”ঠিক জানো এদিকে দোকান নেই?”
”থাকতে পারে, আমি জানি না।
এই সময় ওপারে থামা একটা বাস থেকে চিৎকার হল: ”ছোটবাবু…অ্যাই ছোটবাবু…দাঁড়া।”
দীপ দেখল জানালায় হাত নেড়ে রবি দ্রুত সিট থেকে উঠতেই বাস তখন চলা শুরু করল।
চলন্ত বাস থেকে নেমে রবি একগাল হাসি নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে এল।
”আরে ব্যাটা, তুই এখানে!…আমি ভাবলুম ভালো নম্বর পেয়েছিস প্রেসিডেন্সি কি স্কটিশে ভর্তি হবি। বাদল বলল তুই নাকি আমেরিকা গেছিস লম্বা হবার জন্য ডাক্তার দেখাতে! খাওয়া, পাশ করার খাওয়াটা বাকি আছে।”
জ্যোতি চোখ সরু করে একবার তাদের দিকে তাকিয়েই পায়ে পায়ে সরে গেল। দীপ অপ্রতিভ হয়ে নিজেই অন্যদিকে সরে গিয়ে চাপাস্বরে বলল, ”সব জায়গায় সব সময় ইয়ার্কি মানায় না। রবি।”
রবি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দীপের দিকে এবং চারপাশে তাকিয়ে বলল, ”এখানে আবার সভ্যতা দেখাবার মতো কে…হ্যাঁরে, মেয়েটা তোর চেনা? বাস থেকে দেখলুম কথা বলছিস।”
”হ্যাঁ।”
”লাইন করেছিস?”
”ভদ্রভাবে বল…আজই আলাপ হল।”
”লাইন করিয়ে দোব, লজ্জা করিসনি…একটা জিনের প্যান্ট দিবি শুধু, বল, করিয়ে দোব?
জ্যোতির দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে দীপ মানিব্যাগ থেকে পাঁচটাকার একটা নোট বার করে রবির তালুতে গুঁজে দিল।
”এখন যা।”
”পারবি পটাতে?”
”বলছি চলে যা।”
”যাচ্ছি। মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে আসব কিন্তু।”
ট্রাম এখনও আসেনি। দীপ পায়ে পায়ে জ্যোতির কাছে এসে দাঁড়াল।
”একই স্কুলের না পাড়ার ছেলে?” জ্যোতির বলার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল সে মজা পেয়েছে।
”স্কুলের। এরা ক’জন খুব জ্বালাতন করত।”
”ওকে টাকা দিলে যেন মনে হল! তোমার কি খুব টাকা আছে? রেস্টুরেন্টে টিপসই তো দিলে দু টাকা।”
”মোটেই খুব টাকা নেই।”
”কী করেন তোমার বাবা?”
”ডেকরেটিং ব্যবসা।”
জ্যোতির সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগছে। ওর সান্নিধ্যটা কী করে বাড়ানো যায়, দীপের মাথার মধ্যে এখন সেই মতলব ঘুরতে লাগল।
”যদি কখনো দরকার হয় বোলো, ব্যবস্থা করে দেব।”
”দিদির বিয়ে সামনের মাসেই, আঠাশে শ্রাবণ।”
”কোথায় তোমাদের বাড়ি?”
যথারীতি অপেক্ষারতরা তাদের দিকে তাকাচ্ছে। দেবু এবং তার সঙ্গে পাঁচ-ছজন কথা বলতে বলতে তাদের দিকেই আসছে। ওদের মধ্যে একজন মেয়ে, বয়স একটু বেশিই, কাঁধে রঙিন ঝোলা।
ট্রাম আসছে। জ্যোতি কয়েক পা এগিয়ে গেল বাঁ হাত সামান্য তুলে।
”পরে তোমায় বলব, কেমন?”
দীপ ঘাড় নেড়ে ”আচ্ছা” বলার আগেই জ্যোতি ট্রামের হাতল ধরে উঠে গেল।
ট্রামটা চলে যাবার পর সে ফিরে তাকিয়ে দেখল দেবু আর তার সঙ্গীরা ট্রাম স্টপে দাঁড়িয়ে।
”শম্ভু মিত্তিরের মতো গলা করলেই তো আর শম্ভু মিত্তির হওয়া যায় না। পল্লবকে একদমই মানাচ্ছে না, তবু ওর অমন গলা করা চাই। এ ধরনের একটা সাবমিসিভ ক্যারেকটারের রোলে অমন গলা একদমই মানায় না। ওকে এটা বন্ধ করতে বলো আরতি নয়তো ওকে বাদ দিতে বাধ্য হব।”
দেবুর গলার স্বর রাস্তার ওপারের লোকও শুনতে পাচ্ছে। দীপ কৌতূহলে তাকিয়ে থেকে ভাবল দেবুকে জিজ্ঞাসা করবে কিনা, দাঁড় করিয়ে রেখে সেই যে উপরে গেলে, তারপর বেমালুম ভুলেই গেলে। কিন্তু সে দেবুর দিকে এগোল না। সবেমাত্র আলাপ, তাকে যে খুব মনে করে রাখতে হবে এমন কোনো কথা নেই। হয়তো এমন আড্ডায় বসে পড়েছে যেখানে একটা বামনের কোনো ভূমিকা নেই অপ্রতিভ হওয়া ছাড়া।
দীপ হাঁটতে শুরু করতে যাবে তখনই দেবু ভারী গলায় ডাকল, ”শোনো।”
সে কাছে আসতেই ওদের কথা বন্ধ হয়ে গেল।
”তুমি কোথায় চলে গেলে? আমি দেখতে পেলুম না।”
দীপ একটু অবাক হয়ে গেল। দেবু তাকে খুঁজেছে অথচ সে জানে না। অবশ্য মেয়েদের সঙ্গে টেবলে বসেছিল সিঁড়ির দিকে পিঠ ফিরিয়ে, কিন্তু তাকে দেখতে না পাওয়ার কথা নয়।
”তুমি নিচে এসে দেখেছিলে?”
”উপর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলুম সিঁড়ির গোড়ায় নেই, ওখানেই তো তখন দাঁড়িয়েছিলে।”
”বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হল, ওদের টেবলেই বসলাম।”
”ভালো।” দেবু তার সঙ্গীদের দিকে ফিরে বলল, ”বেশি দেরি তো আর নেই, এবার থেকে রোজই রিহার্সাল বসতে হবে, রঞ্জিত, অশোক, স্মৃতিকে বলে দিয়ো আর স্টেজ রিহার্সালের তারিখটা পাকা করে আসতে বলো নন্তুকে।”
”বাচ্চচাটা নেহাতই বাচ্চচা হয়ে গেছে আর একটু বড়ো হলে ভালো হত।” আরতি বলল।
”আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
দেবুকে লক্ষ্য করে একজন বলল। অন্যদের মুখে কথাটার সায় ফুটে উঠেছে। দীপ বুঝতে পারছে কোন নাটকের ব্যাপারে ওরা কথা বলছে। সে ইতস্তত করছে চলে যাবার জন্য।
”আপনি কথা বলুন, আমি যাচ্ছি।”
দেবু তার বিদায় নেওয়ার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করল না। দীপ হাঁটতে শুরু করল। বাড়ি যাওয়া ছাড়া আর কোথাও তার যাবার জায়গা নেই, প্রয়োজনও নেই। সে নিঃসঙ্গ থাকতে অভ্যস্ত। এতে তার আর কষ্ট হয় না। কলেজে প্রথম দিনেই অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়ে যাওয়ায় তার ভালোই লেগেছে। মোটামুটি সবাই পরিণত, এখানে কেউ অন্তত রবিদের মতো উত্যক্ত করবে না।
বাস বদল না করে সোজা বাড়ি যেতে হলে যে বাসটা তার দরকার সেটার জন্য মিনিট বারো হাঁটতে হবে। দীপ হাঁটতে হাঁটতে সারা দিনের কথাবার্তা, মানুষগুলোর চেহারা, ভাবভঙ্গি মনে করতে লাগল। একটা ব্যাপারে সে খুশি, তাকে সবাই গ্রহণ করেছে। আরও খুশি হচ্ছে রেস্টুরেন্টের দাম মেটাতে পেরে। ক্লাস ভালো করে শুরু হোক, অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপের গণ্ডিটা বাড়লে সে বন্ধুত্ব কিনবে রেস্টুরেন্টে খাইয়ে। সে জানে দুপুরে বা বিকেলে কী ভীষণ খিদে পায়।
