”আমরা মোটরে যাব।”
”ওহ তোমাদের হিংসে হচ্ছে। আমি কখনো পিকনিকে যাইনি।”
”তাহলে চলো না আমাদের সঙ্গে।” হৈমন্তী কথাটা বলতেই তাপসী ওকে চিমটি কাটল।
”এটা নীরেনদার পিকনিক। তাকে না বলে কাউকে ইনভাইট করাটা ঠিক হবে না।”
”দীপ যাবে শুনলে আপত্তি করবে না।”
”তুই জানিস?”
”হ্যাঁ জানি। সেদিন কি বলল শুনিসনি! ‘দীপের হাতে যে-কোনো মেয়েকে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়া যায়, ছেলেটা খুব ভালো।’ এমন কথা কটা ছেলের সম্পর্কে বলা যায়?”
দীপ হাসছিল কিন্তু তার বুকের মধ্যে একসঙ্গে দশটা ছুঁচ বেঁধার যন্ত্রণা হচ্ছে। তাকে পুরুষ মানুষ রূপে নীরেনদা গ্রাহ্যই করে না এবং এই মেয়েরাও। তার কাছে মেয়েরা নিরাপদ, এ কথা যে-কোনো যুবকের কাছে লজ্জার। ওরা ধরেই নিয়েছে তার ইচ্ছা তার প্রয়োজন তার শরীরের মতোই ছোটোখাটো এবং সেগুলো যথেষ্ট নয় পুরুষ হয়ে ওঠার জন্য।
”দীপ তুমি কি যাবে আমাদের সঙ্গে?”
”নিশ্চয় যাব। কিন্তু এখন আমার চণ্ডী মঙ্গলের ক্লাস রয়েছে সুতরাং…।”
বড়ো সেলাম নিয়ে দীপ বেরিয়ে এল তার সঙ্গে তিনটি মেয়েও। কলেজের দোতলার বারান্দায় সে জ্যোতিকে দেখতে পেয়ে হাসল, জ্যোতিও হাসল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ”টিকিট কেটে ছিলাম সুবিনয় রায়ের একক অনুষ্ঠানে এক বন্ধুকে শোনাব বলে। হতভাগা আজ বলল যেতে পারবে না। টিকিটটা নষ্ট হবে না যদি তুমি যাও।” আজকের কাগজেই সে এই অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখেছে।
”আর কাউকে তো দিতে পার।”
”দিতে ইচ্ছে করছে না। যে গান বুঝবে তাকেই তো দেওয়া উচিত।”
”কবে?”
”রোববার সকালে, রবীন্দ্রসদনে।”
”পরে বলব।”
”কাল বাবার সঙ্গে কথা বলেছি ওই ব্যাপারটা নিয়ে।”
জ্যোতি উৎসুক চোখে তাকাল। দীপ গম্ভীর হয়ে বলল, ”হাজার টাকার কমে হবে না।”
”ওহ।”
দীপ হাসতে শুরু করল। জ্যোতি বিভ্রান্ত হয়ে বলল, ”হাসছ কেন?”
”বাবা বলল, তোর বন্ধুকে বলিস, এক পয়সাও লাগবে না।”
রবিবার পর্যন্ত দীপ পালকের মতো হাওয়ায় ভাসল। জ্যোতি টিকিট নিতে রাজি হওয়ার পর সেই বিকেলেই, বিজ্ঞাপন দেখা টিকিট বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট স্থানগুলোর একটা, শ্যামবাজারের মোড়ের দোকানটা থেকে সে দুটি টিকিট কিনে নিল।
ইতিমধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপারে দীপ জড়িয়ে পড়ল। দেবু তার জন্য ক্লাসের বাইরে বারান্দায় অপেক্ষা করছিল। ক্লাস থেকে বেরোতেই সে তাকে ধরল।
”কথা আছে। আমার সঙ্গে চারটের সময় যেতে পারবে?”
”কোথায়?”
”যেখানে আমাদের রিহার্সাল হয়। এখান থেকে হেঁটে মিনিট দশেক।”
”আমি কী করব?”
”কিছুই করবে না। চারটের সময় গেটে থাকব।”
দেবু লম্বা পা ফেলে চলে গেল। কৌতূহলে দীপ ছটফটাল চারটে পর্যন্ত। দেবু গেটে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখেই হাতঘড়িটা চোখের সামনে তুলে ”চলো” বলেই হাঁটতে শুরু করল।
”ব্যাপারটা কী?”
”আমি শুনেছি তুমি ভালো অভিনয় করতে পারো।”
”সে কি! জীবনে মাত্র দুই কি তিনবার আমি থিয়েটার দেখেছি, অভিনয় তো দূরের কথা।”
ওর কথাগুলো ধর্তব্যের মধ্যে না এনে দেবু বলল, ”স্কুলের গো অ্যাজ ইউ লাইকে তুমি একটা হারিয়ে যাওয়া বাচ্চচা ছেলে হয়েছিলে, অসাধারণ নাকি করেছিলে।”
”কে বললে তোমায়, ধ্যুৎ, বাজে কথা। ওটা কোনো অভিনয়ই নয়।”
”দেখা যাক। আমরা যে নাটকটা নামাচ্ছি জার্মান লেখক হার্মান গ্যোহরের ফরেস্টস অব ইডেন। নাম শোননি নিশ্চয়, অবস্কিওর লেখক। অমিই অ্যাডাপ্ট করেছি। তাতে একটা বাচ্চচার ছোট্ট একটা রোল আছে।”
”আমাকে করতে হবে!”
”যে বাচ্চচাটাকে দিয়ে করাব ভেবেছিলাম, কয়েকটা রিহার্সালও দিয়েছে, হঠাৎ সে পা ভেঙে শয্যাশায়ী। বছর আষ্টেকের ছেলে।
”তার জায়গায় আমি?”
”অসুবিধেটা কী?”
দেবু প্রায় ধমকের সুরে বলল। দীপ আমতা আমতা করে আর কথা বাড়াল না। বড়ো রাস্তা থেকে তারা গলিতে ঢুকল। তারপর আবার একটা মাঝারি রাস্তায়। একটা মুদির দোকানের গা ঘেঁষে সরু পথ ধরে টালির চালের একতলা একটা বাড়িতে তারা পৌঁছল।
চারজন যুবক শতরঞ্চিতে বসে। তাদের দেখেই নড়েচড়ে বসল।
”বাবলুর রোলটা এ করবে।”
চারজোড়া চোখের তীক্ষ্ন দৃষ্টি দীপকে গেঁথে ফেলল। অবশেষে একজন বলল, ”মুখটা তো কচি ছেলের মতো নয়। শরীরের মাসলগুলোও স্টিফ।”
দেবু অধৈর্য স্বরে বলল, ”মেক আপে সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় সাতদিনও নেই এখন বাচ্চচা খুঁজে বার করব কোথা থেকে?”
এরপর ওরা আর কথা বলল না। দুজন সিগারেট ধরাল। বাসি খবরের কাগজ পড়তে শুরু করল তৃতীয় জন। বাকি জন চিৎ হয়ে শুয়ে পায়ের উপর পা তুলে নাচাতে লাগল।
দেবু সংক্ষেপে কাহিনিটা দীপকে বলেছিল, স্বামী, স্ত্রী এক বাচ্চচার সংসার। নিত্য অশান্তি। স্ত্রীকে মারধোর করে স্বামী মদ খেয়ে এসে। বাচ্চচাটা তখন বাবাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচায়: মেরো না মাকে মেরো না বলে। এমন ঘটনা নাটকে দুবার ঘটবে। অবশেষে মা তার প্রেমিকের সঙ্গে চলে যাবে। যাবার সময় বাচ্চচা বলবে: মা এবার থেকে বাবাকে কে রেঁধে দেবে, কে জামা-প্যান্ট ইস্ত্রি করে দেবে। এইরকম দু-চারটে সেন্টিমেন্টাল ডায়লগ। ব্যাস, এখানেই বাচ্চচার রোল শেষ।
”না পারার কি আছে? আজই রিহার্সাল দিয়ে দ্যাখো।”
দীপ দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সুযোগই পেল না। কিছু বলতে গেলেই দেবু তার গমগমে গলায় ”আচ্ছা আচ্ছা” আর ”হবে হবে” বলে থামিয়ে দেয়।
