রাত্রে সে উৎপলাকে তার হাত খরচের টাকা বাড়ানোর জন্য বলল।
”কেন রে?”
”বন্ধুদের খাওয়াতে হবে।”
মায়ের মুখ ভাব লক্ষ্য করে সে মুখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ”আমাকে এখানে তিনটে বছর তো কাটাতে হবে।”
কিছুক্ষণ দুজনেই নির্বাক রইল।
”কত টাকা লাগবে?”
”ঠিক জানি না, শ’-দুই দিতে পারবে?”
উৎপলা অনেকক্ষণ পর বলল, ”আচ্ছা।”
ইংরেজি ক্লাস আট নম্বর ঘরে। থাক থাক গ্যালারি। পাশ ও অনার্স সব ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে বসে। গ্যালারির প্রথম দুই সারিতে বসে মেয়েরা। ক্লাসে ঢুকে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে যাবার সময় সামনের বেঞ্চে হৈমন্তী বসে আছে দেখে সে বলল, ”কেমন লাগল ব্যান্ডেল চার্চ?”
”ভালো। তোমার কথা নীরেনদা যেতে যেতে বলছিল।”
”কেন!”
”চারটে মেয়ের সঙ্গে একজন পুরুষ সেজন্য ওর অস্বস্তি হচ্ছিল। পার্টিটার ঠিক ব্যালান্স হচ্ছিল না।”
”আমাকে দিয়ে কি সেটা হত?” দীপ অবাক হলেও মিটমিট হাসতে লাগল। ”এইটুকু মানুষ দিয়ে কি ব্যালান্স আনা যায়?”
অধ্যাপক ঘরে ঢুকেছেন। দীপ আর কথা না বলে গ্যালারির উপরের শেষ বেঞ্চে দেয়ালের দিকে বসল। সেখান থেকে অধ্যাপককে দেখা যাচ্ছে না এবং সেও দেখতে পাচ্ছে না। সেজন্য তার কোনো অসুবিধা নেই। পড়ার ব্যাপারটা তো বাড়িতেই হয়।
শীর্ণ, কুঁজো এবং কর্কশ গলার অধ্যাপক ছাত্রদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে রোল নম্বর ডেকে যাচ্ছিলেন। কেউ সাড়া না দিলে তখন মুখ নামিয়ে খাতায় আঁচড় দিচ্ছিলেন।
”সিক্সটি ওয়ান।”
”ইয়েস প্লিজ।”
অধ্যাপকের ভ্রূ কুঁচকে গেল। তিনি আবার ডাকলেন, ‘সিক্সটি ওয়ান।”
”ইয়েস প্লিজ।”
দীপ দাঁড়িয়েই ছিল। ঘরের পিছন দিকটা একটু অন্ধকার। বিদ্যুৎ না থাকায় পাখা বন্ধ আলোও জ্বলছে না। সে হাত তুলে আবার বলল, ”ইয়েস প্লিজ।”
”কই দেখতে পাচ্ছি না, উঠে দাঁড়াও।”
পাশের ছেলেটি দীপকে বলল, ”বেঞ্চের উপর উঠে দাঁড়াও।”
দীপ তাই করল। সারা ক্লাস তার দিকে তাকিয়ে। বিস্ময় কৌতূহল আর মুচকি হাসি তার দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
”ব্যাপার কি। তুমি…” অধ্যাপক থেমে গেলেন। সামনের বেঞ্চ থেকে একজন চাপা গলায় তাকে কিছু বলল।
”তুমি সামনে এসে বোস।”
দীপ নেমে এল। অধ্যাপক খুঁজে খুঁজে মেয়েদের ঠিক পিছনের বেঞ্চের মাঝামাঝি এবং ওঠানামার পথের ধারে একটা জায়গা আঙুল দিয়ে দেখালেন। ওরা সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। দীপ বসল ঠিক বেহুলার পিছনে।
পরের ক্লসগুলিতে এমন ঘটনা না ঘটলেও দীপ মেয়েদের পিছনের বেঞ্চেই বসল।
কয়েকদিন পর অনার্স ক্লাস থেকে বেরিয়ে সে দেখল জ্যোতি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
”দীপ একটা কথা ছিল।”
বারান্দায় তখন গিজগিজে ভীড়। ঘর বদলে অন্য ঘরে যাওয়ার ব্যস্ততা।
”এখুনি বলবে? আমার এখন পল সায়েন্সের ক্লাস রয়েছে। তোমার কি ক্লাস শেষ হয়ে গেছে?”
”হ্যাঁ, আমি তাহলে লাইব্রেরিতে আছি। দিদির বিয়ের ডেকরিটিংয়ের ব্যাপারে…”
”ক্লাসটা করেই যাচ্ছি।”
তিনতলায় লাইব্রেরির রিডিং রুমে ভীড় নেই। কোণের দিকে টেবলে জ্যোতি একটা বই ওলটাচ্ছিল। দীপ ওর পাশের চেয়ারে বসল।
”বলো।”
”বাবাকে বললাম, আমার ক্লাসের এক বন্ধুর ডেকরেটিংয়ের ব্যবসা আছে।”
”আমার নয়, আমার বাবার।”
জ্যোতি হেসে বলল, ”ওই হল। বাবা বললেন, কীরকম খরচ টরচ পড়বে জেনে নিতে।”
”সেটা নির্ভর করছে কতটা এরিয়া কভার করবে, কী কী জিনিস লাগবে।”
”তুমি কি একবার বাবার সঙ্গে কথা বলবে, আসবে আমাদের বাড়িতে?”
”বেশ তো চলো। আমি কিন্তু এসবের কিছুই জানি না, বুঝিও না। যা কিছু সব বাবাই করেন।”
ট্রাম থেকে নেমে প্রায় দশ মিনিট হাঁটতে হল। একটা পুরনো, সরু গলির মধ্যে, কিছু ইঁট বেরিয়ে যাওয়া বাড়ি, কয়েকটি আস্তাকুঁড়, রোয়াক, একটি টিউবওয়েল পেরিয়ে জ্যোতিদের পৈতৃক বাড়ি। কেরানির চাকরি থেকে অবসর নেওয়া দীনেন মল্লিক শোবার ঘরে পালিশ ওঠা বড়ো একটা পালঙ্কে শুয়ে বই পড়ছিলেন। ওরা ঘরে ঢুকতেই উঠে বসলেন। দীপ কোথায় বসবে সেটাই সমস্যা। পালঙ্কটা ওর কাঁধ সমান উঁচু।
”ব্যস্ত হবেন না, আমি ঠিক আছি।”
নিছকই কথার কথা। জ্যোতির বাবা, মা বিব্রত হয়ে কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
”কাকার ঘরে চেয়ার আছে।”
জ্যোতি ছুটে বেরিয়ে গেল। দীনেনবাবু সাধারণ আলাপ শুরু করলেন। জ্যোতির মা রান্নাঘরে গেলেন। একটু পরেই জ্যোতি তার কাকার তিনবছর বয়সি ছেলের ক্যানভাসের চেয়ারটি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
”দ্যাখো তো এটায় বসতে পারবে কিনা।”
দীপ হেসে উঠে বলল, ”আমার ওজন এর ওপর চাপালে ভেঙে পড়ে যাবে। তাও তো আগের ওজন এখন নেই, দৌড় আর ব্যায়াম করে কমিয়েছি।”
এই বলেই সে মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসল দু হাতের উপর ভর রেখে দেহটা পিছনে হেলিয়ে।
জ্যোতির বাবা বললেন, ”ছাদেই ম্যারাপ হবে। জ্যোতি দেখিয়ে আন না।”
”পরে দেখবে, আগে চা খাক।”
”এছাড়া ভিয়েন হবে উঠোনে, সেটাও ঢাকতে হবে। টেবিল-চেয়ার, রান্নার, পরিবেশনের বাসনও লাগবে। বরের বসার জন্য গালচে, তাকিয়া, ফুলদানি, সদরের পর্দা। বরযাত্রী বসবে সামনের বাড়ির একটা ঘরে আর কিছু চেয়ার পেতে রাস্তায়। মোটামুটি এই আর কী।”
”আমি জেনে গেলাম। বাবাকে বলব, তিনি লোক পাঠিয়ে যা করার করবেন।”
”টাকা কত পড়বে সেটা জেনে নিতে পারলে ভালো হত। রিটায়ার করেছি, বড়ো ছেলে ফুড কর্পোরেশনে টাইপিস্টের চাকরিতে সবে ঢুকেছে, ছোটোটা বেকার বসে আছে। মেয়ে তো আমার দুটো, বুঝতেই পারছ তো বাবা খরচ বুঝে সুঝে করতে হবে।”
