হঠাৎ লীনা ছুটে গিয়ে দীপকে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিল।
”এইবার প্র্যাকটিশ করো গে।”
দীপ হাত-পা ছুঁড়ে হাঁ করে বাতাস টানছে। একবার ডুবছে আর উঠছে আর পাগলের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে ”ওহ ওহ” শব্দে চিৎকার করে যাচ্ছে।
মেয়েরা প্রথমে ভেবেছিল দীপ মজা করছে। তারপরই বুঝতে পারল দীপ ডুবে যাচ্ছে।
ওরা সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নীরেন সাঁতরে এসে দীপের চুলের মুঠি ধরে এবং বেহুলাকে পিঠে নিয়ে পাড়ে এল।
দীপ মূহ্যমানের মতো সিঁড়িতে বসে। বেহুলা নীরেন বাড়ির মধ্যে গেছে। মেয়েরা মুখে হাত দিয়ে অবাক বিমূঢ়।
”এই যে বলল সাঁতার শিখেছিল! শিখলে কি কেউ ভোলে?”
”গুল মেরেছে।”
ধীরে ধীরে দীপ সিঁড়ি ভেঙে উঠে এল। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল। নীরেন আবার হাফপ্যান্ট পরে ফিরে এসেছে।
”দীপ কি ডুবে যাচ্ছিল নীরেনদা?”
”বোধ হয়।”
ওদের মুখ কিছুক্ষণের জন্য শুকিয়ে গিয়ে আবার বিরক্তিতে ভরে গেল।
লীনা বলল, ”অপদার্থ।” হৈমন্তী সায় দিল। দীপ ক্লান্ত মুখটা তুলে ওদের দিকে তাকাল।
মাংস ভাত ছাড়া আর কিছু রান্না হয়নি, কলকাতা থেকে আনা হয়েছে দই। সব কিছুই পরিমাণে বেশি।
”এত পড়ে থাকবে! তা হবে না। ওরা না খায় না খাক, আমরা ভাগাভাগি করে, বুঝলে দীপাঞ্জন, শেষ করে দিতে হবে।”
মাংসের ডেকচিটা মাঝে বসানো ছিল। নীরেন হাতায় করে দীপের পাতে তুলে দিতেই সে আঁতকে উঠল।
”আরে আমিও তোমার সঙ্গে জয়েন করছি।”
নিজের পাতেও সে প্রচুর মাংস নিল এবং স্বচ্ছন্দে খেয়ে যেতে লাগল।
মেয়েরা দীপকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। পেটে হাত দিয়ে সে বলল, ”বিশ্বাস করো আর পারছি না।”
”তুমি পারোটা কি বলোতো?”
দীপ করুণ মুখে তাকিয়ে হাসল।
খাওয়ার পর দোতলার বারান্দায় ওরা পা ছড়িয়ে গল্প করতে শুরু করল।
নীরেন আর বেহুলা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, ভ্রূকুটি করছে, জিভ দেখাচ্ছে আর মাঝে মাঝে গল্পে যোগ দিচ্ছে। হঠাৎ বেহুলা একতলায় নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর নীরেনও উঠল-”কী করছে দেখি তো” অজুহাত দিয়ে।
মেয়েরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ঝিমিয়ে রইল।
”চল বাগানে ঘুরে আসি।”
”সাপ আছে।”
”ওদিকে যাব না।”
ওরা এবং দীপ একতলায় নেমে এল। বাগানে ছড়িয়ে পড়ে ঘুরতে থাকল। টালির চালের ঘরটার কাছে এসে হৈমন্তী থমকে দাঁড়াল। তালাটা নেই কিন্তু ভিতর থেকে বন্ধ। ছুটে সে লীনার কাছে এসে বলল, ”ব্যাপার দেখবি আয়।”
দুজনে ঘরের কাছে এসে দেয়ালে কান ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এল পাংশু মুখে।
”নীরেনদা আর বেহুলা।”
”আগে থেকেই বোধহয় বলা-কওয়া ছিল।”
”এরকম জায়গায় আমাদের আসার কোনো মানে হয় না।”
”দীপ ছাড়া আর একটা পুরুষও নেই।”
”ওটাকে পুরুষ বলিস?”
তাপসীকে ডেকে ওরা খবরটা দিল। দীপ পাঁচিলের ধারে একটা প্রায় তিনতলা উঁচু নারকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ঢিল ছুড়ে ডাব পাড়ার চেষ্টা করছিল।
”দ্যাখ বামনটার কাণ্ড দ্যাখ।”
”চলতো ওটাকে একটু শিক্ষা দি।”
তিনজন দীপের কাছে এল। ওদের দেখে লাজুক হেসে বলল, ”এভাবে পাড়া যায় না।”
”যায় না তো গাছে উঠে পাড়ো না।”
”বড্ড উঁচু।”
”নীরেনদা উঠতে গিয়ে ফেল করেছে। তুমি পারবে না?”
”দীপ পারবে না?”
”দীপ ডাউন দিতে হবে।”
”দীপ পারতেই হবে।”
”দীপ পুরুষ মানুষ তুমি। না বোল না।”
দীপের মুখে একগাল হাসি। বলল, ”পেড়ে দিতে পারলে কী দেবে আগে বলো।”
”তাহলে।” হৈমন্তী ঠোঁট কামড়ে বলল, ”আমাদের যাকে চাও ওই ঘরে নিয়ে যেতে পারবে।” আঙুল দিয়ে সে টালির ঘরটা দেখাল।
”না না।” দীপ মাথা নাড়ল। ”আমি শুধু বন্ধুত্ব চাই।”
”তাই হবে। কিন্তু যদি না পারো?” তাপসী হাত চেপে ধরল দীপের।
”তাহলে আর আমার মুখ দেখতে পাবে না। অন্য কলেজে ট্রান্সফার নেব।”
”না না, পারতেই হবে। হবে হবে হবে।” তাপসী অদ্ভুত গলায় বলল। দীপ অবাক হয়ে তাকিয়ে উত্তেজিত, হিংস্র, কাতর মুখগুলির থেকে কোনো অর্থ বার করতে পারল না।
খালি গায়ে পাজামাটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে দীপ ওঠার চেষ্টা শুরু করল। ওরা গাছটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে, কিছুটা উঠেই সে, নেমে এল।
”পেটে বড্ড চাপ লাগছে।”
”জানতুম এইরকম একটা অজুহাত দেবে।” দু হাত ঝাঁকিয়ে হৈমন্তী বলল প্রায় চিৎকার করে।
দীপ আবার ওঠার চেষ্টা শুরু করল। ধীরে ধীরে প্রায় দোতলা পার হয়ে গেল। মেয়েদের মুখে বিস্ময় ফুটল। ওরা হাততালি দিয়ে উঠল। দীপ গাছটা জড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। দুটো পা পিছলে যাচ্ছে বারবার। আঙুলগুলো বেঁকিয়ে আঁকড়ে ধরতে চাইছে, পারছে না।
একটা ইটের টুকরো নিয়ে হৈমন্তী শাসানি দিল, ”দীপ খবরদার, এক ইঞ্চি নেমেছো কি মাথা ফাটিয়ে দেব।”
হৈমন্তী ইটটা ছুঁড়ল। গাছে লেগে শব্দ হতেই দীপ ধড়ফড়িয়ে ওঠার চেষ্টা শুরু করল। কয়েক হাত উঠে আবার সে গাছটা জড়িয়ে রইল। শরীর থরথর কাঁপছে, নিশ্বাস নিতে হাঁ করল।
তিনজনে একসঙ্গে ইঁট ছুঁড়ল। তারপর আবার একঝাঁক।
”পারতে হবে। পারতেই হবে।” উন্মাদের মতো লীনা চেঁচাল।
”আর একটু দীপ, আর একটু।” তাপসী আবার ছুঁড়ল। দীপের পাশ দিয়ে সেটা বেরিয়ে গেল। আর থরথর করে কেঁপে দীপ পড়ে গেল।
মাথাটা প্রথমে পাঁচিলে পড়ল সেখান থেকে ছিটকে এল হাত পাঁচেক দূরে। বার কয়েক পা দুটো খিঁচিয়ে দীপের শরীর স্থির হয়ে গেল।
