চিৎ হয়ে পা নাচানো লোকটিই বাবা। দীপ যখন তাকে জড়িয়ে ধরছে লোকটির ক্রুদ্ধ মুখে হাসি ফুটে উঠছে।
”অমিয় সিরিয়াস, বি সিরিয়াস।” দেবু হুঁশিয়ার করে দেয়।
একসময় অমিয় বলল, ”দেবু ভয়েসটাতো বাচ্চচার মতো নয়।”
”চলে যাবে।”
ওখান থেকে ছাড়া পেয়ে দীপ যখন বাড়ি ফিরছে তখন অদ্ভুত একটা উত্তেজনার ঘোরে সে আচ্ছন্ন। মঞ্চে উঠবে, কয়েকশো লোকের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হবে এটা সে জীবনে ভাবেনি। মাত্র তিন চারটি ছোটো বাক্য। মুখস্থ করারও দরকার লাগে না। মঞ্চে শুধু সামান্য ঘোরাফেরা তাকিয়ে থাকা মাত্র দুটি দৃশ্যে। দুর্দান্ত দারুণ অভিনয় করে দর্শকদের চমৎকৃত করার বাসনা কোনোদিন তার ছিল না কিন্তু এখন তার হচ্ছে।
পরদিন ঘোষ কেবিনে বসে পাঁচটি মেয়েকে যখন জানাল সে নাটকে অভিনয় করছে তখন পাঁচজনই প্রায় বিমূঢ় হয়ে গেল। কতকগুলো বিস্ময়সূচক ধ্বনি একসঙ্গেই তার উপর আছড়ে পড়ল। অবশেষে জ্যোতিই বলল, ”তাহলে তো দেখতে যাবই।”
”না না, এটাই জীবনে প্রথম। তোমরা গেলে নিশ্চিত ঘাবড়ে যাব।” দীপ যেভাবে বলল তাতে ওদের মনে হল সে ইতিমধ্যেই নার্ভাস।
”আমরা যাবই।” বেহুলা টেবলে ছোট্ট কিল বসাল।
”আমরা টিকিট কেটে যাব, তুমি যাওয়া আটকাবে কি করে? বেহুলা তুই নীরেনদাকে বলিস তো। আমি দেবুকে বলে রাখব টিকিটের জন্য।”
”ও শিলিগুড়ি গেছে, বোধহয় রবিবারই ফিরবে।”
”ঠিক আছে আমরাই টিকিট কেটে নেব।”
”না না প্লিজ। যদি ভালো হয় তাহলে পরের বার তোমরা যেয়ো।”
”ওরে বাবা, প্রথম শো কি মিস করতে আছে!”
মেয়েরা যত জিদ ধরে দীপ ততই মনের গভীরে অদ্ভুত একটা সুখের গড়াগড়ি অনুভব করে। সে ভুলে যায় তার দেহের কথা। নিজেকে লম্বাদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে-কোনো সুযোগই সে হাত বাড়িয়ে নিতে রাজি।
ওরা একসঙ্গে ঘোষ কেবিন থেকে বেরিয়ে আলাদা হয়ে গেল শুধু জ্যোতি আর দীপ ছাড়া। ট্রাম স্টপে দাঁড়িয়ে বলল, ”তাহলে রোববার সকালে?”
”আমার টিকিটটা দাও।”
”কেন থাক না, এসপ্ল্যানেডে মিট করে একসঙ্গেই যাব।”
”আমার ঠিক নেই বেরোবার, সকালে অনেক কাজ থাকে।”
”তোমার আবার কী কাজ, মা আছে দিদি আছে!”
”মা আছে কী দিদি আছে তা নিয়ে অত কথায় দরকার কী, টিকিটটা যদি সঙ্গে থাকে তাহলে দাও।” জ্যোতি ঝাঁঝালো স্বরে কথাগুলো বলে তার দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইল। দীপ মানিব্যাগ থেকে টিকিট বার করে ওর হাতে দিল। একটু ম্লান হাসলও। হঠাৎ ঝেঁঝে ওঠার মতোই জ্যোতি মুহূর্তে নরম হয়ে গেল।
”সত্যিই রোববার আমার কাজ থাকে, অনেক রকমের।”
অনেক রকমের কাজটা যে কী তা আর বলল না। দীপের মনে হল জ্যোতি যেন চায় না প্রকাশ্যে তার সঙ্গে থেকে লোকের চাউনি সহ্য করতে। এটা সে বহুবার অন্যদের সঙ্গে থেকেও লক্ষ্য করেছে। সঙ্গীরা অস্বস্তি বোধ করে, দূরে দূরে সরে থাকে অপরিচিতের ভান করে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি দেখেছে। তার সঙ্গে যারা থাকে তারাও যেন হাসির পাত্র হয়ে ওঠে।
”তাহলে রবীন্দ্র সদনেই দেখা হবে। দশটায়।”
রবিবার সকাল এগোরোটা পর্যন্ত দীপ বিছানায় গড়াল। অভিমান নয় রাগও নয়, সেদিন ট্রাম স্টপেই সে ঠিক করে ফেলেছিল রবিবার সে যাবে না এবং হঠাৎই তার মণিকে মনে পড়তে থাকে। তার সঙ্গে বেরোতে মণি অন্তত লজ্জা পেত না। সেদিন ভোরে মণির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ার, ওর পড়ে যাওয়ার, দৃশ্যগুলো পরপর তার চোখে ভেসে উঠতে থাকল। স্টিলের রেকাবিটা দেখে মণি আর তার মা কীরকম অবাক হয়ে গেছল তা আর জানা হয়নি।
দুপুরে সে শ্যামনগর স্টেশনে নেমে সাইকেল রিকশায় উঠল। রিকশাওয়ালা তাকে উঠতে সাহায্য করল। ব্যানার্জিবাবুর কথামতো জুট মিলের পাঁচিলের শেষ প্রান্তের গেট দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে দোতলা বাড়ি দেখে রিকশা থেকে নামল। ‘বাঁদিকে দুটো বাড়ির প্রথমটার শেষ দিকে, একতলায়’ ব্যানার্জিবাবুর নির্দেশটা তার মুখস্থ হয়ে আছে।
রিকশাওলাকে ভাড়া মিটিয়ে সে সন্তর্পণে এগোল শ্বাস বন্ধ করে, অ্যাডভেঞ্চারে যাবার মতো উত্তেজিত হয়ে। একতলার শেষের ঘর বা কোয়ার্টার। জাল দেওয়া ছোট্ট বারান্দা, তার পাশে ছোটো সরু দরজা। দীপ জাল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাকাতেই দেখল মেঝেয় মাদুরে উপুড় হয়ে শাড়িপরা কে একজন খাতায় কী টুকছে বই থেকে।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে মণিকে চিনতে পারল। সে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। বড়োজোর আড়াই বছর কেটে গেছে শেষবার দেখার পর। কত বড়ো হয়ে গেছে মণি, কত সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। দেয়ালে হেলান দেওয়া ক্রাচ দুটো এইবার তার চোখে পড়ল। এখনও ব্যবহার করতে হয়, সারাজীবনই করতে হবে।
মিলের ভোঁ বেজে উঠল। মণি নড়েচড়ে কিছু একটা চিন্তা করতে করতে মুখটি তুলল এবং দীপকে দেখতে পেল। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকার পর হুড়মুড়িয়ে উঠে সে বিনা ক্রাচে লাফিয়ে এসে জাল আঁকড়ে ধরল দু হাতে।
ওর আঙুলগুলোকে দীপ আঁকড়ে ধরল নিজের আঙুলে।
”আমি একবার এসেছিলাম। তোমরা তখন ছিলে না।”
”তোমাদের বাড়ির ঠিকানাটা নেই, নইলে চিঠি দিতাম।”
কথা নেই। দুজনে নির্নিমেষে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে। দুচোখ ভরা হাসিতে। মাঝখানে জাল। আঙুলগুলো কেউই সরাচ্ছে না।
