কিন্তু বীণাকে দেখেই এইরকম ধপ করে বসে পড়া বা মুখটা একটু নামিয়ে সামনের চেয়ারের আড়ালে রাখার চেষ্টাটার মধ্যে সে কাপুরুষতার ছোঁয়া পেল। এরমধ্যে কোনোরকম শোভনতা বা রুচি নেই।
”অ্যাঁ কী বলছেন?” সরোজ মুখ তুলে তাকাল।
”কোন হোটেলে আপনি?”
”মধুছন্দা।”
”আরে আমিও তো! আপনিও কি অফিসের কাজে?”
”হ্যাঁ।”
সরোজ এবার রেগে ওঠার অবস্থায় পৌঁছচ্ছে। গায়েপড়াদের তার ভালো লাগে না।
”আমার ওষুধ কোম্পানি, পেকার অ্যান্ড লরেন্স, আমেরিকান, হেড অফিসে পার্সোনেলে আছি। একটা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছি। আপনি?”
”চলুন সিগারেট খেয়ে আসি। বাইরে কথা হবে।”
বীণা সম্ভবত টয়লেটে গেছে। ফিরে আসার আগেই সে বাইরে যেতে চায়। প্রায় বারো ঘণ্টা তারা এই কামরায় থাকবে। বীণা সামনের দিকে সুতরাং সে যতক্ষণ পিছন ফিরে চেয়ারে বসে থাকবে তার মুখ দেখতে পাবে না। তা ছাড়া রাতের খাওয়ার পর আলো কমিয়ে কামরাটা অন্ধকার করে দেওয়া হবে আর ভোররাতে সে কানপুরে নেমে যাবে। এর মধ্যে তাকে দেখে ফেলার সুযোগ বীণা পাচ্ছে না।
প্যাকেটটা বার করে কী ভেবে আবার কোটের পকেটে রেখে মুচকি হেসে লোকটি বলল, ”দাঁড়ান ভালো সিগারেট খাওয়াব। ভাইপো হামবুর্গ থেকে পরশু এসেছে দু’মাসের জন্য। ভালো চাকরি করে।”
লোকটি নিচু হয়ে সুটকেসটাকে বার করার জন্য টানাটানি শুরু করল। সরোজ উঠে দাঁড়াল। বিলিতি সিগারেটের প্রতি তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। বরং সে দিশি নিজস্ব অভ্যাসেই আরাম পায়।
”আপনি বার করুন আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।”
প্যান্টের পকেটে সিগারেট প্যাকেট ও দেশলাইটা আছে কি না, চাপড়ে দেখে নিয়ে সরোজ সরু পথটায় বেরিয়ে এসে মুখ ফিরিয়ে একবার অন্য প্রান্তের দরজাটার দিকে তাকাল।
দরজা ঠেলে বীণা ঢুকছে। বড়োজোর বারো মিটার দূরত্ব। সারি দেওয়া নিয়ন আলোয় উজ্জ্বল কামরা। সোজা সামনের দিকে দেখা না-দেখার মতো চাউনি ফেলে বীণা পাল্লাটা ছেড়ে দিতেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় ছাড়া পাওয়া একটা বাচ্চচা টলমল করে পথ দিয়ে এগিয়ে আসছিল। ওকে ধরার জন্য সরোজ নিচু হল। একটি যুবক, সম্ভবত বাচ্চচার পিতা, ”বান্টি, বান্টি” বলে ডেকে চেয়ার থেকে উঠল। সরোজ হাত বাড়িয়ে বাচ্চচাটিকে কোলে তুলে হাসি হাসি মুখে সামনে তাকাতেই সোজা বীণার চোখের সঙ্গে তার চোখের ধাক্কা লাগল।
এবার কী হবে!
প্রথমেই তার মনে এই ভাবনাটা জেগে উঠল। বীণার চোখ দুটো সামান্য বড়ো হয়ে উঠেই ছোটো হল। চিনতে পেরেছে। মুখে কোনো ভাব ফুটে ওঠেনি। সত্যিই ম্যাচিওরড হয়েছে। নাটুকে হবার চমৎকার সুযোগটা নিল না। নিজের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অনেকের থেকেই বেশি। বীণা ঝুঁকে মেয়েটির হাঁটু ঘষড়ে ভিতরে ঢুকে চেয়ারে বসল। একবারও এদিকে তাকাল না।
বাচ্চচাটাকে তার বাবার হাতে তুলে দিয়ে সরোজ ঘুরেই, চেয়ারের ওপর রাখা ডালাখোলা সুটকেস হাতড়ানোয় ব্যস্ত লোকটির পাছায় ধাক্কা দিয়ে এবং ‘সরি’ বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক ঘণ্টা আগে কাল বিকেলে সরোজ আবিষ্কার করেছিল বীণাকে।
‘আবিষ্কার’ শব্দটি সুপ্রযুক্ত হবে কি না সরোজ এই খটকা মাথায় নিয়ে কানপুরের ওভারব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে সরু একটা গেটে পৌঁছল। টিকিট নেবার জন্য একজনের দেখা এতক্ষণে পাওয়া গেল। স্টেশনের বাইরে পঁচিশ-তিরিশটি সাইকেল রিকশা অপেক্ষমাণ। এই শহরে বাস ছাড়া জনগণের জন্য এটাই একমাত্র বাহন। রাজধানীতে ভোরে কম যাত্রী আসে বলেই রিকশা মাত্র এই ক’টি। অন্য সময় এদের ভিড়ে হাঁটাচলা দায় হয়।
”কোথায় যাবেন, হোটেলে?”
”বাবু হোটেলে যাবেন, ব্যবস্থা করে দেব।”
রিকশাওলারা ছেঁকে ধরল। খদ্দের আনতে পারলে হোটেল থেকে কমিশন পাবে।
”হোটেলে আমাদের ঘর বুক করা আছে বাবা, তোমাদের অত আর উপকার করতে হবে না।” কালোকোট চেঁচিয়ে উঠে, মাছি তাড়াবার মতো করে হাতটা মুখের সামনে নাড়তে লাগল।
”দুজনে দুটো রিকশা, কী বলেন?”
”তা ছাড়া কী! একটাতেই দুজনে যাব ভেবেছিলেন নাকি?”
”না না তা নয়, এই কত নেবে মধুছন্দা হোটেল? সিভিল লাইন্সে?”
”দো রুপিয়া।”
”অ্যাঁ!” তারপর সরোজের দিকে ফিরে গলা নামিয়ে বলল, ”কলকাতায় শুনে এসেছি এক টাকা…ধরে ফেলেছে আমরা নতুন লোক।”
”উঠুন, উঠে পড়ুন।”
সরোজ হ্যান্ড গ্রিপটা রিকশার পাদানিতে রেখে উঠে বসল। ”ভীষণ খিদে পাচ্ছে, তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে।”
”দর না করেই…।”
”এক টাকা যদি বেশি নেয় তো নিক না।”
কাত হয়ে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বার করে সরোজ রিকশাওলাকে রওনা হতে বলল। যতক্ষণ রিকশা চলেছিল সে আর পিছন ফিরে তাকায়নি।
কানপুর চার বছরে একই রয়েছে। সিগারেটে টান দিয়ে সে দু’পাশের বাড়িগুলোকে লক্ষ করল। আগের মতোই তার মনে হল কলকাতার বড়োবাজার, জোড়াসাঁকো বা নিমতলার কোনো পাড়া দিয়ে সে চলেছে। সাইন বোর্ডের বয়ান, রাস্তার দু’ধারে খোলা নর্দমা, পথের মাঝে টাটকা গোবর, উনুনের ধোঁয়া, রাধাগোবিন্দের মন্দির, দাঁতনের জন্য বিছিয়ে রাখা নিমডালের গোছা, সিমেন্টের গাঢ় লাল নীল ফুল লতাপাতা বাড়ির দেয়ালে, রাস্তা দু’ভাগ করে মাঝখান দিয়ে ফুটখানেক উঁচু সরু পাঁচিল, নিচু দোতলা পুরনো বাড়িগুলোর মাঝে হঠাৎ আধুনিক স্থাপত্যের লম্বা বাড়ি, পথচারীদের উদাসীন চলাফেরার মধ্য দিয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে স্কুটার এবং তার থেকেও বিপজ্জনক গতিতে অ্যাম্বাসাডর।
