”সেজন্য আপনি ভাববেন না। কত লাগবে সেটা আমি বুঝব।”
”তবু…একটা আন্দাজ পেলে…”
তার দিকে প্রত্যাশা ভরা চাউনি মেলে খাটের বাজু ধরে জ্যোতি দাঁড়িয়ে ওর বাবার চোখের মতোই চাইছে দীপ এমন কিছু একটা বলুক যা আশ্বস্ত করবে। ওর বড়ো সুখবোধ হল। এমন কিছু একটা সে বলবে যাতে ওরা অভিভূত হয়ে যায়, তার উচ্চচতা বেড়ে যায় এদের কাছে।
”আমার একদমই ধারণা নেই তবে হাজার টাকার মধ্যেই হবে মনে হচ্ছে।”
ওরা চুপ করে রইল। এরপর কথাবার্তা অন্যদিকে মোড় নিল। জ্যোতির দিদির সঙ্গে আলাপ হল। ছোটো ভাই একবার ঘরে এসেই কী একটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার সঙ্গে কেউ দীপের পরিচয় করাল না।
দীপ যখন উঠল তখন সন্ধ্যা নামছে। সদরে দাঁড়িয়ে জ্যোতি ওর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল, ”যেখানে যতটুকু সাশ্রয় হয় সেই চেষ্টাই করি, যদি কিছুটা কমসমে হয় তাহলে সত্যিই উপকার হয়।”
ওর এই কাঁধে হাত রাখাটা দীপকে অসম্ভব নাড়া দিল। তার ইচ্ছা করল জ্যোতির মুঠো একবার নিজের মুঠোর মধ্যে নেয়। কিন্তু সাহস হল না।
”আমি কাল তোমায় বলব।”
রাত্রে সে পড়ার অজুহাতে খেতে বসায় দেরি করল যতক্ষণ না বাবা ফেরে। কৃষ্ণচন্দ্র সাধারণত রাত দশটায় ফেরে, আজও ফিরল। দীপ অপেক্ষা করে রইল খাওয়ার টেবলে বাবার বসার জন্য।
দুজনে মুখোমুখি খেতে বসল। কৃষ্ণচন্দ্র দু বেলা একাই খেতে বসে। আজ ছেলেকে দেখে সে খুশিই হল।
”কলেজ কেমন লাগছে?”
”ভালোই।”
”সবার সঙ্গে আলাপ হচ্ছে?”
”হুঁ।”
দুজনে চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল। এক সময় দীপ মুখ নিচু করে মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল, ”ক্লাসের একটি মেয়ের দিদির বিয়ে। আমি বলেছি ডেকরেটিংয়ের যা যা দরকার আমি দোব।”
”দোব মানে।”
”টাকা নোব না।”
দীপ সন্তর্পণে মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। কৃষ্ণচন্দ্র অবাক হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।
”টাকা নোব না মানে?”
দীপ চুপ করে রইল। উৎপলা নীরবতা ভেঙে বলল, ”তুই কি বলে দিয়েছিস টাকা দিতে হবে না?
”হ্যাঁ।”
উৎপলা স্বামীর দিকে তাকাল। গম্ভীর মুখে কৃষ্ণচন্দ্র ভাত নাড়াচাড়া করছে।
”আমি বলতাম না বিনি পয়সায় করে দেবার জন্য। কিন্তু আমাকে তো লম্বা হতে হবে।”
দীপের গলার স্বরে ওরা দুজনে সচকিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
”তোমরা তো আমার মতো বামন নও। তোমরা লম্বা লোক, তোমাদের চার পাশে তোমাদের হাইটেরই লোক, কি করে বুঝবে আমার অসুবিধেটা। সবার মধ্যে আমাকে আমার এই কুৎসিত বিসদৃশ দেহটাকে নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। আমার সঙ্গে কেউ মিশবে না, কেউ পাত্তা দেবে না যদি না আমি তাদের খুশি করি। সেজন্য আমায় টাকা খরচ করতে হয়, উপকার করতে হয়। আমার এই শরীরটার জন্য আমি তো দায়ী নই…কেউই দায়ী নয়। ভগবান আমায় মেরে দিয়েছেন।”
দীপ তার চেয়ার থেকে নেমে বেসিনে গিয়ে হাত ধুল এবং নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
পরদিন সকালে উৎপলা চা দিতে এসে বলল, ”তোর বাবা বলেছে করে দেবে টাকা নেবে না।”
কলেজে ঢোকার সময় ফটকের কাছে লীনা আর তাপসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীপ এগিয়ে গেল।
”আর যে তোমাদের দেখতেই পাই না।” হালকা চটুল স্বরে দীপ বলল। ”ঘোষ কেবিনে আর যাওনা?”
”কেন যাব না, কালও তো গেছি। বরং তুমিই আসো না।” তাপসী বলল।
”বটে! তাহলে আজ…একটা পঁয়তাল্লিশে অফ আছে, তোমাদের?”
”আমাদের অফ থাকুক বা না থাকুক মোটকথা যাচ্ছি।” লীলা যথাসাধ্য প্রগলভ হবার চেষ্টা করল সুদর্শন একটি ছেলেকে সামনে দিয়ে যেতে দেখে।
একটা-পঁয়তাল্লিশে বেরিয়ে দীপ ঘোষ কেবিনে ঢুকে দেখল লীনা, তাপসী এবং হৈমন্তী চা খাচ্ছে। তাদের সামনে খালি প্লেট, তাতে পেঁয়াজের কুচি আর সস লেগে রয়েছে।
”দীপ বড্ড খিদে পেয়েছিল, তুমি আসার আগেই আমরা তোমার কাজ এগিয়ে রেখেছি।”
‘খুব ভালো খুব ভালো।” খালি চেয়ারটায় উঠতে উঠতে দীপ বলল।
”অ্যাই ওর জন্য চপ আনতে বল।” হৈমন্তী বলার সঙ্গে সঙ্গেই সেলাম দিয়ে ছেলেটি দীপের পাশে দাঁড়িয়েছে।
”একটা চপ?”
দীপ ঘাড় নাড়ল। ”তোমরা আজ তিনজন যে?”
”বেহুলা আসেনি, কাল বলেই দিয়েছিল আসবে না। আর জ্যোতিকে ইংরিজি ক্লাসে দেখেছিলুম, তুমিও তো দেখেছ।”
”দেখেছি। আর কিছু খাবে?” দীপ সবার মুখের দিকে পর পর তাকাল। ওরা ইতস্ততঃ করছে। হঠাৎ হৈমন্তী বলল, ”আমি আর একটা চপ খাব।”
”তাহলে আমিও।” তাপসী জুড়ে দিল।
”লীনা?”
”একটা মামলেট।”
দীপ তুড়ি দিয়ে ছেলেটিকে ডাকল। অন্যান্য টেবল থেকে আড়চোখে অনেকেই তাদের দিকে তাকাচ্ছে। অনেকের চোখে কৌতূহলের বদলে ঈর্ষা।
”তাপসী, কালই বেহুলাকে বলতে হবে আমরা যাব কি যাব না, তুই যাবি তো?” লীনা বলল।
”তুই আমার মাকে গিয়ে বলবি, নয়তো মা ছাড়বে না। রোববার না হয়ে অন্যদিন হলে কলেজে যাবার নাম করে চলে যেতুম।”
হৈমন্তী ঝুঁকে বলল, ”দিন ঠিক হয়ে গেছে কি?”
”সেটাই তো কাল বলে দিতে হবে। নীরেনদা তো আমাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে।”
ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছে। সামনে বসা দীপের যেন অস্তিত্বই নেই ওদের কাছে। অবশ্য সেজন্য সে কিছুই মনে করছে না। জ্যোতি না থাকায় সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে কথা বলতে।
তবু এক সময় সে বলল, ”মনে হচ্ছে তোমরা যেন কোথাও যাবার প্ল্যান করছ।”
”নীরেনদার সঙ্গে আমরা পিকনিকে যাব। ওর বন্ধুর বিরাট বাগান আছে নৈহাটির কাছে।”
