আধ ঘণ্টা পরে অ্যাম্বাসাডারটা শ্যামনগরের জুট মিল কোয়ার্টারের ফটক পেরিয়ে কলকাতার দিকে চলে গেল। পিছনের সিটে বসা-ভঙ্গিতে দীপের নিস্পন্দ দেহটা রাখা ছিল।
দ্বিতীয় ইনিংসের পর
দ্বিতীয় ইনিংসের পর – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
সাতই ডিসেম্বরের ভোরে, রাজধানী এক্সপ্রেসের তেরো নম্বর চেয়ার-কার থেকে কানপুরের প্ল্যাটফর্মে নেমেই সরোজ সাদা শালটা সোয়েটারের উপর জড়িয়ে নিয়ে কৃতজ্ঞ চোখে কামরার জানলার দিকে তাকাল। শালটি মেয়েদের তাই দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ছোটো। কিন্তু ঊর্ধ্বাঙ্গকে একপাক ঘিরে রাখতে তার অসুবিধে হল না। সে ভেবেছিল পর্দা সরিয়ে এইসময় একজোড়া চোখ তাকে বিদায় জানাবে। সেরকম কিছু হল না। পর্দাটা একই রকম টানা রয়েছে।
ঠান্ডাটা যে কেমন হাতের আঙুল কান আর নাক অসাড় হয়ে আসা থেকেই সে বুঝেছে। শুধু একটা ফুলহাতা সোয়েটারের বর্মে এমন শীতকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। শালটা যদি না দিত…।
সরোজের সঙ্গে যারা নামল তাদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে ট্রেনেই তার আলাপ হয়েছে। বছর কুড়ির ছেলেটি তার পাশেই জানলার ধারের চেয়ারে ছিল। নাম জানা হয়নি। কানপুর আই আই টি-তে ইলেকট্রিক্যাল পড়ছে। প্রথম বছর। কথা প্রসঙ্গে জেনেছে, ওরা কাতারে থাকে, বাবা তেলের ইঞ্জিনিয়ার। আগে থাকত দুলিয়াজানে। বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্য আই আই টি-তে কিছু আসন বরাদ্দ থাকে, সেই সুযোগ নিয়ে ও পড়তে এসেছে। একটা ইংরেজি খেলার সাপ্তাহিকে মাঝে মাঝে চোখ বোলাচ্ছিল। নিউজিল্যান্ড শুধু তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলতে অল্পদিনের সফরে এসেছে, মাদ্রাজে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলায় ভারত সাতাশি রানে জিতেছে। দ্বিতীয়টি কানপুরে। শুধু ক্রিকেটেরই ছবি আর কথায় সাপ্তাহিকটি ভরা। সরোজের মনে হল ছেলেটি ক্রিকেট পছন্দ করে না।
প্ল্যাটফর্মে নেমে ছেলেটি একবার শুধু তার দিকে তাকিয়েই বাইরে যাবার জন্য পুবের ফটকের দিকে দ্রুত চলে গেল।
সিগারেট ধরাবার জন্য হাতের গ্রিপটা মেঝেয় রেখে সরোজ আড়চোখে জানলার দিকে আবার তাকাল। পর্দাটা একই ভাবে। ছোট্ট একটু ফাঁক অবশ্য রয়েছে, তাতে ওধার থেকে কেউ তাকিয়ে থাকলেও বোঝা যাবে না।
প্ল্যাটফর্ম কোলাহল বর্জিত, শান্ত। শীতের এই ভোরে রিকশাওয়ালা, কুলি, হোটেলের টাউট, রেলের কর্মী আর ট্রেন থেকে নামা যাত্রী মিলিয়ে জনা চল্লিশ লোক। প্লাটফর্মের চটির দোকানগুলো বন্ধ, চা-এর স্টলে ভিড় নেই। হাঁকহাঁকি, ডাকাডাকি নেই। এতবড়ো স্টেশনটা শীতকাতুরে মানুষের মতো গুটিসুটি হয়ে রয়েছে।
”বাবু হোটেলে যাবেন?”
সরোজ হাত নেড়ে লোকটাকে জানিয়ে দিল সে কথা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। ট্রেনে আলাপ হওয়া দ্বিতীয় লোকটি কুলির মাথায় সুটকেস চাপিয়ে হাতের তালু ঘষতে ঘষতে কাছে এল। লাল পোলোনেক সোয়েটারের উপর কালো কোট। ”আমাদের তো ওভারব্রিজ দিয়ে একদম ওধারে যেতে হবে।”
”হ্যাঁ।”
জানলার দিকে শেষবার তাকিয়ে সরোজ গ্রিপটা তুলে নিয়ে ব্রিজের সিঁড়ির দিকে এগোল। চার বছর আগে শেষ কানপুরে এসেছিল। মোটামুটি শহরটাকে তার মনে আছে।
”শালটা ছোটো বটে কিন্তু খুব কাজের।”
সরোজ জবাব দিল না।
”বলেছিলুম লেট মেক-আপ করে নেবে, দেখলেন তো।”
কবজিতে আঁটা ঘড়িটা চোখের সামনে তুলে ধরে অসম্ভব তৃপ্ত দেখাল লোকটিকে।
”উনি কিন্তু দিল্লিতে মুশকিলে পড়বেন, ওখানে আরও ঠান্ডা…অবশ্য যখন পৌঁছবেন তখন ভালোই রোদ উঠে যাবে। তবু যদি বাতাস চলে…”
”উনিটা কে?”
সরোজ তার গম্ভীর স্বরটা প্রয়োগ করল লোকটিকে নিরুৎসাহ করতে।
”উনি!” লোকটি বিব্রত হবার কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে বলল, ”রাতে খাওয়ার পর যার পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলেন, আর ওনার মেয়ে উঠে এসে ততক্ষণ আপনার চেয়ারে বসে রইল, সেই ভদ্রমহিলা!”
সরোজ এখনও লোকটির নাম জানে না। জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও মনে হল থাক, নাম ধরে সম্বোধন ঘনিষ্ঠতার সুযোগ এনে দেয়, তাহলে বকবকানি আরও বেড়ে যাবে।
ওভারব্রিজের মাঝামাঝি এসে সরোজ পিছনে তাকিয়ে রাজধানী এক্সপ্রেসকে শেষবারের মতো দেখে নিল। আর মিনিট কয়েক পরই ছাড়বে।
”ভদ্রমহিলা খুব কড়াধাতের অথচ মনের মধ্যে কত সফট। আপনার আত্মীয়া?”
এবার সরোজ কৌতূহলী হয়ে পড়ল। একদমই অপরিচিত, মাত্র কাল বিকেলে হাওড়ায় ট্রেনে উঠে লোকটির সঙ্গে প্রথম আলাপ এবং সেটাও প্রায়-ঝগড়ার মতো।
”সফট কেন মনে হল?”
”মেয়েকে দিয়ে শালটা আপনাকে পাঠিয়ে দিলেন, সফট মাইন্ড না হলে কি এই শীতে কেউ গরমকাপড় হাতছাড়া করে?”
”অ। আর কড়াধাত বুঝলেন কী করে?”
”কেন, পাঞ্জাবিটাকে কেমন ডেঁটে দিলেন দেখলেন না?”
কাল বিকেলে ট্রেনে ওঠার পর নিজের কয়েকটা ব্যবহার, কণ্ঠস্বর, ভঙ্গি, মনের অবস্থা সরোজের মনে পড়ল। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে লোকটির মুখের দিকে এই প্রথম সে প্রসন্ন চোখে তাকাল। প্রায় বারো ঘণ্টা আগে তেরো নম্বর কামরায় বিরক্ত চোখে তাকানোর ব্যাপারটা ঝট করে মনে ভেসে উঠল।
হাওড়ায় নম্বর খুঁজে সিটটা পাওয়ার পর হ্যান্ড গ্রিপটা র্যাকে তুলে রাখতে গিয়ে সে দেখে একটা ঢাউস সুটকেস জায়গা দখল করে রেখেছে। রুক্ষস্বরে সে বলে উঠেছিল, ”সুটকেস কার?”
লাল পোলোনেক সোয়েটারের উপর কালো কোটপরা তার পাশে দাঁড়ানো রোগা লোকটি ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিয়েছিল, ”আমার।”
