”দীপ তাহলে অ্যাডাল্ট হল।” লীনা মন্তব্য করল। কেউ কথা বলল না। গাড়ি ব্যারাকপুর ছাড়িয়েছে। পলতা এবং ইছাপুর ছাড়াতেই দীপ উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসল। শ্যামনগর আসছে। সিগারেটটায় কয়েক টান মাত্র দিয়েছে। ফেলে দিল।
জুট মিলের রাস্তা দিয়েই গাড়ি যাচ্ছে। গিজ গিজ করছে রাস্তাটা। অবিরত হর্ন, ব্রেক আর গিয়ার বদল করতে করতে নীরেন বিরক্ত। দীপ উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে মণিদের কোয়ার্টারটা দেখার জন্য। যদি ও বাইরে থাকে তাহলে পলকের দেখাও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঠিক ফটকের কাছেই নীরেন গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল এবং দীপের মুখ থেকে অস্ফুট যন্ত্রণা কাতর একটা ”আহ” ধ্বনি বেরিয়ে এল।
”কি হল?” বেহুলা জানতে চাইল।
”কিছু না।” দীপের এখন ইচ্ছা করছে নেমে যেতে। পিকনিকের থেকে তার অনেক বেশি কাম্য মণির কাছে বসে কথা বলা। ফেরার সময় সে এখানে নেমে যাবে, এমন একটা চিন্তা মাথায় নিয়ে সে চুপ করে রইল।
নৈহাটির আগেই কাঁকিনাড়ার কাছে গাড়ি বাঁদিকে ঘুরে রেললাইন পার হয়ে চলতে থাকল। সরু মাটির রাস্তা এঁকে-বেঁকে ক্রমশ গ্রামের দিকে গেছে। একটা বাঁক পেরোনোর মুখেই হঠাৎ এক ছাগল ছানা লাফিয়ে গাড়ির সামনে পড়ল এবং বাম্পার ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেল।
ব্রেক কষে নীরেন শুধু বলল, ”ঝামেলায় পড়লাম।”
ছানাটা পা ছুঁড়ে ছটফটাচ্ছে। মরেনি। কিন্তু কোথা থেকে যেন পিলপিল করে জনা কুড়ি মেয়ে পুরুষ হাজির হয়ে গাড়িটা ঘিরে ধরল।
বেহুলা ভয়ে আঁকড়ে ধরল নীরেনের বাহু। পিছনে তিনজন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে, চাপা দিলে গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গাড়ির লোকেদের বেদম মারা হয় এসব কথা বহু শুনেছে, দৃশ্য দেখেছেও। ওরা থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করল। দীপও ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে নীরেন গাড়ি থেকে নামাল। দু’পা ফাঁক করে, বুক চিতিয়ে পেটাই স্বাস্থ্যটা জানতাকে দেখাল।
”মরেনি তো, তবে এত হুজ্জুত কীসের। আর মানুষও নয় একটা ছাগলছানা।”
নীরেনের কর্তৃত্ববাচক কণ্ঠস্বরে ওরা চুপ করে থাকল।
”কার ছাগল?”
মাঝবয়সি একটি বউ এগিয়ে এল।
”ছাগল না ছাগলী ওটা।”
”ছাগল।”
নীরেন পিছনের পকেট থেকে জাঁদরেল একটা ওয়ালেট বার করে একশো টাকার একটা নোট বউটির হাতে দিল।
ভীড়ের মধ্য থেকে কে বলে উঠল, ”একশো নয় দুশো দিতে হবে।”
নীরেন সেদিকে তাকিয়ে ভ্রূ কোঁচকাল। বউটিকে বলল, ”ছাগল তোমারই রইল।”
গাড়িতে এসে স্টার্ট দিতেই ভীড় দুভাগ হয়ে পথ করে দিল।
কিছু পথ যাবার পর নীরেন শিস দিয়ে হিন্দি গানের সুর ভাঁজতেই, তাপসী বলল, ”ওরা গাড়িটা জ্বালিয়ে দিলেও কিছু করার ছিল না।”
”তা ঠিক।” নীরেন বলল। ”মারধোর করলেও কিছু করার ছিল না।”
”উফফ, বেঁচে গেছি। নীরেনদার কি সাহস!”
দীপ কাঠের মতো বসে আছে। কথা বলার ক্ষমতা তার নেই।
অল্প পরেই তারা পৌঁছে গেল। দোতলা ছোট্ট একটা বাড়ি। খোয়া ফেলা পথ ফটক থেকে বাড়ি এবং পুকুরঘাট পর্যন্ত। নারকেল, আম, কাঁঠাল, সুপারি গাছ পুকুরের চারধারে। একদিকে নিচু পাকা পাঁচিল। প্রায় পনেরো বিঘের বাগান। পুকুরের একধারে ছোট্ট একটা টালির ঘর।
নীরেন বাজার করেই এনেছে। রান্নার সরঞ্জাম সব এখানেই আছে। পাশের গ্রামে মালির বাড়ি থেকে কাল রাতে খবর এসেছে তার ছেলে জলে ডুবে মারা গেছে। তাই মালি অনুপস্থিত।
রান্নার জন্য ব্যবস্থা করতে সবাই মেতে উঠল। সন্দেশের বাক্স হাতে হাতে ঘুরে শেষ হয়ে গেল। অনেকগুলো কলা পড়ে রইল। ডিম সেদ্দ দুটোর বেশি কেউ খেতে পারল না।
সবাইকে ডাব খাওয়াবার জন্য নীরেন একটা হাফপ্যান্ট পরে খালিগায়ে একটা নারকেল গাছে ওঠার চেষ্টা করল। কুড়ি-বাইশ ফুট উঠে হাল ছেড়ে নেমে এল।
”বড্ড পিছল। মালির ছেলেটা এই সময়ই ডুবে মরল। থাকলে পেড়ে দিত।”
দীপ ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাগানে। রান্নায় ব্যস্ত হৈমন্তী আর নীলা। অন্যরা পুকুর ঘাটে বসে গল্প করছিল। কিছুক্ষণ পর আর গল্প জমল না। নীরেন চেঁচিয়ে বলল, ”দীপাঞ্জন সাঁতার জানো?”
”একটু একটু।” দীপ ওপার থেকে সাড়া দিল।
”ওদিকে যেয়ো না, সাপ থাকতে পারে।”
কথাটা বলে নীরেন অন্যদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। প্রায় ছুটেই দীপ ফিরে এল।
হাফপ্যান্টটা নীরেন খুলে ফেলল। ভিতরে কস্ট্যুম। বেহুলা বাদে বাকি মেয়েরা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল এবং বারবার অন্যমনস্ক হল।
নীরেন কিছুক্ষণ জলে ঝাঁপাঝাপি করে মেয়েদের ডাকতে লাগল জলে নামার জন্য।
ওরা বলল, কেউই সাঁতার জানে না।
”তাতে কী হয়েছে, আমায় ধরে সাঁতার কাটবে।”
তিনজনে শুধু হাসল। বেহুলা শাড়ি পরেই জলে নেমে গেল। তাকে পিঠে নিয়ে নীরেন সাঁতরাতে শুরু করল।
”বেহুলাটা বড্ড বাড়াবাড়ি করে।”
”লোক দেখলে একটু বেশিই করে।”
”এখানে লোক আর কোথায়?”
”কেন আমরা। ও তো আমাদেরই বেশি করে দেখায়। সিগারেট কি না খেলেই চলত না?”
তিনজন যখন এইসব কথা বলে চলেছে, দীপ তখন সিঁড়িতে জলে পায়ের পাতা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল সাঁতার কাটা।
হঠাৎ তাপসী বলল, ”অ্যাই দীপ, জলে নামো।”
”সেই কবে হেদোয় শিখেছি। তাও বেশিদূর যেতে পারি না। প্র্যাকটিশও নেই।”
”তাতে কী হয়েছে। নীরেনদা কেমন কাটছে আর তুমি প্র্যাকটিশ নেই বলে পাশ কাটাচ্ছ।”
