-আজ সকালেই চিঠি এসেছে। সেই কবে ছ’মাস আগে একবার পরীক্ষা দিয়েছিল, তাই ডেকে পাঠিয়েছে। শুরু হবে দেড়শো টাকার ওপর থেকে। তারপর পরীক্ষা দেবার সঙ্গে সঙ্গে মাইনেও বাড়বে। আর বিশ্বর যা মাথা, পরীক্ষায় কোনদিন ফেল তো করেনি!
আর শুনতে ইচ্ছে করছে না রমার। হাতের বাটিটা কাঁপছে। এখন ছুটে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে ভাল লাগবে। একটা কথাও আস্ত হয়ে মনে পড়বে না। টুকরো টুকরো কথা বুদবুদের মতো কেটে কেটে যাবে, শুধু সামান্য ঢেউ উঠবে। সেই ঢেউয়ের কাঁপনটাই তখন ভাল লাগবে মুখ গুঁজে উপভোগ করতে।
আশা বক বক করে চলেছে। কিছুই কানে ঢুকছে না। মাথার ওপরের এরোপ্লেনটা অনেক দূরে চলে গেলে শব্দটা একটানা হয়ে যায়। আশা একটানা শব্দ করে যাচ্ছে। রমার কৌতূহল আর নেই।
-দিদি আমি যাচ্ছি।
ভূতে পাওয়ার মত রমা নামছিল। সিঁড়িটা অন্ধকার। ধাপগুলো ভাঙা। কে যেন ওপরে আসছে। রমা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল।
-কোত্থেকে?
একধাপ নিচুতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব জিজ্ঞাসা করল।
-তোমাদের ঘর থেকে।
-এখন যে!
-এমনি। একটা খবর শুনলুম, সত্যি?
রমা একধাপ উঠে দাঁড়াল। ভীষণ কাছাকাছি তারা দাঁড়িয়েছিল। সিঁড়িটাও অন্ধকার। যে কেউ এখন এসে পড়তে পারে।
-আগে শুনি খবরটা কি?
-থাক আর ন্যাকামো করতে হবে না। বলো না সত্যি?
বিশ্ব একধাপ উঠে এল। রমাও পিছিয়ে যাচ্ছিল। বিশ্ব হাতটা ধরে আটকে রাখল।
-বাটি! কি এনেছিলে?
-মাছ। হাত ছাড়।
-পিছিয়ে যাচ্ছিলে কেন। অমনি করে পিছিয়ে পিছিয়ে শেষকালে কিন্তু আমার ঘরেই পৌঁছতে।
কথার জবাব না দিয়ে রমা মোচড় দিয়ে হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল।
-কি জবাব দিচ্ছ না যে?
বিশ্ব মুঠো আলগা করল। ছাড়া পেয়েই রমা ওপর দিকে উঠে যাচ্ছিল। আবার ধরল বিশ্ব। দুহাতে ওর দুই বাহু।
-ছাতে যাবে?
ওরা ছাতে এল। এ সময়ে কেউ ছাতে আসে না, তবু হয়তো কেউ এসে পড়তে পারে। কিন্তু আপাতত ওদের যেন কোন ভয়-ডর নেই।
-এই আর না।
মুখটা পিছনদিকে হেলিয়ে দিল রমা। দু’হাতে আবার টেনে আনল বিশ্ব।
-হাতে বাটি আছে, এবার কিন্তু এক ঘা বসিয়ে দোব।
-দাও।
ঘা দেওয়া হল না। বিশ্বর চুলের ধার ঘেঁষে একটা তারা দেখতে পেল রমা। এক তারা দেখতে নেই। দেখলে কি যেন হয়। আরো দুটো তারা খুঁজে দেখতে হবে। কিন্তু কে দেখে! এই বেশ লাগছে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা।
-এই। এই মেয়েটা!
-উঁ।
-কথা বল।
-কি বলবো।
-যা খুশি।
ঘাড়ে, গলায় মুখ ঘষছে বিশ্ব। দাড়ি কামায় নি। জ্বালা করছে। এখন মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বিশ্বর কাঁধে নাক চেপে ধরল রমা। নিঃশ্বাস জমে উঠছে বুকের মধ্যে। বুকটা ভারী হয়ে উঠছে। টলটল করছে। মরার কথা ভাবতে এখন ভারি ভাল লাগে।
-একটা চাকরি পাব বোধ হয়।
-দিদি তাই বলছিল।
-তোমার বাবা মা রাজী হবে তো?
-জানি না। ছাড় এখন, উনুন কামাই যাচ্ছে।
-যাকগে। যদি রাজী না হয় তোমায় নিয়ে পালাব।
-আর চাকরি!
-ওই তোমার দোষ। বড্ড খুঁত ধর কথার।
মজা লাগছে রমার। মিথ্যা বলা বিশ্বর উদ্দেশ্য নয়। তবু আবোল তাবোল কথা বলছে। শুনতে ভাল লাগে। চাকরি পাবে বলেই তাই অনায়াসে চাকরি ছেড়ে পালাবার কথা বলতে পারল। সত্যি সত্যি কি আর তাই বলে পালাবে! এটা শুধু ভালবাসা কতখানি গভীর, তারই জানান দেওয়া। রমার সত্যিই গর্ব হচ্ছে!
-চাকরি পেলে তো আমায় ভুলে যাবে।
-হুঁ।
-দেড়শো টাকার ওপর মাইনে। কত সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ আসবে।
-যে আপিসে চাকরি, সেখানে মেয়েরাও চাকরি করে।
-তাহলে তো আরো ভাল। মুখ্যু মেয়েকে তো আর মনেই থাকবে না।
-হ্যাঁ।
-তাহলে ছাড়, চলে যাই। আঃ আমি কি মানুষ নই, লোহা দিয়ে তৈরী? লাগে না বুঝি?
-না, তুমি মানুষ। মাংস দিয়েই তৈরী। আর একটু থাক। লক্ষ্মীটি আর একটু থাক।
.আরশুলাটাকে মুখে ধরে নিথর হয়ে আছে টিকটিকিটা। মাখমের মত নরম পেট। লেজে সরু সরু দাগ। কালজিরের মত চোখ। মুখের দুপাশে আরশুলার দাঁড়াগুলো গোঁপের মত বেরিয়ে। মাঝে মাঝে খেলার আমোদে যেন দাঁড়াগুলো নাড়াচ্ছে।
আরশুলাটা কি খুব মজা পাচ্ছে! দিনেশ একদৃষ্টে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই টিকটিকিটা ওকে ছেড়ে দেবে। এক ফোঁটা রসও আর তখন বাকি থাকবে না।
এমনি করেই মরতে হবে। মরার সময় মনে এক ফোঁটা কামনাও বাকি থাকবে না। নিঃশেষ হতে হতে তখন এমন অবস্থায় পৌঁছতে হবে যে বাঁচার আর কোন মানেই থাকবে না। কেউ একফোঁটা শোক করবে না। হাঁফ ছেড়ে বলবে সবাই, গেছে ভালই হয়েছে। করুণা পাবার জন্য দুঃখ নেই কিন্তু তার অনুপস্থিতিটা কারুর চোখে ঠেকবে না, দরকারের কথাতেও তাকে মনে পড়বে না, এটাই তো অসহ্য! মরতে যদি হয় তো তেমন করেই মরা উচিত, যখন তার প্রয়োজন একেবারে ফুরিয়ে যায় নি। প্রয়োজন থাকলেই তার সম্মান আছে। টাকার প্রয়োজন আছে বলেই তার সম্মান আছে। মাধবী তাকে সম্মান করে না, তার মানে কি প্রয়োজন ফুরিয়েছে?
জীবনে কৃতি হতে না পারাটা কি দোষের। প্রত্যেক মানুষের চেষ্টাই তার ক্ষমতার গণ্ডীতে বাঁধা। তাকে লঙ্ঘাতে পারে কে! মাধবীর উচ্চচাশা বড় বড়। তাই গণ্ডীতে পৌঁছেই ঘা খায়। ব্যথায় চীৎকার করে ওঠে। ও যদি মনের ইচ্ছেগুলোকে অতখানি বাড়তে না দিত তা হলে সুখী হ’ত। যেটুকু পেয়েছি তাতেই খুশি থাকা ভাল। কিন্তু সে খুশিটুকুও আর রাখা যাচ্ছে না। হাবে ভাবে মাধবী বুঝিয়ে দিচ্ছে, তার উপস্থিতির আর দরকার নেই। সাহায্য যে করে তাকেই দরকার পড়ে। পরিশ্রমী মানুষকেই দরকারী বলে মাধবীর চোখে নিজেকে দরকারী করে তুলতে হলে খাটতে হবে। কেমন করে, কি উপায়ে খাটতে হবে? ভগবান জানেন সে কথা। বয়স হয়েছে। এখন সব পথ বন্ধ। সব পথ বন্ধ। সব। আর ক্ষমতা নেই নতুন কিছু করার। বুড়ো সিংহের মত ভালমানুষ সেজে বসে থাকতে হবে যদি কখনো ভুল করে সুযোগ সুবিধে নাগালের মধ্যে এসে পড়ে। ভান করতে হবে, নিজের স্বভাব চরিত্র ত্যাগ করতে হবে। বাঁচার জন্য সব পারা যায়। কিন্তু এ বাঁচা কিসের জন্য?
