সরোজ ভ্রূ এবং কাঁধ তুলে বোঝাল শীতকে সে খুব একটা গ্রাহ্য করে না। একটা ফুলহাতা সোয়েটার, আর একটা মাফলার ছাড়া তার সঙ্গে আর কোনো শীতবস্ত্রও নেই। হালকা হয়ে বেড়াবার জন্য দু’বছর আগে মাদ্রাজে বর্মা বাজার থেকে হাতে বা কাঁধে ঝোলানো যায়, এমন একটা জাপানি গ্রিপ কিনেছিল। এতে প্রায় এক সুটকেস জিনিস আঁটে। যখন বাইরে গেলে স্যুট পরত তখন সুটকেস সঙ্গে নিত। কানপুর থেকে দিল্লি হয়ে সে ফিরবে, আঠারো দিন কলকাতার বাইরে থাকার কথা। টেলেক্সে গতকালই দিল্লি অফিসকে কলকাতায় ফেরার একটা রাজধানীর টিকিট কেটে রাখতে বলেছে।
”আপনি তো কলকাতারই, কবে ফিরবেন?” সরোজ বলল।
”অফিসের কাজ, দিন চারেক লাগবে।”
”কোথায় উঠবেন?”
”হোটেলে, বুক করাই আছে। আপনি?”
”আমিও হোটেলে…”
দুজনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। সরোজের চোখে পড়ল সাদা কার্ডিগান মেরুন শাড়ির মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। ওই প্রান্তের দরজার দিকে এগোচ্ছেন বাইরে যাবার জন্য। সেই সময় দরজা ঠেলে ঢুকল বাচ্চচা-কোলে একটি লোক। মহিলা পাশ ফিরে দাঁড়ালেন পথ দেবার জন্য। সরোজের ভ্রূ কুঁচকে উঠল।
মুখটা চেনা, অত্যন্ত চেনা। কুড়ি-একুশ বছর পরও ভুল হবার কথা নয়। ঠোঁটের নীচে বাঁ ধারে তিলটি এখান থেকেও স্পষ্ট দেখা গেল। একটু চাপা নাক, গালের উঁচু হনু। সরোজের বুকের মধ্যে বাতাসের চাপ তৈরি হচ্ছে, হাতের আঙুলগুলো ঢিলে হয়ে আসছে। মাথার মধ্যে থেকে একটা নির্দেশ মুহূর্তে তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ল-বসে পড়ো।
হঠাৎ তাকে বসে পড়তে দেখে কালো কোটপরা লোকটি আর কথা না বলে দরজার দিকে এগোল।
বীণা!
এত বছর পর কিনা একই ট্রেনে! এখন কোথায় থাকে?…কানপুর, দিল্লি? কী করে? ঘরসংসার… চাকরি? বিয়ে নিশ্চয়ই করেছে, সঙ্গের মেয়েটি কি ওরই? আশ্চর্য, এত বছর…কুড়ি না একুশ…অত হবে কি? কানহাইয়ের দু’শো ছাপান্ন কত বছর আগে হয়েছিল…আজ থেকে উনিশ বছর…তারপর এই! ওর সঙ্গে কথা বলা কি উচিত হবে? ওর বয়স এখন কত, চল্লিশ না ঊনচল্লিশ, নিশ্চয় বোধবুদ্ধি এখন অনেক ম্যাচিওরড, ইংরেজি আগেও বলতে পারত, বলার অভ্যাস রয়েছে, বাড়িতে সম্ভবত ইংরেজিতেই কথা বলে, মনে হয় অবস্থা ভালোই…কালচার্ড বলা যায় এমন একটা ফ্যামিলির মাঝখানে রয়েছে। শিখের সঙ্গে যেভাবে কথা বলল তাকে ঠিক ঝগড়া বলা যায় না…উঁচু গলায় তর্ক একটু অ্যাগ্রেসিভ ভঙ্গিতে। ওর কাছে গিয়ে কথা বলা কি দরকার? বললে কীভাবে তাকে নেবে? দরকার কী দেখা হওয়ার, এত বছর তো দিব্যিই কেটে গেল, তার মধ্যে কতবার আর ওকে মনে পড়েছে?
সে এখন জালের মধ্যে জড়িয়ে পড়া একটা জন্তুর মতো অবস্থায়। যতই জাল ছাড়াতে চায় ততই জড়িয়ে যাচ্ছে। তার মনে হল, বীণার চেয়ারের পাশ দিয়ে অন্যমনস্কের মতো বার দুই হেঁটে গেলে কেমন হয়? যদি মুখ তুলে চিনতে পারে, যদি নাম ধরে ডাকে তাহলে মসৃণভাবে ব্যাপারটা ঘটবে। সে প্রথমে অবাক হবে তারপর চিনতে পারবে। আর যদি দেখেও না-চেনার ভান করে তাহলেও ব্যাপারটা ঠিক থাকবে। সে-ও চিনবে না।
একটা মানসিক জড়তা তাকে গুটিয়ে রাখছে। এটা শুধু এখনই নয়, জড়তাটা বরাবরের। ব্যাপারটাকে সে কুনোমি বলতে রাজি নয়, লাজুকতাও নয়। ছোটোবেলা থেকে কখনওই সে বেশি কথা বলায় বা আগ বাড়িয়ে অযাচিত কাজে নেমে পড়ায় নিজেকে নিয়োগ করেনি। তার থেকে অসফল, নিকৃষ্ট, বোকা এবং আকর্ষণরহিতরা চোখে পড়ার জন্য নানান কাণ্ড করেছে যখন, তখন সে চুপচাপ থাকতে চায়। বরাবরই সে পিছনের সারির, ভিড়ের মধ্যে গা ঢাকা দেওয়ার দলে। চোখে পড়ার মতো কাজ করে ফেললেই অস্বস্তি বোধ করেছে। কখনও আক্রমণাত্মক নয়, চিন্তায় প্রথমেই সে ধরে নেয়-হবে না, করা যাবে না। উদ্যোগী হয়ে নতুন কোনো কাজে এগিয়ে যাওয়ার বা ছক কষে কিছু আদায় করার থেকে সে পছন্দ করে, যতটুকু পাওয়া যায় তাই সই।
সরোজ তার এই দুর্বলতাটা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু ‘দুর্বল’ শব্দটা কখনও নিজের সম্পর্কে সে মনে মনেও প্রয়োগ করে না। প্রথমে ধারণা হয়েছিল এটা তার মধ্যবিত্ত গড়বুদ্ধি থেকে পাওয়া শোভনতা এবং রুচির সঙ্গে যুক্ত। পরে তার মনে হয়েছে এর মধ্যে রুচিটুচি, শোভন-অশোভন আসে কী করে? স্কুল ছাড়ার কুড়ি বছর পর অঙ্কের মাস্টারমশায়কে একদিন দেখেছিল ওষুধের দোকানে তার পাশে দাঁড়িয়ে কী একটা কিনছেন। সে বলতে পারত ‘কেমন আছেন স্যার, আমি সরোজ আপনার ছাত্র ছিলাম।’ এই বলে তখন একটা প্রণাম। কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল যাতে স্যার তার মুখ না দেখে ফেলেন। তাড়াতাড়ি ওষুধটার দাম চুকিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেই ভেবেছিল-পরিচয় দিয়ে দুটো কথা বললাম না কেন? উনি চিনতে পারেননি। সেটা স্বাভাবিকই। গম্ভীর, সুদর্শন, পরিশ্রমী ছিলেন, ছাত্রদের শ্রদ্ধা পেতেন। স্যারকে তার ভালোই লাগত। বহু কাল পর দেখা হল অথচ সে মুখোমুখি হতে চাইল না! সে ইতিমূলক, উদ্যোগী নয়। স্যার যদি চিনতেন তবেই সে চেনা দিত। কী যেন একটা ভিতর থেকে তাকে টেনে রাখে, সে কুঁকড়ে থাকে।
আধ ঘণ্টা পরই সে নিজেকে বলেছিল, ঠিকই করেছি। কথা মানে তো-এখন কী করছ, ক’টি ছেলেপুলে, তারা কী পড়ছে, এইসব তো! অর্থহীন এসব কথাবার্তার মধ্যে না গেলে কোনো ক্ষতি হবে কি, আমাদের দুজনেরই? আরও আধ ঘণ্টা পর সরোজ নিজেকে বলেছিল-অর্থহীনতার মধ্যে না যাওয়াটাই তো শোভনতা।
