”হাঁ, যা বলছিলে, মেয়েরা বয়স কমিয়ে বলে এটা মোটেই বিশ্বাস করি না, একদমই বাজে কথা। পাজি পুরুষদের ছড়ানো গুজব, রটনা। আমার এক মাসিকে জানি। বিয়ের সম্বন্ধ এল, পাত্রপক্ষ চায় তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে বয়সের মেয়ে, কেননা দোজবরে পাত্রের বয়স পঞ্চাশের বেশি। বড়োলোক। কলকাতায় সাত-আটটা বাড়ি, মোটরগাড়ি, জহরতের বড়ো ব্যবসা। কিন্তু মাসির বয়স পঁচিশ। ছ’বছর বাড়িয়ে একত্রিশ বছর বলে বিয়ে দেয়া হল এবং মাসির তাতে একশো একভাগ সায় ছিল।”
”তুমি কি বলতে চাও বাড়ি গাড়ি টাকার লোভে মেয়েরা বয়সের কারচুপি করতে পারে?” জ্যোতি বলল, তীব্রস্বরে, তর্কে নামার ইচ্ছা নিয়ে। দীপের ভালো লাগল জ্যোতির এই ভঙ্গিটা।
”আমি কি তাই বলেছি?…ভালো কথা চা বলি?” প্রসঙ্গটা এড়াবার জন্যই যেন সে চায়ের কথা বলল।
”এই তো খেলাম।” টেবলের ওদিকে মাঝে বসা লাল টিপ পরা, অত্যন্ত ফর্সা, লম্বা নাক, চিবুকহীন মেয়েটি বলল।
”চা একবার কেন বারবার খাওয়া যায়।” দীপ হাত নেড়ে রেস্টুরেন্টের ছেলেটিকে ডাকল। কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করল, ”কী খাবার পাওয়া যাবে?”
”ফিশ ফ্রাই, ভেজিটেবল চপ, মটন চপ, মামলেট, টোস্ট…”
”ফাউল কাটলেট আছে।”
”বিকেলে পাবেন।”
”আমি কিন্তু কিছু খাব না।”
”কেন খাবে না, তুমি তো নিজের নাম এখনও বলোনি।”
”লীনা মজুমদার। দুই দাদা, বাবা নেই, তিন দিদির বিয়ে হয়ে গেছে আর বয়স বলাতো বারণ। হাইট পাঁচ-এক, ওয়েট তেতাল্লিশ কেজি।”
”তেতাল্লিশ! তাহলে তো তোমার এখুনি একটা মটন চপ খাওয়া উচিত ওয়েট বাড়াতে।”
”এই কিছুক্ষণ আগে ভাত খেয়েছি।”
”সেইজন্যই তো দুটোর বদলে একটা বললাম।…তাহলে ছ’টা চপ ছ’টা চা।”
ছেলেটি চলে যেতেই দীপ বাকি দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ”তোমরা এখনও নাম বলোনি যখন, আমাকে নিশ্চয় তাহলে পছন্দ হয়নি।”
ওরা প্রায় একসঙ্গে প্রতিবাদ করে নিজেদের নাম বলল: বেহুলা ঘোষ আর হৈমন্তী পাইন।
বেহুলা কিঞ্চিৎ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, ”মা আর আমি আলাদা থাকি…চেহারা দেখে বুঝে নাও বয়স, ওয়েট, হাইট। মা একটা ফার্মে রিসেপসনিস্ট।”
সকলের মধ্যে বেহুলা একটু আলাদা, তার সাজগোজে। দীর্ঘ চোখদুটি চঞ্চল, ব্লাউজটা তার স্বভাবের বেপরোয়া দিকটা উদঘাটন করছে, দেহের ডৌলে ও গঠনে স্বাস্থ্য ভরে আছে কিন্তু লাবণ্য কম। জুতো, ঘড়ি বা হাতব্যাগটি দেখেই বোঝা যায় ভালো জায়গা থেকে কেনা। সবার মধ্যে একমাত্র তারই ঠোঁটদুটি রঙিন এবং চুল ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা। নিজের সম্পর্কে সে যে অতি সচেতন সেটা বুঝতে দীপের অসুবিধা হল না।
হৈমন্তী বলল, ”কলকাতায় মাসির বাড়িতে থাকি, দেশ সুন্দরবনে। হাসনাবাদ থেকে এগারো মাইল ভিতরে, বাড়িতে ভাইবোন সব মিলিয়ে তেরোজন।”
”তাহলে তো সুন্দর…বোন তুমি।”
হৈমন্তী হাসিতেই ধরা পড়ল সে অর্থ বোঝেনি। বুঝিয়ে দিল জ্যোতি: ”বোন মানে সিস্টার, সুন্দর মানে সুন্দর।”
বেহুলা হাতঘড়িতে সময় দেখল। তাপসী চোখ টিপে বলল, ”কিরে, সময় হয়ে গেছে?”
বেহুলা মৃদু হেসে ভ্রু কোঁচকাল।
”কীসের সময়? দীপ কৌতূহল জানাল।
”ওর বয়ফ্রেন্ডের আসার।” তাপসী হাসছে।
”তোমরা কি সব একই স্কুলের?”
”চারজন। বেহুলা, আমি…মানে জ্যোতি বাদে সবাই। জ্যোতি হল লীনার বন্ধুর বন্ধু, পরীক্ষা দেবার সময় আলাপ। একই ঘরে আমাদের সিট পড়েছিল।”
”আমার কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। ” কথাটা বলেই মণিকে তার মনে পড়ল। জুট মিলের কোয়ার্টারে এখন সে একা বসে কী করছে! সেখানে কোনো বারান্দা আছে কিনা কে জানে।
একবার সে খুঁজতে গেছল। ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় সে জুট মিলের ফটক পর্যন্ত আসে। ফটকের লোহার চাদরের মধ্যে একটা কাটা জায়গা, একজনমাত্র গলতে পারে। সেখানে খাকি পোশাকের বয়স্ক এক দারোয়ান তাকে আটকায়।
”কোয়ার্টারে যাব।”
দারোয়ান বিরক্ত হয়ে জানতে চায়, ”কোয়ার্টারে কার কাছে?”
”রেবা দত্ত। এখানে অফিসে কাজ করেন।”
”কী কাজ করেন?”
দীপ বলতে পারেনি। সেই সময় একটি লোক ভিতর থেকে বাইরে যাবার জন্য বেরিয়ে আসতেই দারোয়ান তাকে জিজ্ঞাসা করল, ”ব্যানার্জিবাবু, রেবা দত্ত বলে কই আপনার অফিসে কাজ করে?”
ব্যানার্জিবাবু নামক লোকটি দীপের আপাদমস্তক দেখতে দেখতে বলল, ”করে। কিন্তু তিনি তো দু’হপ্তার ছুটি নিয়ে তার বাপের বাড়ি গেছেন, বোধহয় মায়ের অসুখ।”
”কেউ নেই তার কোয়ার্টারে?”
”মিসেস দত্ত আর তার খোঁড়া মেয়ে ছাড়া আর কেউ থাকে বলে তো জানি না।”
”কোয়ার্টারটা কোন দিকে?”
”তুমি কে হও?”
দীপ ইতস্তত না করে বলল, ”উনি আমার মাসি হন।”
”এই গেটে নয়, এই লম্বা পাঁচিল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে আরেকটা গেট আছে। ভেতরে ঢুকলেই পরপর দুটো টানা দোতলা বাড়ি বাঁদিকে পড়বে। প্রথমটার শেষদিকে একতলায়।”
ট্রেনে ফিরে আসার সময় তার মনে হল, ব্যানার্জিবাবুর কাছ থেকে যদি ঠিকানাটা চেয়ে নিত তাহলে সে চিঠি লিখতে পারত।
ওদের খাওয়া তখন প্রায় শেষ, তাপসী কনুইয়ের খোঁচা দিল বেহুলাকে। ফিসফিসিয়ে ওর কানে বলল, ”এসেছে।”
মেয়েরা রাস্তার দিকে তাকাল। চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দীপ পিছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখল রাস্তার ওপারে একটা সাদা অ্যাম্বাসাডার। তার সামনে দাঁড়িয়ে কালো কাচের চশমাপরা একটা লোক রাস্তা পার হবার জন্য দু’ধারে তাকাচ্ছে। সে বুঝে গেল এই হচ্ছে বেহুলার বয়ফ্রেন্ড।
