”বলো।”
বীণা মাথা নামিয়ে হাতের ঝোলাটার ভিতর কী যেন খুঁজছিল। সরোজ সিঁথিতে সিঁদুর দেখতে না পেয়ে গোলমালে পড়ল। বিধবা! অ-হিন্দু বিয়ে করেছে? নাকি কুমারীই রয়ে গেছে? কুমারী শব্দটা বীণার ক্ষেত্রে যে প্রযোজ্য নয় শুধু সরোজই তা জানে। বীণার কৌমার্য আর বিহারের বোলিং একই দিনে সে নস্যাৎ করেছিল জামসেদপুরে। একটি কিনান স্টেডিয়ামে অন্যটি টাটার গেস্ট হাউসের একটি ঘরে। বরং অবিবাহিতা শব্দটাই টেকনিক্যালি কারেক্ট। কিন্তু মেয়েটি যে ‘মা’ বলল! পালিতা নাকি?
ধীরে সুস্থে বীণা মুখ তুলল। মুখভাবে কোনো আড়ম্বর নেই। এতদিন পর দেখা, সেটা বোঝাবার জন্য কৌতূহল, আড়ষ্টতা, ব্রীড়া, স্বর পরিবর্তন ইত্যাদির মধ্যে না গিয়ে ঝোলার দড়িটা টেনে মুখ বন্ধ করে বলল, ”ব্যস্ত যদি না থাকো তাহলে বলব কিছুক্ষণ বসো।”
বীণা তার পাশে জানলার ধারের একমাত্র খালি চেয়ারটার দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখাল। সরোজ পিছনে তাকিয়ে দেখল তার চেয়ারে বসে মেয়েটি পাশের ছেলেটিকে কী জিজ্ঞাসা করছে।
”না ব্যস্ত নই।”
বীণার দিকে পিঠ ফিরিয়ে চেয়ারটায় পৌঁছবার সময় সরোজ সতর্ক হয়েছিল যাতে হাঁটুর সঙ্গে তার স্পর্শ না ঘটে। সে এখন অপরিচিত এক ভদ্রলোক এবং বীণা অবশ্যই অপরিচিতা প্রতিবেশিনী, এভাবেই প্রথমে শুরু হোক।
চেয়ারের পিঠটা পিছনে হেলিয়ে দিল বীণা। সরোজও তাই করবে কি না ভেবে হাতটা আসনের পাশে নিয়ে গিয়েও তুলে নিল। ও যা করবে আমাকে এখনও তাই করতে হবে নাকি! উনিশ-কুড়ি বছর আগে এসব ব্যাপার হত। তখন সে ছিল প্রেমিক।
”হেলিয়ে নাও, তাহলে কথা বলতে সুবিধে হবে।”
সরোজ চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে দিয়েও সিধে হয়ে বসে রইল।
”কানপুর যাচ্ছ?”
”হ্যাঁ।” প্রশ্নসূচক ভ্রূ তুলে সে তাকিয়ে রইল।
বীণার ঠোঁটে হাসি জমে উঠল। চেয়ারের দুই হাতলে ওর কনুই, হাতের দশটি আঙুল কোলে জড়াজড়ি করে রাখা অনুত্তেজিত অলসভঙ্গি।
”স্পোর্টস রিপোর্টার এই সময় এই ট্রেনে, এদিকে কানপুরে টেস্ট ম্যাচ…তাই মনে হল।”
”ঠিকই বলেছ।” সরোজের ইচ্ছা হল জিজ্ঞাসা করে, আমি স্পোর্টস রিপোর্টার তা জানলে কী করে? তারপরই মনে হল, নাম দিয়ে কাগজে তার অসংখ্য বার লেখা বেরিয়েছে, বীণা নিশ্চয়ই তা দেখে থাকবে।
”জ্যোতিষকে মনে আছে? এখন দিল্লিতে রেলভবনে ডেপুটি সেক্রেটারি র্যাঙ্কে রয়েছে। কথায় কথায় একদিন ও বলেছিল তুমি স্পোর্টস রিপোর্টারি করছ বাংলা কাগজে, কী নাম কাগজের?”
”প্রভাত সংবাদ।”
”ওহ, বেশ বড়োই কাগজ তো, বাবা পড়তেন।”
”তুমি দিল্লিতে থাকো নাকি?”
”হ্যাঁ, কিন্তু কলকাতার কাগজটাগজ আর পড়া হয় না। বাড়িতে টাইমস আর স্টেটসম্যান দুটো রাখা হয়।”
”দুটো!”
”কর্তার জন্য।”
বীণা ডান পায়ের ওপর বাঁ পা তুলল। নখে গাঢ় খয়েরি রং। সরোজ নিশ্চিত হল দুটির উত্তর পেয়ে। বিধবা নয় এবং বিবাহিতা। কিন্তু সিঁদুর নেই কেন! কৌতূহল দেখানোটা কি ঠিক হবে?
”জ্যোতিষ বলল তোমার লেখা একটু রোমান্টিক, সাহিত্য ঘেঁষা, তাই খুব পপুলার।”
”ওর সঙ্গে দেখা হয়?”
জ্যোতিষের বেকবাগানের বাড়িতে সে আর বীণা বহুবার গেছে। জ্যোতিষের বোন নমিতা আর বীণা কলেজে একই ক্লাসে পড়ত।
”মাঝে মাঝে আসে বউ নিয়ে, দিল্লিতেই বিয়ে করেছে, পাঞ্জাবি মেয়ে। নমিতা এখন জার্মানিতে, ডিভোর্সের পর আর বিয়ে করেনি।”
”তুমি আমাকে দেখলে কখন? ঠিক চিনতে পেরেছ তো!”
বীণা হাসল। উত্তরটা সোজা না দিয়ে বলল, ”আমাকেও তো তুমি দেখতে পেয়েছিলে।”
ভান করে বা মিথ্যে বলে আর লাভ নেই। সরোজ সহজ হবার চেষ্টায় একগাল হেসে বলল, ”কখন দেখতে পেয়েছি বলে তোমার মনে হল?”
”ট্রেন ছাড়ার আগে, আমি ওই গাধাটার সঙ্গে যখন তর্ক করছিলাম।”
”তাহলে আমি খুব একটা বদলাইনি।”
”ভুঁড়ি হয়েছে, চুল পাতলা আর পেকেছেও, এ ছাড়া প্রায় একই রকম, চিনতে অসুবিধা হয় না।”
”আরও আছে, গলায় থাক পড়েছে, হাতদুটোও চর্বিতে গোল হয়ে গেছে আর লুকোনো একটা ছোট্ট টাকও মাথায় ঘাপটি দিয়ে আছে।”
”এবার তোমার পালা, বলো কী কী বদল আমার হয়েছে।”
”একতিলও বদলাওনি।”
”বাজে কথা রাখো, ফ্ল্যাটারি করে কোনো লাভ হবে না।”
সরোজ সামান্য অপ্রতিভ বোধ করলেও তা বুঝতে দিল না। হাসিটা ধরে রাখল। ফ্ল্যাটারি করে লাভবান হবার মতো সম্পর্ক আর তাদের মধ্যে নেই। কিছু একটা বলে তো কথাবার্তা চালিয়ে যেতে হবে, তাই বলা নয়তো বীণার বাহ্যিক বদল অবশ্যই ঘটেছে। চল্লিশের কাছে পৌঁছে ভারতের ক’টা মেয়েই বা শরীরে কুড়ির পর্যায়ের বিভ্রম জাগিয়ে রাখতে পারে?
”মনে হচ্ছে কিছু বলবে, নাকি আমিই বলে দেব।”
”আমি বলেছি একতিলও বদলাওনি। আয়না থাকলে ধরে দেখাতাম, তিলটা সত্যি একই জায়গায় একই সাইজে একই রঙের আজও, কিচ্ছুই বদলায়নি।”
বীণা তার চোখের দিকে সোজা তাকাল এবং কয়েক সেকেন্ড দুজনে চাহনি আবদ্ধ রেখে পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কীই বা আর বোঝার আছে? সরোজ মনে মনে হিসেব কষল, আমাদের মধ্যে তো কোনো প্রয়োজনই আর নেই, না দেহের না মনের। এতকাল দেখা হয়নি কিন্তু দিব্যিই তো আমাদের দিন কেটে গেছে, এভাবে বাকি জীবনটাও কেটে যেত। কয়েক ঘণ্টার জন্য বহু লোকের সঙ্গে আলাপ হয়, এটাও তেমনি। কিছু কৌতূহল তৈরি হওয়া, মিটিয়ে নেওয়া। তবে পার্থক্য এই যে আমরা পরস্পরের জীবনের চারটে বছরের কিছু কিছু খবর জানি। এখন যা-কিছু কথা তা সব ওই চার বছরের চোঁয়া ঢেকুর। ওকে খুশি মনে হচ্ছে, তাহলেই ভালো।
