মুখ টিপে মান্না গভীর কোনো রহস্য যেন উন্মোচন করছে, এমনভাবে শেষ বাক্যটি বলল। সরোজ যথাসাধ্য চোখ দুটিকে অবাক করিয়ে তাকাল।
একতলায় ছোটো উঠোনের তিনদিকে ঘর। আর একদিকে উপরে যাবার সরু সিঁড়ি। তিনতলায় ভিতরের বারান্দা ঘুরে কোণের দিকে নম্বর-আঁটা একটা দরজা। এগারো নম্বর ঘর। প্রৌঢ়-বেয়ারা চাবি দিয়ে দরজা খুলে মান্নার সুটকেস ভিতরে এনে রাখল।
সরু খাট, আয়না লাগানো পালিশ চটা ড্রেসিং-টেবল, চেয়ার, স্টিলের আলমারি যার হাতলে মরচে, প্লাস্টিকের জলের জাগ ও কাচের গ্লাস, সবই একটি করে। খাট ও ড্রেসিং-টেবলের মধ্যে চার হাত মাত্র খালি জায়গা। সরোজ আন্দাজ করল, ওখানেই বাড়তি খাট পড়বে। নিশ্চয় ফোল্ডিং লোহার খাট।
”এ যে অন্ধকূপ, জানলা কই?”
মান্না প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
”এই তো জানলা।”
বেয়ারা দেয়ালে ঝোলানো সবুজ একটা ফুলছাপ দেওয়া কাপড়ের টুকরো সরিয়ে জানালাটা খুলে দিল। দেখা গেল ভিতরের বারান্দা আর দুটো ঘরের দরজা বারান্দার কোণে বসানো কোমর সমান উঁচু জলের ড্রাম।
”ব্যস এই একটা জানলা তা-ও বাইরের দিকে নয়, ভেতরদিকে।” হতাশ মান্না দুটো তালু বেয়ারার দিকে বাড়িয়ে পেতে রইল। বেয়ারার মুখে কোনো বিকার নেই, নিস্পৃহ স্বরে বলল, ”কিছু কি খাবেন?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, দাদার খিদে পেয়েছে, কী মিলবে?” মান্না ব্যস্ত হয়ে উঠল।
বেয়ারা খাদ্য তালিকা মুখস্থ বলে গেল। মান্না জিজ্ঞাসু চোখে সরোজের দিকে তাকাল।
”চার বাটার টোস্ট, দুটো ডবল ডিমের অমলেট আর এক কাপ চা। দুজনের এতে হবে তো?” সরোজের শেষের কথাটি মান্নার জন্য।
”নিশ্চয় নিশ্চয়। তবে চারটের বদলে আটটা টোস্ট করুন, সকালে আবার আমি একটু বেশি…আর জ্যাম জেলিটেলি দেবে তো?”
বেয়ারা মাথা হেলাল। সরোজ ঘরসংলগ্ন স্নানের ঘরের দরজা খুলে উঁকি দিল। প্রায় অন্ধকার এবং ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। বেয়ারা সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল। ছোটো একটা ঘষাকাচের বন্ধ জানলা যেটা হাত তুলে খুলতে হবে। মোজাইকের দেয়াল ও মেঝে। গিজার ও ঝারিসহ জলের কল, প্লাস্টিকের বালতি ও মগ, দেয়ালে কাপড় রাখার রড ও আয়না, বেসিনে মাকড়সার জালের মতো ফাটা দাগ আর হলুদ ছোপধরা একটি কমোড যাতে বসার জন্য গোলকাঠটি নেই।
সরোজ গিজারের চেহারা দেখেই বুঝল ওটি অচল তবু ঝারির কল খুলে জল না পড়ায় সে বেয়ারার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”ইলেকট্রিক তার খারাপ আছে তাই বন্ধ। বাইরে ড্রামে গরম জল পাবেন, বেয়ারাকে বললে বালতি করে এনে দেবে।”
এবার সে সিস্টার্নের হাতল মোচড়াল। জল বেরোল না। বেয়ারা এগিয়ে এসে হাতলটা দুবার জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে মোচড়াল এবং হেঁচকি তুলে বমি করার মতো কিছু জল ওগরাল।
”এইটুকু জল!”
মান্না বিভ্রান্ত চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল। সরোজ কোনো মন্তব্য করল না। ভারতের বহু জায়গায় নানা ধরনের হোটেল-বাসের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, অভিযোগ করে কোনো ফল হয় না। বিনীতকণ্ঠে ‘করে দিচ্ছি’, ‘বলে দিচ্ছি’, ‘এনে দিচ্ছি’ শোনা যাবে কিন্তু করা, বলা বা আনা আর হয়ে ওঠে না।
”ট্যাপ ওয়াটার তো আছে।” সরোজ কলের মাথা ঘোরাতেই তোড়ে জল বেরোল।
”এই দিয়েই কাজ চালাতে হবে আর এটা খাবার জলও।”
”কেন বাইরে থেকে আলাদা খাবার জল এনে দেবে না?”
”একই ট্যাঙ্ক থেকে তো সব কলেই জল আসছে। বাইরে থেকে যা এনে দেবে সেটা এই জলই।”
মান্না হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল।
”দুটো তোয়ালে আর দুটো সাবান দিয়ে যাও আর খাট পেতে দিতে বলো। ব্রেকফাস্ট দিতে কতক্ষণ লাগবে?”
”দশ-পনেরো মিনিটে হয়ে যাবে।”
”এ-ঘরের বেয়ারাকে পাঠিয়ে দাও। গরম জল চাই, কলিং বেল কোনটে?”
সরোজ নিজেই সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে কলিং বেল ছাপ দেওয়া সুইচটা টিপল। বাইরে বারান্দার কোথাও ‘বঁ অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ’ শব্দ হল।
”যাক এটা তাহলে কাজ করে।”
লোকটি ঘর ছাড়তে ইতস্তত করছে। সুটকেসটা বয়ে আনার জন্য বকশিশের প্রত্যাশী। সরোজ তাকে একটা টাকা দিল। খুশি হয়নি, সেলাম দিল না। বয়ে গেল, সরোজ মনে মনে বলল, যেমন হোটেল তেমনই তো বকশিশ হবে।
”বিশ্বাসদা এ কেমন জায়গায় এলুম।”
”এর থেকে ভালো আর কী আশা করেন? ভারতের সব জায়গায়ই এই রেটের হোটেলে এইরকম ঘরই পাবেন।”
তিক্ত স্বরে সরোজ কথাগুলো বলে গ্রিপের চেনটা রাগী মেজাজে একটানে খুলে ফেলল। একে একে ভিতর থেকে জিনিসগুলো বার করে খাটে রাখতে রাখতে আক্ষেপভরে বলল, ”কার মুখ দেখে যে কাল বেরিয়েছিলাম!”
”কিছু বললেন?”
”না বাথরুমে যাবেন তো যান, আমার কিন্তু সময় লাগে।”
”না না আপনি আগে যান। আমি শুধু দাঁত মেজে, দাড়ি কামিয়ে নেব। দশটায় অফিসের লোক আসার কথা তার সঙ্গে বেরোব। ফিরে এসে বাথরুমে ঢুকব।”
”চান করবেন না?”
”ওই তখনই সারব…শীতটা কিন্তু খুব একটা লাগছে না, বোধহয় রাতে পড়বে। আপনি কখন বেরোবেন?”
”দুপুরে। আশ্চর্য! দেখুন দুজনেই কলকাতা থেকে চিঠি নিয়ে আসছি, আপনি ঘর পেলেন অথচ আমি পেলাম না। কতদিন আগে বুক করেছিলেন?”
”আমি তো করিনি। আমাদের এখানকার অফিস বুক করে রেখেছে, হোটেলের সঙ্গে এরিয়া ম্যানেজারের চেনাশোনা আছে।”
”তাই বলুন, ঘর পেতে গেলেও ব্যাকিং দরকার হয়। দাঁত মেজে নিন, ব্রেকফাস্ট এসে পড়বে।”
দুই
উনিশটা বছর নিমেষে পিছিয়ে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। যে-পথ ধরে পিছিয়ে যাবে, সেই পথে প্রচুর আবর্জনা, খানাখন্দ। সেগুলো ডিঙিয়ে আরও চার বছর পিছিয়ে গেলে বীণার সঙ্গে প্রথম আলাপের দিনটায় পৌঁছনো যাবে। অন্যসময় এটা ক্লান্তিকর একটা কাজ কিন্তু এখন তা নয়। বীণা তার জীবনে একমাত্র সুগন্ধী ফুল আর দগদগে ক্ষত।
