কিসের জন্য বাঁচা একথা তুলে ভাবতে বসলে বাঁচা যায় না। এ সব প্রশ্নের মাথা খাটিয়ে একটা উত্তর খাড়া করা যায়। কিন্তু শরীরটাকে অস্বীকার করা যায় না। আসলে শরীরের মধ্যেই মনটা থাকে। ফুটো হাঁড়িতে জল থাকে না। সংসারের গোড়াকার দাবিদাওয়া এই শরীরটাকে বাঁচাবার জন্য। যেমন তেমন করে হোক আগে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে। ভালমন্দ বিচার করলে চলবে না। মাধবী সম্মান করল কি করল না তাই নিয়ে মন খারাপ করে কি লাভ! সংসার যদি জীবনের সব রস চুষে খায় তাতেই বা লোকসান কি। প্রয়োজন যখন ফুরিয়ে যায় তখন লাভ কি বেঁচে থেকে? কোন রকমে যখন বাঁচতে হবেই, তখন সাত-পাঁচ না ভাবলেই কি লোকসান হবে কিছু?
লাভ-লোকসান দুটোকেই বিসর্জন দিলে মানুষের আর থাকে কি? কি অদ্ভুত অবস্থা! বিচার বুদ্ধি খাটাবার ক্ষমতাই যদি ফুরিয়ে যায় তাহলে বুঝব কি করে আমি আছি। আমি বেঁচে আছি। অথচ লাভ লোকসানের কথা উঠলেই যন্ত্রণা কামড়ায়। আরশুলাটা খেলার আমোদে নয়, যন্ত্রণায় দাড়া নাড়ছিল তাহলে। টিকটিকিটার ক্ষিদে পেয়েছে। ওর কিছু অন্যায় হয়নি আরশুলাকে মেরে ফেলায়। ক্ষিদে পেলে তাকে মেটাতেই হবে। সংসারের ক্ষিদে আছে। সংসারটা একটা রাক্ষস। টিকটিকি আর সংসার এক জাতের। মানুষে আর আরশুলায় কোন তফাত নেই।
-বসেই আছ যখন আলোটা নিভিয়ে দাও না।
নিজেকে বোকা মনে হল দিনেশের। বইয়ে চোখ রেখে সে বসে আছে অথচ মাধবী ঠিক বুঝে ফেলেছে সে পড়ছে না। বোধ হয় মাধবী এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।-কারেণ্ট খরচা করে না পড়ে, এসময়টা তো বাইরে কাটাতে পার। মহিম ঠাকুরপোর কাছেওতো যেতে পার।
-আজ গেছলুম মহিমের কাছে। অফিসে ফোন করেছিল ছুটির পর রমার জন্য। একটা সম্বন্ধের খোঁজ দিল।
উঠে বসল মাধবী। দিনেশ মুখ ঘুরিয়ে দেখল আরশুলাটাকে। টিকটিকিটা চলে যাচ্ছে। তুলতুলে ভাঁজ পড়ছে পেটে। লেজটা বাঁকানো। কোমল। আরশুলাটা এখনো বেঁচে আছে। বারদুয়েক আছড়াল। আবার যেতে শুরু করেছে টিকটিকিটা। লেজটা সাপের ফণার মত নড়ছে।
-হাঁ করে আছ কেন? সবটা বল।
-ভালই সম্বন্ধটা। কলকাতায় দুখানা বাড়ি আছে।
-কি আছে?
-বাড়ি। সাড়ে চারশো টাকা ভাড়া আদায় হয়। পোস্তায় ঝাড়াই মসলার কারবার আছে।
-ছেলে কেমন?
উঠে এল মাধবী টেবিলের পাশে। একটা কোণ আঁকড়ে ধরে দাঁড়াল। নীল সাপের মতো শিরা, কব্জী থেকে কনুই পর্যন্ত পাকিয়ে দপদপ করছে। হাতটা সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করল দিনেশের।
-ছেলে ভালই।
-লেখাপড়া, বয়স, স্বভাব চরিত্র এসব কেমন?
-ভাল।
-কে বলল তোমায়?
-কে আবার বলবে? ভাল বলতে তুমি কি বোঝ? মদ খায়না, রেস খেলে না, তা হলেই ভাল ছেলে হয়? আজকের দিনে ভালমন্দের কোন তফাত আছে নাকি!
তীব্র চোখে তাকিয়ে রইল দিনেশ। নীল সাপটা ক্রমশ তাকে হিংস্র করে তুলছে। মাধবী আশ্চর্য হয়েছে দিনেশের আচরণে। রাগটাকে চেপে সে বলল:
-তফাত আছে বৈকি। শুধু পয়সা কড়ি দেখলেই চলে না। মেয়ের সুখটা আগে দেখতে হবে।
-তোমার মেয়েই বা এমন কি? ছেলেরাও তো সুখ চায়।
-আমার মেয়েকে পেলে যে ছেলে সুখী হবে, তেমন ছেলেই আমার দরকার। পয়সাওলা ঘরে মেয়েকে না দিলেও দুঃখ নাই।
-কেন পয়সাওলাদের কি হৃদয় বলে কিছু নেই, তারা কি গরীবের মেয়েকে কোনদিন বিয়ে করে না? তাছাড়া মহিম এ সম্বন্ধের খোঁজ দিয়েছে যখন তখন স্বভাব চরিত্রের কথাই ওঠে না।
-তবু আমাদের একটা কর্তব্য আছে।
-সে ত আছেই। জীবনে হাজার কর্তব্য আছে, তার কটা আমরা পালন করি?
-যে কটা পারা যায়, তা করতেই বা ক্ষতি কি! বিয়েটা হেলা-ফেলার জিনিস নয়। তর্ক করে ভালোকে মন্দ করা যায় না। মেয়ের সারা জীবনের সুখ এর ওপর নির্ভর করছে। ছেলের লেখাপড়া কদ্দূর?
-টাকা-পয়সা আছে।
-থাকলেই বা, মেয়ে কি টাকা-পয়সার সঙ্গে ঘর করবে?
-হ্যাঁ, তাই করবে। টাকা-পয়সা না থাকলে শিক্ষাদীক্ষার কোন মানে হয় না।
-বয়স কত?
-বয়স একটু হয়েছে। কিন্তু অত কথায় দরকার কি। কমবয়সী ক্ষয়া চেহারার শিক্ষিত ছেলে তো পথে-ঘাটে দেখা যায়, তুমি তাদের একটার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজী আছ?
-সে অন্য কথা। ছেলের কত বয়েস?
-দুটি মেয়ে আছে, বৌ মারা গেছে। বড় মেয়েটির বছর পনরো বয়স।
মাধবীর হাতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল দিনেশ। শিকার ধরে সাপটা যেন গর্তে লুকোল। দিনেশের মেরুদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত ঠেলে উঠল। কোথায় লুকোল সাপটা? মাধবীর শরীরে চোখ রাখল সে।
-এর থেকে মেয়েটাকে বিক্রি করে দিলেই তো পার, ঘরে টাকাও আসবে, ঝঞ্ঝাটও চুকবে।
-কিন্তু সংসারের কথাটাও তো ভাবতে হবে। আমি আর ক’দিন। পয়সাওলা জামাই কি তোমাদের দেখাশুনো না করে পারবে! ব্যবসায়ীলোক, ছেলেটারও একটা হিল্লে করে দিতে পারবে?
-নিজের যা আছে তাইতেই চালাব, জামাইয়ের দয়ায় থাকব কেন? শুনে লাফিয়ে উঠল দিনেশ, থরথরিয়ে হাঁটু কাঁপছে। মুখে লালা উঠছে। ঢোক গিলল সে।
-খাবে কি? এরপর খাবে কি? তখন তো আমায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে।
মাধবী আবার শুয়ে পড়ল। ঘাড় ফিরিয়ে দিনেশ তাকিয়ে রইল। মাধবী নয়, সেই টিকটিকিটা পরিতৃপ্ত হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে।
সেই দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল দিনেশ।
দেখতে দেখতে অবসাদে ঝাপসা হয়ে আসে দিনেশের চোখ। টেবিলে মাথা রাখে। হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে।
