মল রোড পার হয়ে রিকশাটা ডানদিকে ঘোরার সময় সরোজ তাকিয়ে দেখল প্রায় পঞ্চাশ মিটার পিছনে রিকশা থেকে হাত তুলে কালোকোট তাকে মন্থর হবার নির্দেশ দিচ্ছে। সরোজ মুখ ফিরিয়ে নিল। এক ধরনের লোক আছে যারা আঠার মতো অন্যের গায়ে লেগে থাকতে চায়, নিজের চেনা গণ্ডির বাইরে গেলেই নার্ভাস হয়ে পড়ে, অন্যের মুখাপেক্ষী হয় ছোটোখাটো প্রতি ব্যাপারে, এই লোকটাও তাই।
একটি মোটর যাবার মতো সরু ইট বাঁধানো গলি দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ মিটার ভিতরে গেলে হোটেল মধুছন্দা। তার চারতলার ছাদের উপর হোটেলের নাম লেখা বিরাট লাল-সাদা সাইনবোর্ডটা দূর থেকে দেখা যায়। রিকশাটা অফিসঘরের সামনে থামতেই গ্রিপটা হাতে নিয়ে সরোজ তিনটে সিঁড়ি ভেঙে ঘরে ঢুকল।
রিসেপশন কাউন্টারে দাড়িওয়ালা যুবকটির চোখের কোলে ঘুমের তলানি এখনও পড়ে আছে। ভারীপাতা তুলে সে তাকিয়ে রইল সরোজের দিকে। সেই সময় কালোকোট রিকশা থেকে নামতে নামতে চেঁচিয়ে বলল, ”স্টেশন থেকে মাইল দেড়েক হবে, কী বলেন?…ভাড়া কি দিয়ে দিয়েছেন?”
”ওহ….হ্যাঁ দিচ্ছি।” সরোজ পকেটে হাত ঢোকাল মানিব্যাগের জন্য।
”রাখুন রাখুন আমি দিয়ে দিচ্ছি, অনেক খুচরো জমে গেছে।”
ব্যগ্র হয়ে কালোকোট হাতে তুলে বাস থামাবার ভঙ্গিতে সরোজকে নিরস্ত করল। যে-কোনো ধরনের আবেগ প্রকাশের জন্য লোকটির দুটো হাতের যে খুবই দরকার হয় এটা সে এবার বুঝে গেল। কথা না বাড়িয়ে সে রিসেপশনিস্টের দিকে ফিরে কাউন্টারে কনুই রেখে ঝুঁকে বলল, ”আমার একটা সিঙ্গল রুম বুকিং আছে…সরোজ বিশ্বাস, কলকাতা থেকে।”
রিসেপশনিস্ট হাত বাড়িয়ে মোটা রেজিস্টারটা টেনে এনে, তার ভেতর থেকে ক্লিপে-আঁটা চিঠি আর চিরকুটের একটা গোছা বার করে, মন দিয়ে সেগুলো উলটেপালটে দেখতে লাগল।
”না, কোনো বুকিং নেই এই নামে।”
”সে কী, আমি তো দু’সপ্তাহ আগে চিঠি দিয়েছি! ফিফটি নাইন বাই টোয়েন্টি, সিভিল লাইন্স, গ্রিন পার্ক…এই ঠিকানাই তো?”
”হ্যাঁ।”
আবার চিঠিগুলো দেখে সে মাথা নাড়ল, ”নেই। কলকাতা থেকে আছে শুধু রবীন্দ্রকুমার মান্না নামে…”
”আমি আমি, আমার নাম রবীন্দ্রকুমার মান্না!…সিঙ্গল রুম।”
উত্তেজিত স্বরে বলে উঠে কালোকোট জ্বলজ্বলে চোখে সরোজের গা ঘেঁষে এগিয়ে এল। নিজের নাম অন্যের মুখে যেন এই প্রথম শুনল। কাউন্টারে হাত দুটি যে কীভাবে রাখবে বুঝে উঠতে পারছে না।
”আমার চিঠি আপনারা পাননি?”
সরোজ আবার জিজ্ঞাসা করল উদ্বিগ্ন স্বরে।
”পেলে তো এর মধ্যেই থাকত।”
সরোজ কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করল রিসেপশনিস্ট সত্যি কথা বলছে কি না। অনেক সময় শাঁসালো বা বোকা লোকেদের বেশি রেটে ভাড়া দেবার জন্য ঘর আটকে রেখে বলে দেয়, নেই বা চিঠি পাইনি। মাঝারি স্বাচ্ছন্দ্যের হোটেল কানপুরে কয়েকটা মাত্র, পাঁচতারা হোটেল শুধু একটি। সব হোটেলেই ঘরের টানাটানি লেগেই থাকে আর এখন তো বেশি করেই হবে।
”কিন্তু আমার যে ঘর চাই।”
কণ্ঠস্বর কাতর, ধীর বিপন্ন করে সরোজ বুঝিয়ে দিতে চাইল নতুবা সে বিপদে পড়বে। এরকম পরিস্থিতিতে সে আগে কখনও পড়েনি। এখন কি আবার রিকশায় চড়ে তাকে হোটেলে হোটেলে ঘুরতে হবে! যদি সব জায়গাতেই বলে, খালি ঘর নেই!
”একটাও খালি নেই।”
সরোজ ফ্যালফ্যাল করে বোকার মতো শুধু তাকিয়ে রইল। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এমন একটা বিপদের সম্ভাবনাকে সে একবারও ভাবেনি। অন্য হোটেলে খোঁজ করতে যেতে হবে কিন্তু ঘর পাবে কি না সে নিশ্চয়তা নেই। এখানে হয়তো খালি ঘর আছে। দাড়িওলা কিছু টাকা কামাবার জন্য বোধহয় প্যাঁচ কষছে।
সরোজ আবার ঝুঁকে চাপা স্বরে বলল, ‘একস্ট্রা দোব…পাওয়া যাবে?”
রিসেপশনিস্ট ঠোঁট মুচড়ে মাথা নাড়ল।
”ঘর একদম নেই। দুটো ঘর আজ দুপুরে খালি হবে কিন্তু বুক করা আছে।”
রবীন্দ্রকুমার মান্না এবার নড়েচড়ে উঠলেন।
”উনি তো আমার সঙ্গে আমার ঘরেই থাকতে পারেন।”
”তা পারেন, একস্ট্রা চার্জ দিতে হবে।”
”দোব…কত?”
”পঞ্চান্ন টাকা প্লাস একস্ট্রা একটা খাট পঁচিশ টাকা।”
”ঠিক আছে। দুজনকে তাহলে একঘরেই দিন।”
রিসেপশনিস্ট খাতাটা ঘুরিয়ে মান্নার সামনে ঠেলে দিল নাম, ধাম, পেশা, আগমন, সময় ও উদ্দেশ্য লিখে দেবার জন্য। রবীন্দ্র মান্না খাতায় লাইনটানা ঘরগুলো ভরতি করল প্রতিটির শিরোনাম দু’বার করে পড়ে নিয়ে।
”আপনার নামটা বলুন?”
মান্না কলম উঁচিয়ে সরোজের কাছে জানতে চাইল। একটা বিশ্রী পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার স্বস্তিটা সরোজকে ইতোমধ্যে কৃতজ্ঞতায় নরম, ঢিলে করে দিয়েছে। মুখে হাসি ছড়িয়ে সে বলল, ”দিন আমিই লিখছি।”
সরোজ যখন লিখছে তখন মান্না ঘাড় বেঁকিয়ে পড়ে যাচ্ছিল।
”আপনি রিপোর্টার, অ্যাঁ কোন কাগজের?”
বিস্ময়, শ্রদ্ধা, তটস্থতা সবক’টির সম্মিলিত ধাক্কায় মান্না এক পা পিছিয়ে গেল।
”প্রভাত সংবাদ।”
”আমি আনন্দবাজার রাখি…এখানে কিছু রিপোর্ট করতে এসেছেন বুঝি?”
”হ্যাঁ…টেস্ট ম্যাচ।”
মান্না হাঁ করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ”টেস্ট ম্যাচ মানে ক্রিকেটের টেস্ট ম্যাচ?…আমি অবশ্য ক্রিকেট খেলার কিছু বুঝি না, ছোটোবেলায়, না ঠিক ছোটোবেলা নয় কলেজে পড়ার সময় একবার একটা টেস্ট ম্যাচ একদিন শুধু দেখেছিলাম জামাইবাবুর টিকিটে। তবে খবরটবর কিছু কিছু রাখি।”
