স্নান সেরে সরোজ বিছানায় চিত হয়ে মাথার পিছনে দু’হাত রেখে চোখ বুজিয়ে নিজেকে প্রায় সিকি-শতাব্দী পিছনে ঠেলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে।
অফিসের লোকটি ঠিক দশটায়ই এসেছিল, তার সঙ্গে মান্না বেরিয়ে গেছে। কখন ফিরবে ঠিক নেই। বাইরেই সে খেয়ে নেবে। সরোজও তাই ঠিক করেছে। মল রোডে একটা চিনে খাবারের দোকান গতবার পেয়েছিল, কলকাতার রান্নারই মতো। সেখানেই খেয়ে নেবে। হোটেলের তেল ঝালমশলায় চোবানো স্বাদু খাদের থেকে চিনা খাবার নিরাপদ। একটা টেস্ট ম্যাচ মানে আট-ন’দিন থাকা। শরীরের যাবতীয় নিরাপত্তার দিকে কঠিন নজর দিতে হয়। কলকাতার বাইরে প্রথম বেরিয়েছিল দিল্লিতে ডেভিস কাপের খেলা রিপোর্ট করতে। উঠেছিল কনট প্লেসের একটা হোটেলে। দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই বুঝতে পারে, কী মারাত্মক ভুলই না করেছে সে। গত রাত্রে হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে প্রবল আগ্রহে অচেনা দহি-মাটন আর পনির-পালংয়ের সঙ্গে পাকস্থলীর পরিচয় করিয়ে দিয়ে পরস্পরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষে নিশ্চয় সারারাত ধরে ওরা ঝগড়া করে গেছে। তারই ফলে দেহের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের জন্য খাদ্যবস্তুগুলির তাড়না সরোজকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। সেদিনই প্রধানমন্ত্রীর সফদরজং রোডের আবাসে ছিল খেলার সূচি তৈরির লটারি। সরোজ সারাদিন বিছানায়, রিপোর্ট পাঠাতে পারেনি। পরদিন দিল্লি অফিসে তার জন্য কলকাতা থেকে বার্তা সম্পাদকের টেলেক্স আসে :
”যদি মনে করে থাকেন খেলার সূচি নির্ধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানটি রিপোর্ট করার মতো ব্যাপার নয় তাহলে পরের ট্রেনে কলকাতায় ফিরে আসতে পারেন।” টেলেক্সটা হাতে নিয়েই সরোজ দেখেছিল কলকাতা থেকে বিমানে আসা সেদিনের প্রভাত সংবাদের প্রথম পাতায় ডাবল কলাম শিরোনাম : ‘কৃষ্ণনগর আশা প্রেমজিত প্রথম ম্যাচ জিতবে।’ নীচে বারো পয়েন্টে-সরোজ বিশ্বাস। এজেন্সির পাঠানো খবর থেকে ডেস্কে কেউ তৈরি করেছে, তার নাম দিয়ে ছাপা হয়েছে। বরফের চাঙড়ের উপর খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো অনুভূতিতে তখন তার সর্বাঙ্গ যেরকম অসাড় হয়ে গেছল অনেকটা সেই জিনিসই গত সন্ধ্যায় রাজধানী এক্সপ্রেসে সে পেয়েছিল যখন মেয়েটি তার চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে বলল, ”মা আপনাকে ডাকছেন।”
সরোজ প্রথমে না-শোনার ভান করে পাশের ছেলেটির কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া ম্যাগাজিনটিতে আরও মনোনিবেশ করল মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিয়ে। এই সময় মুহূর্তের জন্য তার মনে ভেসে ওঠে ওষুধের দোকানে অঙ্কের মাস্টারমশায়কে দেখে তার ঘুরে দাঁড়ানোটা। পাছে কথা বলতে হয়। সেই দুর্বলতা, সেজন্য সে বরাবরই পিছনের সারির, ভিড়ের মধ্যে গা-ঢাকা দেওয়ার দলে। সরোজের রাগ ধরল নিজের উপর। উদ্ধত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মাথাটা ঝাঁকিয়ে মুখ তুলে সে তাকাল।
নেহাতই কিশোরী। মুখটি লম্বাটে। ফিনফিনে কালো মেটাল ফ্রেমের চশমা। লেন্সের পাওয়ার মাইনাস পাঁচের কম তো নয়ই। তবু কৌতূহলে দীর্ঘ হয়ে ওঠা চোখের মণি দুটি দেখতে অসুবিধা হয় না। ওর নীচের ঠোঁট অবাক করায় সরোজকে। বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল একবার। ছোট্ট এবং পুরু, চিবুকটাও ঝোলানো। আয়নায় বা ছবিতে সরোজ নিজেকে সুযোগ পেলেই খুঁটিয়ে দেখে। নিজের মুখের গড়ন এবং যেগুলোকে তার খুঁত মনে হয়, সবই মুখস্থ রেখেছে। বহুবার মনে হয়েছে তার থুতনিটা আরেকটু চাপা হলে ভালো হয়, কান দুটো খুবই ছোটো, নাকের আর একটু কাছে ভ্রূ দুটোর এগিয়ে আসা দরকার এবং কপালটা ঢিপির মতো উঁচু না হয়ে ঢালু হলে টিকলো নাক ও গালের সঙ্গে মানাত। কিন্তু তার নীচের ঠোঁট ঈষৎ মোটা হওয়াটাকে সে ত্রুটি বলে মনে করে না। মুখের মধ্যে নিয়ে চুষতে চুষতে বীণা বলেছিল, ”বেশ লাগে।”
সরোজের মনে হল এই মেয়েটির নীচের ঠোঁট তারই মতো, চিবুকেও তার আদল আছে। বীণার গায়ের রংই পেয়েছে কিন্তু যথেষ্ট লম্বা, পাঁচ-সাত তো হবেই। আঁটো জিনসটা বোধহয় বিদেশি, ফ্যাকাশে হয়ে আছে দুই ঊরু, হাঁটু ও নিতম্বে। খয়েরি ডোরাকাটা ফুল শার্টটা খুবই কম দামি। মনে হল ব্রেশিয়ার পরেনি। এখন কমবয়সি মেয়েরা সাজসজ্জায় যে হেলাফেলা ভাব দেখায়। তাই মুখে প্রসাধন নেই। উজ্জ্বল চামড়া, পাতলা চুল টান টান হয়ে কপাল কান ঢেকে পিঠে নামানো। তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যেই সরোজের ভালো লাগল মেয়েটিকে। এই চেহারার এবং এমনভাবে সাজা মেয়ে ভারতে এখন অন্তত হাজার দশেক, তবু মেয়েটি কী কারণে যেন তাকে আকর্ষণ করল, সজাগ করে তুলল।
”মা আপনাকে ডাকছেন।”
মেয়েটি আবার বাক্যটি পুনরাবৃত্তি করল। স্বরে অধৈর্যতা নেই। মা একজন পুরুষকে ডাকতে পাঠিয়েছে, এটা যেন বেশ মজার ব্যাপার এমন একটা ভাব ট্রেনের দোলানির সঙ্গে সঙ্গে ওর সর্বাঙ্গে ছড়ানো।
সরোজ অন্য সময় অন্য কেউ হলে অবাক হয়ে বলত, অবশ্যি ভ্রূ কুঁচকে, ”কে তোমার মা?… হ্যাঁ হ্যাঁ… ওহ অনেক বছর পর, কোথায় বসেছে?… আশ্চর্য… আচ্ছা আচ্ছা আমি যাচ্ছি, তুমি ওর মেয়ে হও নাকি?” ইত্যাদি।
উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিনটা আসনের উপর রেখে সরোজ পথটা দিয়ে সামনের দিকে এগোল। সে নার্ভাস নয় কিন্তু অনিশ্চিত। কীভাবে কথা বলবে সেটা নির্ভর করছে কীভাবে বীণা শুরু করবে। যেমন ব্যবহার পাবে তেমনই তার আচরণ হবে এটাই তার সিদ্ধান্ত।
