”তুমি অনেক বড়ো হয়েছ…সুন্দর দেখাচ্ছে আগের থেকেও।
মণি কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। দীপের মনে হল তার সম্পর্কে কিছুই বলার নেই। সে যেমন ছিল তাই আছে। কিছু বলতে না পারায় মণির মুখে কষ্ট ফুটে উঠেছে দেখে দীপ বলল, ”আমি ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে কলেজে পড়ছি।”
উজ্জ্বল হয়ে উঠল মণি।
”রেকাবিটা তুমি বারান্দায় রেখে গেছলে?”
”না তো!”
”মিথ্যুক। তুমি ছাড়া কে আর অমন হাঁদারাম আছে! যেমন দিয়েছিলে তেমনি ভাবেই ওটা রেখে দিয়েছি।”
দীপ বলতে যাচ্ছিল: বাইরেই কি দাঁড়িয়ে থাকব? কিন্তু এভাবে ওকে ছুঁয়ে থাকা তাহলে আর হবে না। বরফির মতো জালের ফাঁকগুলো খুব ছোটো। হাত গলাবার মতো বড়ো হলে সে মণির মুখে হাত বুলোত। কিন্তু তার হাত তো অত উঁচুতে পৌঁছবে না। ভীষণ লম্বা হয়ে গেছে ও।
”তুমি খুব লম্বা হয়ে গেছ।”
”সত্যি! তুমিও রোগা হয়েছ।”
দীপ হাসল। আঙুলে মৃদু চাপ দিল। মণি জালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
”এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে কেমন যেন লাগছে।”
”খারাপ লাগছে?” দীপ গম্ভীর হতে গিয়েও হল না।
”না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আর আমাদের দেখা বোধহয় হবে না।”
”আমি জানতাম দেখা হবে।”
”জানতে? কী করে?”
দীপ অদ্ভুতভাবে হাসল। কথা বেরোল না মুখ থেকে। শুধু ঠোঁট দুটি নড়ল।
”আমি আর গান শিখি না। মাস্টারমশাইকে তো এতদূরে আসতে বলা যায় না, তাহলে অনেক টাকা দিতে হবে।”
দীপের মুখে দুঃখ ছড়িয়ে পড়ল। অস্ফুটে বলল, ”গান ছেড়ো না, তাহলে কী নিয়ে থাকবে?”
”জানি না। প্রাইভেটে মাধ্যমিক দেব সামনের বার।”
”তাই পড়ছিলে বুঝি। অঙ্ক পার?”
”একদম নয়।”
”আমি শিখিয়ে দিতে পারি, কিন্তু শেখাব না।”
মণির চোখ বড়ো হয়ে উঠল অবিশ্বাসে তারপর কী যেন মনে পড়তেই মাথা নেড়ে বলল, ”মনে করে রেখেছ। আচ্ছা এবার ভেতরে এসো।”
”মা কোথায়?”
”পাশের একজনদের কোয়ার্টারে গেছে, এখনি আসবে।”
”জানো আমি একটা নাটকে অভিনয় করব পার্টটা অবশ্য খুব ছোট্ট।”
”সত্যিইই! ইসস আমি দেখতে পাব না।”
দীপ ফিরে এল রাতের খাওয়া সেরে। মণির মায়ের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। গম্ভীর, ব্যক্তিত্বসম্পন্না মহিলা। খুটিয়ে খুটিয়ে দীপের বাড়ির খোঁজ নিলেন। মণি কোয়ার্টারের ফটক পর্যন্ত দীপের সঙ্গে এসেছিল। রিকশায় ওঠার জন্য দীপকে সাহায্য করতে সে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই হাত ধরেই সে ওঠে এবং কিছুক্ষণ ধরে রেখে তাকিয়েছিল গভীর দৃষ্টিতে। মণির মুখটিকে সে উজ্জ্বল দেখেছিল।
”তাহলে আবার আসব।”
রিকশা চলতেই সে চেঁচিয়ে বলেছিল। পরদিন জ্যোতির সঙ্গে মুখোমুখি হতেই দীপ কিছু একটা বলবার চেষ্টা করে। জ্যোতি শুকনো হেসে পাশ কাটিয়ে চলে গেছল।
তিন
এমন বিপর্যয় কেউ ভাবতে পারেনি। অথচ দীপ রিহার্সালে চমৎকারভাবে অভিনয় করে গেছে। নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে তাকে প্রথম মঞ্চে ঢুকতে হবে। উইংয়ের পাশে দেবু তাকে শেষবারের মতো বুঝিয়ে দেয় কী তাকে করতে হবে। সেই সময় তার পা প্রথম কেঁপে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে গলা শুকিয়ে আসে। সে জলের জন্য ভিতরে এসে গ্রিন রুমের কাছে একটা কলসি আর গ্লাস পেয়ে জল গড়িয়ে সবে চুমুক দিয়েছে তখনি দেবুর চাপা গর্জন শুনল: ”কোথায় বামনটা, স্টেজে ইন করার সময় চলে যাচ্ছে।”
দীপ বিষম খেল এবং কাশতে কাশতেই সে ছুটে বা দেবুর ধাক্কা খেয়ে স্টেজে ঢুকল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে কাঁদতে কাঁদতে বলবে: মাকে মেরো না মেরো না।
তার বদলে সে স্টেজের মাঝে দাঁড়িয়ে কাশতে শুরু করল। স্টেজের উপর প্রধান অভিনেতা ও অভিনেত্রী হতভম্ব হয়ে দাঁড়াল। কাশি সামান্য কমতেই সে ছুটে গিয়ে বাবার বদলে মাকে জড়িয়ে ধরে চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ”মাকে মেরো না, মাকে মেরো না।”
সারা হলঘর প্রথমে মুচকি হেসে উঠেছিল এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
দীপ বিভ্রান্ত হয়ে গেল। অভিনেত্রীটি ওকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় ছিটকে ফেলে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে, ”আমাকে নয় ইডিয়ট, ওদিকে ওদিকে।”
দীপ ছুটে গিয়ে এবার তার নাটকের বাবাকে জড়িয়ে ধরল। সেই সময় দর্শকদের মাঝামাঝি জায়গা থেকে কে চেঁচিয়ে উঠল, ”ওরে এ যে আমাদের ছোটবাবু। শিং ভেঙে বাছুর সেজেছে।”
উটের পিঠে এটাই ছিল শেষ কুটো। দীপ দর্শকদের দিকে তাকাল এবং পরিচালকের নির্দেশমতো বাবার পা জড়িয়ে ধরে লাথি খাওয়ার ঘটনাটা না ঘটিয়ে পিছিয়ে গেল। বাবা তখন অগত্যা নাটক রক্ষার জন্য ছুটে গিয়ে ছেলের পিছনে লাথি মারল। লাথিটা ঠিক নাট্যসম্মত না হয়ে যথেষ্ট জোরালোই হয়। মায়ের মতো বাবাও তখন দাঁত ঘষছিল।
দীপ স্টেজের উপর পড়ে রয়েছে। দর্শকরা হইচই করে উঠল।
”মরে গেছে, মরে গেছে।”
”বল হরি হরি বল।”
”ওরে এবার ওঠ, খুব হয়েছে।”
”আরে মশাই, একটা দামড়া বামনকে নিয়ে কি বাচ্চচার পার্ট হয়?”
দীপ কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দর্শকদের দিকে তাকাতেই তার মনে হল বেহুলা আর জ্যোতি যেন তৃতীয় সারিতে বসে।
স্টেজ থেকে সে বেরিয়ে এল। গ্রিন রুমে ঢুকে সে ড্রেসারের দেওয়া জামাটা খুলে নিজের জামা, জুতো পরল। ঘড়ি এবং মানিব্যাগ নিয়ে সে সোজা বেরিয়ে এল রাস্তায় মুখে রঙ মাখা অবস্থায়।
ট্যাক্সি পেল না। বাসের যাত্রীরা তার দিকেই তাকিয়ে ছিল যতক্ষণ না সে নেমে যায়। উৎপলা ওকে দেখেই আঁতকে উঠল। ”একি রে? যাত্রাটাত্রা করে এলি নাকি?”
