বারান্দায় নোটিশ বোর্ডে টাঙান রুটিনে দেওয়া ছিল কোন ক্লাস কত নম্বর ঘরে, কটার সময়। ভিড় আর ঠেলাঠেলিতে দীপ বোর্ডের কাছাকাছি যেতে পারছিল না। ভিড়ের মধ্যে একবার ঢোকার চেষ্টা করে কপালে কনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে এসে লম্বা বারান্দার একধারে সে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় ভিড় থেকে খাতা হাতে বেরিয়ে এল একটি ছেলে। লম্বা, ছিপছিপে, চৌকো মুখ। পরনে ঢিলে পাজামা আর খয়েরি পাঞ্জাবি। বয়স সম্ভবত পঁচিশের কাছে; বি.এ. পড়তে আসার পক্ষে বেশিই।
সে একটু অবাক হয়েই দীপের দিকে তাকিয়েছিল। দীপ হেসে বলল, ”ওখানে ঢোকা আমার পক্ষে অসম্ভব, বোর্ডটাও আমার পক্ষে যথেষ্ট উঁচু।”
”ফার্স্ট ইয়ার?”
গমগমে গভীর গম্ভীর গলা। বারান্দার এপ্রান্ত থেকে একটু গলা চড়ালে ও প্রান্তের লোক শুনতে পাবে।
দীপ মাথা সামনে নেড়ে বলল, ”বাংলা অনার্স।”
”তাহলে ‘এ’ সেকশান, আমারও তাই। আমার থেকে টুকে নাও।”
বারান্দার পাঁচিলটা দীপের পক্ষে উঁচু। খাতাটা কোথায় রেখে টুকবে তাই খুঁজতে এধার ওধার তাকাচ্ছিল।
”তুমি আমার খাতা দেখে বলো, আমি তোমার খাতায় লিখে দিচ্ছি।”
দীপ খাতার মলাটে নামটা পড়ে নিয়েছিল: দেবব্রত ঘোষ। তার মনে হয়েছিল দেবু ওর ডাকনাম, নিশ্চয় একটা ভালো নাম আছে। হয়তো ডাকনামেই পরিচিত হতে চায়।
খাতায় লিখতে লিখতে দেবু মৃদুস্বরে একবার জিজ্ঞাসা করেছিল, ”কত নম্বর পেয়েছ?”
”পরীক্ষায়? ছ’শ একানব্বই।”
দেবু মাথা ঘুরিয়ে ওকে একবার দেখে মন্তব্য করে, ”ভালো ছেলে।”
সেই সময় দুটি মেয়ে যেতে যেতে দেবুকে দেখে থমকে দাঁড়ায়।
”দেবু, রুটিন নাকি রে?”
”বোর্ড থেকে টুকে নে।”
”কী করে টুকব, অবস্থাটা একবার তাকিয়ে দেখ।”
”হুঁ…বলো, শুক্রবার এগোরাটা পঁয়তাল্লিশ স্পেশাল বেঙ্গলি, টি.কে.এস, তারপর?”
মেয়ে দুটি, দীপ যা ভেবেছিল, তার দিকে তাকিয়ে এবং নিজেদের মধ্যে চাওয়া-চাওয়ি করে মুখ টিপে হাসল।
রুটিন লেখা শেষ হবার পর দীপই বলল, ”চলো, চা খেয়ে আসি।”
”চা? বেশ। ক্যান্টিনে ভিড়, চলো বাইরে যাই।”
কলেজের কাছেই পাশাপাশি দুটো রেস্তোরাঁ। যথেষ্ট ভিড়। সব টেবলই ভরে আছে। মৌমাছি গুঞ্জনের মতো অবিরাম কথা বলার শব্দ। মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠা বা হাসি। পাখা ঘুরছে তবু অনেকে ঘামছে। কাঠের সিলিংয়ের জন্য ঘরটা নিচু। দেড়তলায়ও বসার ব্যবস্থা আছে। কাঠের সিঁড়ি ক্যাশ কাউন্টারের পাশ দিয়ে উপরে উঠে গেছে। দেবু সিঁড়ির অর্ধেকটা উঠে একবার তাকিয়েই নেমে আসছিল, তখন উপর থেকে মেয়ে গলায় কেউ ডেকে উঠল, ”অ্যাই দেবু, অ্যাই দেবু।”
চোখে বিস্ময় নিয়ে দেবু উঠে গেল। দীপ নিচে অপেক্ষা করতে লাগল।
যে মেয়েদুটি দেবুর কাছে রুটিন চেয়েছিল তারা এই সময় রেস্টুরেন্টে ঢুকল। ওকে দেখে তারা হাসি চেপে যে-টেবলে চারটি মেয়ে বসে সেইদিকে এগিয়ে গেল।
এসব তার গা-সহা হয়ে গেছে। সে বাইরের দিকে তাকিয়ে রাস্তার ওপারের দোকানগুলোর সাইনবোর্ড পড়তে লাগল। হঠাৎ তার কানে এল, ”ডাক না, ডাক না।”
পিছনের ওই মেয়েগুলিরই কেউ বলছে। সে কান খাড়া করল।
”আমি পারব না, তুই ডাক।”
”বসবে কোথায়, চেয়ার কই?”
”জোড়া দিয়ে বসব।”
”আমার পাশে বসালে আমি কিন্তু হাসি চাপতে পারব না।”
দীপের মুখে পাতলা হাসি ফুটল। ভাবল, নিজে থেকেই ওদের কাছে গিয়ে আলাপ করলে কেমন হয়! তারপর মনে হল, দরকার নেই।
”আপনি যদি বসতে চান আমাদের সঙ্গে বসতে পারেন।”
কোনো ব্যস্ততা নেই এমনভাবে ঘুরে দীপ মেয়েটির দিকে তাকাল, হাসল। মেয়েটির মুখটি মিষ্টি, মাজা গায়ের রঙ, কথা বলার সময় গালে টোল পড়ে, চোখে কালো হালকা ফ্রেমের চশমা, সাধারণ স্বাস্থ্য। হলুদ তাঁতের শাড়িটিতে প্রায় আধ হাত সবুজ ও কালো পাড়।
”অসুবিধা হবে নাতো?”
”না না কিচ্ছু হবে না। আমাদের একজন এইমাত্র চলে গেল, ম্যানেজ করে ঠিক বসা যাবে।..আপনার কি আজই কলেজে প্রথম?”
”হ্যাঁ।”
”আমরাও।”
একদিকে তিনটি চেয়ার জুড়ে নিয়ে চারজন, টেবলের অন্যদিকে দুটি চেয়ারে দীপ ও সেই মেয়েটি যে তাকে ডেকে আনল।
”আমার নাম দীপাঞ্জন রায় সবাই ডাকে দীপ বলে।” সবার মুখের ভাব লক্ষ্য করে সে জুড়ে দিল, ”হাইট চার ফুট এক ইঞ্চি, ওয়েট…ঠিক বলতে পারব না, এজ প্রায় কুড়ি, দেরিতে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য বয়সটা বেশিই, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।”
দীপ মিটমিটিয়ে হাসতে লাগল। সে বুঝতে পেরেছে তাকে নিয়ে মজা করার জন্যই এই আমন্ত্রণ। তাই প্রথমেই জানিয়ে দিল সেও মজা চায়। অপরিচয়ের অস্বস্তিটা মেয়েদের মধ্যে থেকে সরে গেল ওর বলার ভঙ্গিতে।
”আমি জ্যোতি…জ্যোতির্ময়ী মল্লিক, দুই বোন, দুই ভাই। হাইট ওয়েট জানি না, বয়স উনিশ।”
দীপের পাশের মেয়েটি কথাগুলো বলল অতি দ্রুত হালকা স্বরে। এরপর সামনের মেয়েরা চটপট বলে গেল।
”তাপসী দে, পাঁচ বোন, বয়স…”
”উঁহুহু…মেয়েদের বয়স বলতে নেই, বললেও কর্ণপাত করতে নেই।” দু-হাত তুলে দীপ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল।
”কেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন মেয়েরা বয়স কমিয়ে বলে?”
”আপনি নয় তুমি, আমরাতো একই ইয়ারের সুতরাং আজ থেকে সবাই বন্ধু কেমন?”
সবাই ঘাড় নাড়ল ইতস্তত করে। এমন এক অস্বাভাবিক আকৃতির সঙ্গে চট করে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব পাতাতে ওরা আড়ষ্ট বোধ করছে।
