যগ্র হয়ে বলেছিল, ”আমরা স্কটিশে পড়ি।” সরোজের কৌতূহল বেড়ে গেছল সুবীরের মুখটেপা হাসিতে।
”একবার ঘুরে আয় না ওদের কলেজ থেকে।”
কিছু একটা ব্যাপার আছে, পরে জেনে নেবে। সরোজ খাতার পাতার এককোণে ছোটো অক্ষরে ইংরেজিতে সই করে দিয়েছিল।
”বা-রে, কাকে সই দিলেন সেটা তো লিখলেন না, আর শুধু সই কেন দু-চারটে কথাও তো লিখে দেবেন।”
সুজাতা বলেছিল। ”কী লিখতে হবে?” সরোজ জানতে চায়।
”চেনা পরিচিতদের জন্য যা লিখে দেয়, এসব কি বলে দিতে হয় নাকি?”
সুজাতাকে কিঞ্চিৎ মুখফোঁড় বলে তার মনে হল। দু-চার কথা কী লিখবে সেটা ভাবতে ভাবতে সে বীণার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ-ই তার মনে হল মেয়েটিকে বেশ দেখতে। সপ্রতিভ, বুদ্ধিদীপ্ত মুখ আর দেহগড়নও উদ্দীপক। সে ইংরেজিতে লিখল: ”বীণা সেনগুপ্তকে-তোমার বহু অনুরাগীর মধ্যে যে নিকৃষ্টতম ও অযোগ্য, সরোজ বিশ্বাস।” খাতাটা বন্ধ করে বীণার হাতে দিয়েই সে তাঁবুর মধ্যে চলে যায় প্যাড পরার জন্য। সেদিন পঁয়তাল্লিশ মিনিটে সে একশো এগারো করে তাতে ছিল ন’টা ওভার বাউন্ডারি!
”প্লেয়ারদের বিশেষত ক্রিকেটারদের জন্য মেয়েরা যে কেন এত উতলা হয় আজও বুঝি না। সিরিজের পর সিরিজ তো শুধুই হারে তবু এদের জন্য…”
সরোজ থেমে গেল। আর বেশি বলা ঠিক হবে না। বীণা তার মেয়ের জন্য টেস্ট ক্রিকেটার ধরে দিতে অনুরোধ করছে এবং এত বছর পর প্রথম সাক্ষাতে কিনা এটাই প্রাধান্য নিল! ব্যাপারটা কীরকম যেন হাস্যকর ঠেকছে। তাদের এত নিবিড় সম্পর্কটার কোনো রেশই যেন আর নেই। মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলায় ঠিকই, কিন্তু সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া কি সম্ভব!
”তোমার স্বামী কী করেন? বাড়ি কি নিজেদের?”
”হ্যাঁ নিজেদের। মিস্টার রাও এখন একটা ইলেকট্রিকাল বিজনেস গ্রুপের এরিয়া সেলস কন্ট্রোলার, এখন দিল্লিতে নেই একটা প্রোজেক্টের কাজে জয়পুর গেছেন।”
”রাও মানে তেলুগু?”
”না না না, তেলুগু নয় মারাঠি, এই ভুলটা সবাই করে।”
বীণা অনেকক্ষণ ধরে হাসল, তার সঙ্গে সরোজও।
”আমার কি দোষ বলো, রাও যে দুজাতেই আছে… একবার এমন ভুল হয়েছিল নায়ার নিয়ে। কেরলেও নায়ার আছে আবার পাঞ্জাবেও আছে, একই বানান। জানতাম না পাঞ্জাবের উচ্চচারণ নাইয়ার।”
দুজনের মধ্যে পোশাকি ব্যবধানটা অনেক কমে এসেছে। সরোজ ঠিক করল বীণার বর্তমান জীবনের খবর নিতে আর একটু এগোনো যেতে পারে।
”মারাঠিদের বউয়েরা কি সিঁদুর পরে না?”
বীণার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। সোজা জবাব দিল না।
”এসবও তুমি লক্ষ করো নাকি!”
চাপা ভর্ৎসনাটা ধরে ফেলে সরোজ প্রসঙ্গান্তরে যাবার চেষ্টা করল।
”দিল্লিতে বাড়ি করেছ মানে ওখানেই সেটল করবে বা করেছ?”
”হ্যাঁ। আমরা নিজেদের দেশে আর ফিরব না। ফিরে লাভই বা কী, রোজাই আমাদের সব, ও দিল্লিরই মেয়ে।”
”কলকাতায় কোথায় গেছলে?”
”দু’দিনের জন্য গেছলাম বড়দির বাড়িতে, ঠিক দুটো দিন। ওর সেজোমেয়ের বিয়ে… সম্পর্ক-টম্পর্ক তো আর তেমন নেই, একদমই যাবার ইচ্ছেও ছিল না, উনিই জোর করে পাঠালেন। রোজাকে মামাবাড়ির আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে রাখার খুবই ইচ্ছে ওঁনার, তাই গেলাম। বড়দির অবস্থা দেখলাম ভালোই।”
সরোজ শুনে গেল আগ্রহ দেখিয়ে। এবার তার ব্যক্তিগত খবরাখবর নিতে বীণার প্রশ্ন করার পালা আসছে। অস্বাচ্ছন্দ্য বোধটা শুরু হবার আগেই রোজাকে দেখা গেল বীণার পাশে।
”মা, তোমার কাছে আর বাবলগাম আছে?”
”নেই, কেন কী হবে, এসব জিনিস অত খাও কেন? দিনরাত শুধু মুখনাড়া…”
”আমার জন্য নয়, পাশের ছেলেটিকে…।”
”থাক এখন। শোনো, আঙ্কলকে বললাম তোমার হিরোর সঙ্গে দিল্লিতে খেলার সময় আলাপ করিয়ে দেবার জন্য আর বাড়িতেও একদিন ডিনারে যাতে আসে।”
”রি-য়্যা-ল্লি!”
রোজা দু’হাত মুঠো করে গোড়ালি তুলে শরীর ঝাঁকাল।
”উফফ কী দারুণ যে হবে। ভবানী ঘোষাল আমাদের বাড়িতে আসছে, ভাবাই যায় না!”
রোজার কণ্ঠস্বরে বা ভাবভঙ্গিতে আদিখ্যেতা নেই, অন্য কেউ হলে মনে হত প্রায় ন্যাকামি কিন্তু সরোজ ওর জ্বলজ্বলে চোখে আর শক্ত করা মুঠোয় অপ্রত্যাশিত বিস্ময় ও আনন্দের ধাক্কা ছাড়া কৃত্রিমতার ছিটেফোঁটাও পেল না।
”কিন্তু খেলার সময় প্লেয়াররা কারুর বাড়িতে যাবে কি না, সেটা আগে থেকে এভাবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।”
”তুমি বললেও আসবে না, তা হতে পারে!”
সরোজ বিরক্ত বোধ করল, মাথাটাও গরম হয়ে উঠছে। টেস্ট ম্যাচ ও টেস্ট ক্রিকেটাররা এখন যে কত জমকালো ব্যাপার বীণাকে তা বোঝানো যাবে না। সাধারণ রঞ্জি ট্রফি ক্রিকেটারদের সঙ্গে মর্যাদায় বা আভিজাত্যে যে কত তফাত ওর কন্যাস্নেহে ভরা মাথার মধ্যে তা ঢোকানো যাবে না।
”আমি কে যে বললেই আসবে?” সরোজের গলায় ঝাঁঝ এসে পড়েছে। সামলে নিয়ে নরম স্বরে বলল, ”কত স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিনের মধ্যে যে ওদের থাকতে হয়। ম্যানেজারের পারমিশন ছাড়া কেউ এক পা-ও বাইরে যেতে পারে না, গেলেও কাঁটায় কাঁটায় ফিরতে হবে। না হলে বোর্ডের কাছে রিপোর্ট যাবে।”
লহমার জন্য ভেবে নিয়ে সরোজ যোগ করল, ”টেস্ট কেরিয়ারই খতম হয়ে যেতে পারে।”
