সরোজ আঙুল তুলে বলেছিল, ”এতবড়ো সুটকেসের তো লাগেজ ভ্যানে যাবার কথা, চেয়ার-কারে কি এসব তোলে? কমনসেন্স বলে তো একটা কথা আছে, দেখেননি টিকিটে কী লেখা রয়েছে?”
”আমি বরং নামিয়ে রাখছি। এখন আবার বুক করাতে গেলে…” লোকটি হাতঘড়ি দেখে অসহায়ভাবে তাকাল, ”ছাড়তে আর মাত্র চার মিনিট বাকি।”
”নামান।” সরোজ ধমকে উঠল। কিন্তু তখনই মনে হল, অতবড়ো সুটকেস একা নামাবার ক্ষমতা লোকটির নেই।
”সরুন আপনি।”
সুটকেসটা অবশ্য আকারের সঙ্গে মানানসই নয়। সরোজ স্বচ্ছন্দেই নামিয়ে নিল। সুটকেসে জিনিসপত্র কম বোধহয় দু-চারদিনের জন্য কোনো কাজে যাচ্ছে। লোকটিকে দেখে এখন তার মায়া হচ্ছে। কোথায় যে সুটকেসটা রাখবে ভেবে পাচ্ছে না। কামরার মাঝখানে যাতায়াতের পথ, তার একধারে তিনটি অন্যদিকে দুটি চেয়ার। পথটা সরু, ওখানে সুটকেস রাখা যায় না।
”রাজধানীতে এই প্রথম?”
”আজ্ঞে, হ্যাঁ।”
”সিটের নীচে লম্বালম্বি পেতে রাখুন। বসতে কিছুটা অসুবিধে হবে, তা আর কী করবেন…দিল্লি যাচ্ছেন?”
”কানপুর।”
কিছুক্ষণ ধরেই কামরার ওদিকে ভিড়ের আড়ালে একটা কথা কাটাকাটি চলছিল। সরোজ তাতে কান বা চোখ দেওয়ার আগ্রহ বোধ করেনি। ট্রেন ছাড়ার আগে এসব হয়ই। কিন্তু হঠাৎ ইংরেজিতে নারীকণ্ঠে তীক্ষ্নস্বর শুনতে পেয়ে অন্যদের মতো সে-ও কামরার অন্য প্রান্তে তাকাল। মনে হল যে-কারণে একটু আগে তার স্বর রুক্ষ হয়েছিল ঠিক সেই কারণই ঘটেছে। দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের ফাঁক দিয়ে সরোজ দেখতে পেল, ছেলেদের মতো ছাঁটা চুল, সাদা কার্ডিগান এবং মেরুন সিল্কের শাড়িপরা এক মহিলাকে যার মুখটি দেখা যাচ্ছে না। ডানহাতের তর্জনী তুলে মাথায় সবুজ পাগড়ি, এক বৃহৎবপু শিখকে তিনি ইংরেজিতে বোঝাচ্ছেন-”আগে এলেই কি বাঙ্কের সব জায়গা আপনার হয়ে যাবে, এ কেমন যুক্তি? আপনার সিট নাম্বার তো একুশ আর মালপত্র রেখেছেন সাত নম্বরের জায়গায়। এ কেমন করে হতে পারে? তা ছাড়া মানুষ-পিছু একটা মাত্র হাতব্যাগ এই হচ্ছে নিয়ম এবং তা নিজের সিটের উপরেই থাকা বাঞ্ছনীয় আর আপনি ছ-সাতটা মাল…।”
”কে নিয়ম মানে? কেউ মানে না, এ দেশে নিয়মই নেই।” শিখ বিন্দুমাত্র বিচলিত নয় মহিলার তুখোড় ইংরেজিতে। উদাসীনভাবে বাঙ্কের দিকে চোখ তুলে সে ইংরেজিতেই ধীরে ধীরে ”নিয়ম” সম্পর্কে মতামত দিল। কাছের কয়েকজন যাত্রী তাকিয়ে আছে ব্যাপারটা কতদূর গড়ায় দেখার জন্য। তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে না তারা শিখের বিপক্ষে। নিয়ম মেনে একটি হাতব্যাগ নিয়ে কেউই ওঠেনি।
”তাহলে আপনি মালপত্র হটাবেন না? ঠিক আছে, কন্ডাক্টরকেই বলতে হচ্ছে। চেয়ার-কারকে যেন লাগেজ ভ্যান করে তুলেছেন।”
”জায়গা তো রয়েছে, আপনি রাখুন না আপনার জিনিস…দিন রেখে দিচ্ছি।”
শিখটি মহিলার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়েই নিল প্রসাধনের চৌকো বাক্সটি। দুটো কার্ডবোর্ডের প্যাকেটের ফাঁকে জায়গা বার করে বাক্সটি গুঁজে দিল। জিনস ও শার্ট-পরা, চোখে চশমা, লম্বা ছিপছিপে, শ্যামবর্ণা যে-মেয়েটি মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে, সে তার হাতে ঝোলান নকশা-করা চামড়ার থলিটি শিখের প্রসারিত হাতের নাগাল এড়িয়ে জানলার পাশে হুকে ঝুলিয়ে দিল।
সরোজ হাতঘড়ি দেখে বিড় বিড় করে তখন বলেছিল, ”আশ্চর্য, পাঁচ মিনিট হয়ে গেল এখনও ছাড়ল না! শিখটা ঠিকই বলেছে, নিয়ম কেউ-ই মানে না।”
”পথে লেট মেক-আপ করে নেবে।”
সরোজ কৌতূহলী চোখে কালো-কোটপরা লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”বলছেন করে নেবে?”
”অর্ডিনারি মেল ট্রেনই দশ-পনেরো মিনিট লেট ইজি মেক-আপ করে নেয়। আর লেট যদি হয়ই সেটা তো ভালোই।”
লোকটি কোটের পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বার করে, একটা সিগারেটের মাথা টেনে সরোজের দিকে এগিয়ে ধরল।
”কম্পার্টমেন্টে খাওয়া বারণ।”
লোকটা অপ্রতিভ হয়ে চোরাই জিনিস লুকোবার মতো ব্যস্ততায় প্যাকেট সমেত হাতটা তাড়াতাড়ি কোটের পকেটে ভরে নিল।
”বাইরে টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে তো খাওয়া যায়।”
”তা যায়, কিন্তু এখন আমার খাবার ইচ্ছে নেই। আপনি খেয়ে আসতে পারেন।”
”না থাক।”
সরোজের পায়ের নীচে কামরার মেঝেটা নড়ে উঠতেই সে দুলে গেল। ট্রেন ছেড়েছে। জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে প্ল্যাটফর্ম ও মানুষজনের দিকে সে তাকিয়ে রইল। পিছিয়ে যাওয়ার এই দৃশ্যটা বাল্যবয়স থেকেই তার ভালো লাগে। অবশ্য চার বছর আগে ছোটোবোন শান্তাকে তার শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিতে যাওয়ার সময় সে বলেছিল, ”সবকিছু ফেলে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত সেনসেশন পাই।”
”দশ মিনিট লেটে ছাড়ল।”
সরোজ উত্তর না দিয়ে কামরার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকাদের মুখগুলোয় চোখ বোলাল। একটি মুখও চেনা নয়। অনেকেই চেয়ারে বসে পড়েছে। তাদের মাথার পিছনটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। কামরার বাইরে যাবার জন্য তাদের প্রান্তের কাচের এক পাল্লার দরজাটা পাঁচ-ছয় মিটার দূরে। চেয়ারে বসতে হবে দরজার দিকে পিছন ফিরে। ধূসর ফিকে নীল উর্দিপরা রেস্টুরেন্টের কর্মীরা দরজার বাইরে ছোট্ট করিডরে কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর ওরা চা দেবে।
হঠাৎ মনে পড়ায় সরোজ জানতে চাইল, ”লেট হওয়াটা ভালো, এ-কথা বললেন কেন?”
”আর্লি ডিসেম্বরে নর্থ ইউ পি-র শেষরাত যে কী জিনিস…একটু দেরি করে সূর্য ওঠার পর পৌঁছলে তবু শীতটা কম লাগবে।”
