”ভীষণ মোটা হয়ে গেছলাম। গত চার বছর ভিগারাসলি এক্সারসাইজ, জগ আর ডায়াট কন্ট্রোল করে একান্ন কেজি-তে এসেছি। এখন আমার ওয়েস্ট লাইন থার্টি টু।”
”নিশ্বাস বন্ধ করে ভেতরে টেনে ধরে?”
”মোটেই না মোটেই না, নর্ম্যাল ব্রিদিংয়েই থার্টি টু। এখন বসে আছি তাই বোঝা যাবে না।”
কোমরের একরাশ কাপড় থেকে চোখ তুলে সরোজ দেখল বীণার চোখে রীতিমতো উদ্বিগ্নতা। চার বছরে কষ্ট করে পাওয়া কৃতিত্ব কেউ নস্যাৎ করে দিক এটা যেন ও চায় না।
”একটা না হয় কমিয়েছ, আর দুটো?”
”কীসের আর দুটো?”
”ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের।”
বীণা কয়েক সেকেন্ড সময় নিল হৃদয়ঙ্গম করতে তারপরই ডান তালুটা আলতোভাবে সামনে ছুড়ে শব্দ করল, ”অ হ হ হ…তোমার স্বভাব আজও বদলায়নি।”
সরোজ চকিত হল। কথাবার্তা পুরনো দিনে না ফিরে যায়! তাহলে কোণঠাসা হয়ে পড়বে সে। বীণা বিশ্বাস করত তাদের বিয়ে হবে, সেই বিশ্বাসেই জামসেদপুরে…।
কথা ঘোরাবার জন্য সে বলল, ”তুমি দিল্লিতে থাকো?”
”হ্যাঁ। কানপুরের পর তো খেলা দিল্লিতে, এসো না আমার বাড়িতে। গ্রেটার কৈলাসে থাকি।”
”আমি চিনি না, চিনে যেতেও পারব না।”
”কোথায় উঠবে ঠিকানাটা দিয়ো, গিয়ে নিয়ে আসব, হয় আমি কিংবা রোজা…”
”রোজা কে?”
”আমার মেয়ে, তোমায় যে ডেকে আনল।”
শিরদাঁড়া সোজা করে গলাটা একটু উঁচিয়ে বীণা মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। সরোজও তাই করল। মেয়েটি ঝুঁকে কথা বলছে আর পাশের ছেলেটি মাথা কাত করে শুনছে।
”যেজন্য ডাকা,” বীণা গুছিয়ে বসে গলাটাকে গম্ভীর করে বলল, ”রোজা একটা প্রচণ্ড ক্রিকেটপাগল। গত সাত-আট বছরে দিল্লিতে খেলে গেছে এমন কোনও নামী ক্রিকেটার নেই যে ওর অটোগ্রাফ বুক-এ সই দেয়নি। জ্যোতিষ যখন তোমার কথা বলছিল ও তো তখন লাফিয়ে উঠল, একজন স্পোর্টস রিপোর্টারকে আমি চিনি অথচ ওকে এতকাল সেটা বলিনি, এই নিয়ে তো আমাকে খুব এক হাত নিল। নতুন নতুন কারা যেন এখন খুব নাম করেছে বিশেষত একটি বাঙালি ছেলে…”
”ভি. এস. ঘোষাল, ভবানীশঙ্কর ঘোষাল…ভুবু বলেই সবাই ডাকে।”
”রোজা তো পাঁচটা দিন কলেজ কামাই করে সারাক্ষণই রেডিয়োয় কান লাগিয়ে বসেছিল মাদ্রাজে আগের খেলাটার সময়। ডেবুতেই ডাবল সেঞ্চুরি ওর আগে ভারতের কেউ নাকি করেনি?”
”না, এই প্রথম…দারুণ খেলেছে। আমি অবশ্য মাদ্রাজ যাইনি তবে যা শুনেছি মনে হল জিনিয়াস। বাঙালিরা তো খুব বেশি টেস্ট খেলেনি, বহুকাল বাদে পঙ্কজ রায়ের পর একজনকে পাওয়া গেল। ভারতেও ভবানীর মতো এতবড়ো ব্যাটসম্যান কমই হয়েছে। প্রথম টেস্টেই দু’শো এক নট আউট!”
”কলকাতার ছেলে, তোমার সঙ্গে নিশ্চয় আলাপ আছে।”
”হুঁ।” সরোজ দ্বিধা না করেই বলল। আলাপ বলতে যা বোঝায় তা একদমই নেই। বস্তুত ভবানীশঙ্করকে সে প্রায় চেনেই না, এখনও পর্যন্ত কোনও বড়ো ম্যাচে ওকে ব্যাট করতেও দেখেনি। গত বছর রঞ্জি ট্রফিতে প্রথম খেলতে নেমে চারটে সেঞ্চুরি করেছে, সব বাংলার বাইরের মাঠে। তার একটা দিল্লির, একটা কর্ণাটকের বোলিং থেকে। সরোজ তা দেখেনি। বোম্বাইয়ে ইরানি ট্রফিতেও সেঞ্চুরি করে, পুনেতে কোচিং কাম সিলেকশন ক্যাম্পেও বড়ো রান করেছে কিন্তু সরোজ তা-ও দেখেনি। কলকাতার ময়দানে লিগ বা নক আউটের খেলা সে দেখতে যায় না যেহেতু রবিবার তার ছুটির দিন। তা ছাড়া গন্ডা গন্ডা একদিনের ম্যাচের ফলটুকু ছাড়া আর কিছু তার কাগজে ছাপা হয় না। মাঠ থেকে ফলসংগ্রহ করে আনার কাজটা করে জুনিয়র রিপোর্টাররা। ভবানী গত বছর দশ-এগারোটা সেঞ্চুরি করেছে, বছরের সেরা ব্যাটসম্যান হয়েছে, এই পর্যন্তই সে জানে। তবে সি এ বি অফিসে, সেক্রেটারির ঘরে একবার সে ভবানীশঙ্করকে দেখেছিল। হিলহিলে শরীর, রোগাই বলা যায়। অসম্ভব ফরসা, প্রায় ছ’ফুট, চওড়া কবজি, পাতাকাটা চুল ঝকঝকে চোখের মণি, বোতামখোলা শার্টের ফাঁক দিয়ে বুকের চুল দেখা যাচ্ছে, থুতনিটা চাপা, ঈষৎ মোটা নাক এবং পাতলা ভ্রূদুটি জোড়া। সব মিলিয়ে আকর্ষণীয়।
”টিকিটটা তাহলে কাল দুপুরে কার্তিকদার কাছ থেকেই নোব, পরশু ফ্লাইট ক’টায়?”
সরোজ এত ভরাট কণ্ঠস্বর আগে কখনও শোনেনি। সে বাধ্য হয়েছিল ওর মুখের দিকে তাকাতে।
”মর্নিং ফ্লাইট, ঠিক ক’টায় সেটা জেনে নিয়ো।”
সরোজের সঙ্গে চোখাচোখি হতে ভবানীশঙ্কর হেসে মাথাটা ঝোঁকাল এবং বেরিয়ে গেল।
”বোম্বে যাচ্ছে ইরানি ট্রফির জন্য?”
সরোজ জিজ্ঞাসা করেছিল সেক্রেটারিকে।
”হ্যাঁ। যদি ভালো রান পায় তাহলে টেস্টে এসে যাবে। টেকনিকটা ভালো, ফুটওয়ার্ক আছে, সব থেকে বড়ো কথা যেটা…টেম্পারামেন্ট, তা-ও দারুণ।”
ভবানীশঙ্কর আগে কখনও যা করেনি, ইনিংস ওপেন করে অষ্টআশি রান করেছিল আড়াই ঘণ্টায়।
”রোজাও তাই বলল, কলকাতার ছেলে যখন নিশ্চয় কলকাতার রিপোর্টারের সঙ্গে আলাপ আছে। আঙ্কলকে ধরব ভালো করে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য। ওর খুব ইচ্ছে বড়ো কোনো প্লেয়ারকে বাড়িতে আনার। ওই বন্ধুবান্ধবদের দেখানো আর কী, বোঝই তো।”
মেয়ের আবদারকে প্রশ্রয় দিয়ে বীণা হাসছে। মুহূর্তে সরোজ প্রায় সিকি শতাব্দী পিছিয়ে বীণাকে দেখতে পেল। তখন সে তার জীবনের দ্বিতীয় রঞ্জি ম্যাচে আসামের দ্বিতীয় ইনিংসে এক ওভারে চারজনকে সুবীরের বলে স্টাম্প করে খবরের কাগজে ছবি আর কয়েকটা লাইন পেয়েছে। একদিন ক্লাবের খেলায় লাঞ্চের পর তাঁবুর বাইরে বেঞ্চে বসে সে দাঁত খুঁটছিল তখন সুবীর দুটি মেয়েকে সঙ্গে করে তার কাছে আসে। পরিচয় দেয়- বোন সুজাতা আর বোনের বন্ধু বীণা সেনগুপ্ত, দুজনেই আই এ সেকেন্ড ইয়ার, ওদের হাতে বই খাতা। সুবীরের বাড়িতে সে কয়েকবার গেছে। অনেকগুলি বোন, এই বোনটিকে সে দেখেছে কি না মনে করতে পারল না। বীণা একটা খাতা খুলে তার দিকে এগিয়ে ধরতেই সে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সই অর্থাৎ অটোগ্রাফ! কেউ তার কাছে এই জিনিসটি কখনও চায়নি, কোনো মেয়ে যে চাইবে সেটা কল্পনা করার মতো সাহসও জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ক্লাবের অনেকেই তখন না-দেখার ভান করে লক্ষ করছিল। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে রঞ্জি ট্রফি ক্রিকেটারের সই নেওয়ার জন্য ময়দানে ক্লাব তাঁবুতে দুটি মেয়ের আসা রীতিমতো ঘটনা। সে বিব্রত হয়ে বলেছিল, ”সই!…কী করলাম আমি যে… সুবীরের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই তো হত, কষ্ট করে আবার এখানে আসার…!” সুবীরই জবাব দিয়েছিল, ”তোকে দেখার জন্য এসেছে। কীরকম কিপ করিস স্বচক্ষে দেখবে বলেই…কিন্তু বীণা তোমরা দেরি করে এসেছ। আমাদের ফিল্ডিং তো হয়ে গেছে তবে সরোজের ব্যাটটা দেখতে পাবে।” বীণা সপ্রতিভভাবে বলেছিল, ”তাই দেখব, শুনেছি উনি নাকি খুব পিটিয়ে খেলেন।” সরোজ মনে মনে যতটা বিগলিত হয়েছিল ততটা কৌতূহলীও। মেয়েটি পেশাদার সই-শিকারি নয়, তাহলে বাঁধানো অটোগ্রাফ বুক সঙ্গে থাকত। তাকে দেখবে বলে এসেছে, এটাই যেন কেমন কেমন ঠেকছে!
