”নাটক ছিল।” দীপ জুতো খুলতে খুলতে হালকা গলায় বলল।
”বলিসনি তো, তাহলে দেখতে যেতুম।”
”ওইজন্যই বলিনি।”
”কেমন করলি?”
”লোকে খুব হাততালি দিয়েছে। মজা পেয়েছে।”
”কী পার্ট ছিল তোর?”
”ছোটবাবুর।”
রাত্রে কৃষ্ণচন্দ্র উৎপলাকে বলল, ”বিজয়কে পাঠিয়েছিলুম দীপের সেই বন্ধুর বাড়িতে। কী লাগবে না লাগবে জেনে এল।”
কীভাবে যেন সারা কলেজে নাটকের ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বাড়িতে হাসাহাসি চলছে। দীপকে শুনিয়ে ”বাবা মেরো না বাবা মেরো না” বলে চেঁচিয়ে উঠেছে বিকৃত গলায়। ক্লাসে ছেলেরা অভিনয় করে দেখাল কীভাবে দীপ স্টেজে ঢুকল, ধাক্কা খেল, লাথি খেয়ে পড়ে গেল। মেয়েরা মুখে আঁচল বা রুমাল দিয়ে হাসতে লাগল।
দীপ কিন্তু রোজই ক্লাসে এসেছে। সে শুনেছে, দেখেছেও তাকে নিয়ে কীভাবে ভেংচি কাটা চলছে। হৈমন্তী, বেহুলারা তাকে দেখে এড়িয়ে যায়, সে দুঃখ পায়। প্রায়ই তার মনে হয়, কেন নাটক করতে গেল। সকলের কাছে সে হাস্যকর একটা ভাড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে।
ক্লাসের পর কলেজ থেকে বেরোবার সময় পিছন থেকে জ্যোতি তাকে ডাকল।
”দিদির বিয়ে।”
লাল প্রজাপতি ছাপ দেওয়া হলুদ খাম সে এগিয়ে ধরল। দীপ সেটা নিয়ে হাসল।
”বুধবার। তুমি অতি অতি অবশ্য আসবে। বাবা, মা সবাই বিশেষ করে বলে দিয়েছে।”
জ্যোতির স্বরে আন্তরিকতা। দীপকে সেটা স্পর্শ করল। সে মাথা হেলিয়ে বলল, ”যাব। আর কাকে বলেছ?”
”ওদের চারজনকেও বলেছি। তোমার বাবা-মাকেও বলব, কাল আমাকে নিয়ে যেয়ো।”
”মা এখানে নেই আর বাবা গ্যাস্ট্রিকের রুগি কোথাও খান না।”
দীপ মিথ্যা কথা বলল এবং ঠিক করে ফেলল সে নিজেও যাবে না।
জ্যোতি চলে যাবার পর তার মনে হল, এভাবে মুখ নামিয়ে একা থাকার কোনো মানে হয় না। তাকে আবার সবার মাঝে ফিরে আসতে হবে আগের মতো হয়ে। তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টার জবাব দিতে হবে। পূর্ণদেহীর সব কাজ তাকে করে দেখাতে হবে সে করুণার পাত্র নয়।
বহুদিন পর সে ঘোষ কেবিনে এল দুপুরের ভীড় এখন নেই। বেহুলারা চারজন একটা টেবলে। ওকে দেখে তারা আড়ষ্ট হয়ে গেল।
”কী ব্যাপার, তোমরা কি আমায় বয়কট করলে নাকি? আর কথাই বলো না।”
দীপ টেবিলের পাশে দাঁড়াল। মেয়েরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল।
”আমিই নয় কেলেঙ্কারি করেছি, তোমরা তো করোনি। অথচ আমার থেকে দেখছি তোমরাই বেশি লজ্জা পাচ্ছ। আরে ধ্যাৎ…বসতে দাও আমায়।”
ওরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। একসঙ্গে সবাই কলকল করে উঠল।
”খিদে পেয়েছে, আগে খাওয়া। বলো…?”
”দীপ আর চপ খেতে ভালো লাগে না, আজ ফাউল কাটলেট হোক।” তাপসী বলল।
”তথাস্তু।”
এরপর জ্যোতির দিদির বিয়েতে তারা সবাই মিলে কী দেবে এবং সেজন্য বরাদ্দ কত সেই নিয়ে আলোচনাটা তর্কে পৌঁছতেই দীপ বলল, ”আচ্ছা সেই যে পিকনিকে যাবার কথা হয়েছিল তার কী হল?”
প্রসঙ্গটা মুহূর্তে ঘুরে গেল। ওদের কথা থেকে সে জানতে পারল। কবে পিকনিক হবে তার দিন ঠিক করা আজও সম্ভব হয়নি। নীরেনদা বলেছেন বোরবার হলেই ভালো শুধু চব্বিস ঘণ্টার নোটিশ চাই। এদিকে লীনা বলছে রোববারে ওর মা বেরোতে দেবে না। তাপসীরও এতদিন অসুবিধে ছিল কেননা মা হাসপাতাল থেকে বাচ্চচা নিয়ে ফিরেছে। সংসার তাকেই দেখতে হচ্ছিল। এখন অবশ্য সে ঝাড়া হাত-পা। হৈমন্তীর অবশ্য যেকোনোদিনে আপত্তি নেই।
”তোমরা আমাকে নেবে না?”
”ও মা তোমাকে তো সেই কবে বলা হয়েছে। মনে নেই আমি বললুম নীরেনদা বলেছে দীপ খুব ভালো ছেলে, যে-কোনো মেয়েকে ওর হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়, মনে আছে?”
”খুব। তাহলে আমিও যাব। দিন আজই ঠিক করো।”
”সামনের রোববার।” এতক্ষণে বেহুলা কথা বলল।
”পাক্কা। নীরেনদাকে তাহলে জানিয়ে দাও।” দীপ বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল তুলে ধরল।
চার
”কি দীপাঞ্জন, সিগারেট চলবে নাকি?”
বাঁ হাতে স্টিয়ারিং ডান হাতে লাইটার। ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটটা ধরাবার চেষ্টা করতে করতে নীরেন বলল।
”না।”
নীরেনের পাশে বেহুলা তার পাশে দীপ। পিছনের সিটে তাপসী, লীনা এবং হৈমন্তী।
”না কেন, তুমি অ্যাডাল্ট নও?”
বাতাসে লাইটার নিভে যাচ্ছে। নীরেনের ঠোঁট থেকে সিগারেটটা তুলে নিয়ে বেহুলা নিজের ঠোঁটে রেখে কুঁজো হয়ে সিগারেট ধরাল এবং লম্বা টান দিয়ে নাকমুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে নীরেনের ঠোঁটে গুঁজে দিল।
পিছনের তিনজন পরস্পরকে চিমটি কাটল।
”দীপ লজ্জার কী আছে, আমরা তোমার মা না মাসি।” লীনা বলল।
”কখনো খাইনি।”
”তাহলে আজ থেকে শুরু করো। বিলিতি বেনসন হেজেস টানলে কষ্ট হবে না।” বেহুলা বলল।
”তুই জানিস কষ্ট হবে কি না?” পিছন থেকে চ্যালেঞ্জের মতো কথাটা এল।
বেহুলা সিটের উপর রাখা প্যাকেট থেকে একটা বার করে ঠোঁটে রেখে ধরাল এবং পরপর টান দিয়ে গেল।
পিছনের তিনজন এবার মুষড়ে পড়ল। সিগারেট খাওয়ার মতো যথেষ্ট আধুনিকা না হওয়ার জন্য। ওরা জানে চিমটি কেটে কোনো লাভ নেই, মজাও নেই।
তাপসী হঠাৎ বলল, ”আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ছাদে বসে দুপুরে লুকিয়ে খেয়েছিলাম।”
”কটা?” নীরেন জানতে চাইল।
”আধখানা।”
”তাহলে আজ একটা গোটা শেষ করো।”
”উরে বাবা।”
”খাবি তো খা।” বেহুলা প্যাকেটটা পিছন দিকে বাড়িয়ে দিল।
”না, না কেমন মাথা ঘোরে।”
”আমাকে একটা দাও।” দীপ হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিল। বেহুলা ধরিয়ে দিল।
