বছর ত্রিশ-বত্রিশ বয়স। রঙিন টি-শার্ট, একহারা শরীরে এঁটে রয়েছে। চুল ঘন এবং কোঁকড়া, রঙ শ্যামলা। মুখের গড়ন লম্বাটে, বাঁ গালে গভীর একটা প্রায় দু ইঞ্চি কাটা দাগ। গলায় সোনার সরু চেন। হাতে চশমাটা আর চাবির রিং, আঙুলে বড়ো পাথর বসানো দুটো আংটি।
”কখন থেকে রাস্তার দিকে হাপিত্যেশ নয়নে বসে আছে বেচারা!” হৈমন্তী নাটুকে স্বরে যুবকটিকে বলল।
”হা-পিত্যেশ না আরও কিছু। আর পাঁচ মিনিট দেখতাম তারপর সোজা বাড়ি চলে যেতাম।” বেহুলার ঠোঁট অভিমানিনীর মতো ফুলে উঠল।
”সত্যিই দেরি হয়ে গেল। একটা পার্টির সঙ্গে দেখা করার জরুরি দরকার ছিল। হঠাৎ সকালে ফোন করে বলল, দুপুরের ফ্লাইটে বম্বে যাচ্ছি এয়ারপোর্টে দেখা করো।”
”দেখা করে কাজ হল?” তাপসীর ভঙ্গিতে উদ্বেগের আধিক্য ঘটল।
”তা কিছুটা হল।”
”তাহলে দেরি হওয়ার জন্য বেহুলার রাগ করার কোনো কারণ নেই।”
”রাগ করতে বয়ে গেছে আমার।”
দীপ সকলের মুখের দিকে পরপর তাকিয়ে যাচ্ছে। তার পাশে জ্যোতিও স্মিতমুখে চুপ করে আছে। জ্যোতি যে ওদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ নয় এটা সে বুঝে গেছে।
যুবকটি কয়েকবার সকৌতুকে দীপের দিকে তাকিয়েছিল। সেটা লক্ষ্য করে লীলা বলল, ”আমাদের নতুন বন্ধু দীপাঞ্জন রায়, সদ্য আলাপ, বাংলা অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে।”
দীপ নমস্কার জানাতেই যুবকটি জমকালোভাবে প্রতি নমস্কার করল কোমর থেকে কিছুটা ঝুঁকে।
”খুশি হলাম।”
”কী করে হলেন! আমি চার-এক আপনাকে, কতটা ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে জানেন?”
”একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়ুন।” জ্যোতি বলল। অন্যরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
”না, আর বসব না।” বেহুলা উঠে দাঁড়াল।
”যাবি তো চল তোরা।” জ্যোতি বাদে অন্যরাও উঠে দাঁড়াল।
”নীরেনদা আজ ব্যান্ডেল চার্চ দেখাতে নিয়ে যাবে কথা ছিল।” তাপসী বলল জ্যোতি এবং দীপকে লক্ষ্য করে।
”পরে একদিন ভালো করে আলাপ করা যাবে।” নীরেনদা নামক যুবকটি নমস্কার করল।
”চলি রে জ্যোতি…চলি দীপ।”
ওরা বেরিয়ে যাবার পর রেস্টুরেন্টের ছেলেটি মৌরি ছড়ানো প্লেট টেবলে রেখে দাঁড়াল। ”আগের পাঁচ কাপের দাম কে দেবেন?”
”আমি।” জ্যোতি তার হাতব্যাগ খুলতে যাচ্ছিল, দীপ হাত তুলে নিষেধ করল।
”না না, তুমি কেন দেবে। কত হয়েছে?”
”আড়াই টাকা।”
”আর আমার কত?” দীপ জানতে চাইল।
”বারো টাকা।”
দীপ লক্ষ্য করল জ্যোতির ব্যাগে নানান টুকরো কাগজ তার মধ্য থেকে খুঁটে খুঁটে সে রেজগি বার করছে। সে মানিব্যাগ থেকে দুটো দশ টাকার নোট নিয়ে প্লেটে রাখল। ইশারায় ছেলেটিকে জানাল দুজনেরই দাম ওই থেকে নিতে। ছেলেটি নির্বিকারভাবে কাউন্টারে চলে গেল। মেয়েদের বিল ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও ছেলেরাই যে মেটায়, এটা সর্বদাই সে দেখেছে।
জ্যোতি এবার কী কী বলবে দীপ সেটা অনুমান করতে পারছে।
কিন্তু ব্যাগ বন্ধ করে জ্যোতি সামনে তাকিয়ে রইল। কথা বলল না। মৌরির প্লেটে নোট ও খুচরো ফিরে আসতেই দীপ দু’টাকার নোটটি রেখে বাকি সব তুলে নিল। ছেলেটি এমন বহরের বকশিশে অভ্যস্ত নয়, অবাক হয়ে সে নোটটার দিকে তাকাল। দীপ আঙুল নেড়ে তুলে নেবার ইঙ্গিত জানাতেই একটা বড়ো দরের সেলাম পেল।
”চলো এবার, তুমি কোথায় যাবে?” দীপ চেয়ারের কিনারে এসে প্রথমে বাঁ পা মেঝেয় ঠেকিয়ে তারপর ডান পা রাখার সময় শক্ত করে টেবলটা ধরল।
”বাড়ি যাব। তুমি?”
”আমিও।”
বেরোবার সময় দেড়তলা থেকে দেবুর গমগমে গলার স্বর শুনতে পেয়ে দীপ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েও ফিরে এল। রাস্তায় নেমে জ্যোতি জিজ্ঞাসা করল, ”উপরে চেনা কেউ আড্ডা দিচ্ছে নাকি?”
”হ্যাঁ, চা খাব বলে একসঙ্গে এলাম। আমাকে দাঁড় করিয়ে উপরে গিয়ে আমার কথা বেমালুম ভুলে গেল, অদ্ভুত না?”
”অদ্ভুত কেন! এই তো চা খেয়ে দিব্যি পয়সা দিতে ভুলে গিয়ে চারজন কেমন চলে গেল মোটরে করে বেড়াতে।”
জ্যোতির গলায় বিরক্তি ক্ষোভ। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে দীপ জিজ্ঞাসা করল, ”লোকটা কে? কী করে?”
”কে জানে কী করে। শুনেছি দুটো বাস আছে, একটা ওষুধের দোকান আছে আর রাস্তা, ড্রেন, বাড়িটাড়ি তৈরি করার কন্ট্রাক্টরি করে।”
”পয়সা আছে।”
”তা আছে, খরচও করে। ক’দিন আগে পার্ক স্ট্রিটে সবাইকে নিয়ে গিয়ে চাইনিজ খাইয়েছে।”
”তুমিও গেছলে?”
জ্যোতির ঠোঁট মুচড়ে গেল তাচ্ছিল্যে। আঙুল দিয়ে নেমে আসা চশমাটা ঠেলে তুলে দিল।
”নাহহা। অল্প আলাপ…হইচই ভালোবাসে, কালচার প্রায় নেই-ই।”
দীপ এবার খানিকটা বুঝতে পারছে জ্যোতিকে। ওর জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হল, রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য কোনো গান শোনো কিনা, বইমেলায় গিয়ে লেখকদের সই নাও কিনা বা সত্যজিৎ কি মৃণালের ফিল্ম প্রথম সপ্তাহেই দেখে ফেল কিনা।
”আমি কখনো চাইনিজ খাইনি, খেতে খুব ইচ্ছে করছে।” ইচ্ছে করেই সে মিথ্যে কথা বলল জ্যোতির প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য।
”তোমাকে তাহলে চৌরঙ্গি পাড়ায় যেতে হবে, এদিকে কোনো দোকান নেই।”
ওরা ট্রাম স্টপে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। স্টপেজে অপেক্ষমাণরা দীপের দিকে তাকিয়েই অবাক হয়ে জ্যোতিকে লক্ষ্য করতে লাগল। তাদের দৃষ্টি যেন ওকে বলছে, তুমি কি করে এই বামনটার সঙ্গিনী হলে? সে ট্রামের খোঁজে দূরে তাকিয়ে রইল, কথা বলায় আর কোনো উৎসাহ দেখল না।
