”না।”
মণির স্বরে এমন একটা দৃঢ়তা রয়েছে যা দীপকে কুঁকড়ে দিল। একা একটা মেয়ে সারা দুপুর একটা ছেলের সঙ্গে বাড়িতে থাকতে আপত্তি করতেই পারে। হঠাৎ তার মনে হল সে বড়ো হয়ে গেছে, পুরো একটা পুরুষ মানুষ। বামনদেহটা খোলসের মতো খসে পড়েছে তার পায়ের কাছে। মণি তাকে লম্বা করে দিল শুধু একটি শব্দে। দেহের সীমা ছাড়িয়ে সে এখন একটা এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে সেখানে উচ্চচতায় সে আর সকলের মতোই।
”আমি স্কুলে যাচ্ছি এখন, ফেরার সময় বুঝিয়ে দেব।”
দীপ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে ঘুরে পিছনে না তাকিয়ে হেঁটে চলে গেল। বাসে যাবার সময় তার মনে হল, মণি কি তাকে নোংরা চরিত্রের ভেবেছে নয়তো ‘না’ বলল কেন? আবার সে ভাবল, মণির কি তাকে ভালো লেগেছে? কিন্তু ওর ব্যবহার আজও তো প্রথম দিনের মতোই! ‘না’ বলার সময় ওর মুখটা কী কঠিন হয়ে গেছল? মণি কি খুশি হবে স্কুল থেকে ফেরার সময় ওর কাছে গেলে? যদি না যাই? মণি কি জানে ওকে আমার খুব ভালো লাগে, ওর সঙ্গে কথা বলতে, ওর সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে? যদি জানে তাহলে কি অন্যরকম ভাববে?
দীপ আপনমনেই বারকয়েক উচ্চচারণ করল র-ত-ন-ম-ণি।
ফেরার সময় দীপ বাস থেকে নেমে দেখল মা দাঁড়িয়ে। উৎপলা হাত বাড়াল সুটকেসটা নিতে দীপ দিল না। কিছুটা এগোতেই দেখল রাস্তায় একটা জটলা। সবার মুখই উত্তেজিত। কৌতূহলে সে একজনের কাছে ব্যাপারটা জানতে চাইল।
”দুপুরে কুকুরে কামড়েছিল ওই ওদিকের পাড়ার একজনকে। তারপর দলবল এসে পাইপগান দিয়ে গুলি করে কুকুরটাকে মেরে ধাঙড়দের শাসিয়ে গেছে।”
”কোন কুকুরটা, খুব বড়ো কালো রঙের, চোখের ওপরটা বাদামি?”
”কে জানে কী রঙের?”
লোকটা কথা বলায় আর ঔৎসুক্য দেখাল না। একটি বাচ্চচাছেলে, যাকে সে অনেকবার দেখেছে যাতায়াতের পথে, দীপ তাকেই জিজ্ঞেস করল, ”কোন কুকুরটা?”
”সেই কাল্লু, যেটা সবাইকে তাড়া করত।”
দীপ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ”যাক আর তোমায় বাস স্টপে আসতে হবে না।” এবং কিছু পরে হাঁটতে হাঁটতে আপনমনে বলল, ”জীবনজন্তুকে মারতে নেই।”
মণিদের বাড়ির কাছ দিয়ে যাবার সময় ওর কানে এল গলা সাধার শব্দ। বোধহয় আজ মাস্টারমশায় এসেছে। দীপ ঠিক করল কয়েক দিন সে মণির সঙ্গে দেখা করবে না।
স্কুলের স্পোর্টসে দীপ অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারণা করল। শেষ অনুষ্ঠান ‘যে যেমন সাজো’। বেদে, ঝাড়ুদার, পাগল, মুটে, মুড়িওয়ালা, বৈষ্ণব, ভিখারি ইত্যাদি সাজা ছাড়াও একজন অজ্ঞান হয়ে পড়তেই ছুটে এল এক ডাক্তারবাবু। চার চাকার এক ঠেলা ধীরে ধীরে আনা হল তার উপর নিথর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর বিখ্যাত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা আকাশমুখী তোলা।
একটা মেলার মতো ব্যাপার। বেদে তার ঝাঁকা থেকে হাঁড়িকুড়ি বার করে কাঠ জ্বেলে রান্না চড়াল। সঙ্গে দড়িতে বাঁধা একটা কুকুর আর ছাগল। বৈষ্ণব করতাল বাজিয়ে গান গেয়ে ঘুরছে। মুড়িওয়ালা ঠোঙায় ঝালমুড়ি নিয়ে শিক্ষকদের কাছে বিক্রি করছে। মুটে ঝাঁকাহাতে ঠিকানা লেখা কাগজ নিয়ে জনে জনে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে। পাগলের পাগলামি, ভিখারির ভিক্ষা চাওয়া ইত্যাদিতে গণ্যমান্যদের বসার সামিয়ানার সামনেটা যখন সরগরম তখন হঠাৎ ভিড়ের পিছন থেকে আর্তনাদের মতো চিৎকার শোনা গেল, ‘ওমা, কোথায় তুমি…ওমা কোথায় তুমি!’
হঠাৎ কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল। উৎসুক হয়ে সবাই খুঁজতে লাগল এমন আর্তস্বরের মালিককে।
‘ওই তো, ওই তো।’ কে একজন আঙুল দিয়ে দেখাল। দর্শকদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে একটি ছোটোছেলে বেরিয়ে আসছে। তার পরনে বাচ্চচাদের নেকার-বোকার। একটা ডলপুতুল বুকের কাছে আঁকড়ে ধরা, চোখে কাজল, কপালে কাজলের টিপ, সিঁথি কাটা চুল পাট করে আঁচড়ানো, হাতে লোহার বালা, লাল মোজা, লাল জুতো।
”ওমা কোথায় গেলে?” কান্নাজড়ানো গলায় ছোটো ছেলেটি ডুকরে উঠল। সে হারিয়ে গেছে। জনে জনে সে জিজ্ঞাসা করছে, ”আমার মাকে দেখছ? আমাকে পুতুল কিনে দিয়ে, দাঁড়াতে বলে কোথায় যে চলে গেল।”
হাসি চেপে সবাই মাথা নাড়ছে। ছেলেটি হেডমাস্টারমশায়কে, অনুষ্ঠানের সভাপতিকেও প্রশ্ন করল। ওরা মাথা নেড়ে নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করলেন।
অবশেষে বালকটি তার পুতুলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মাটিতে বসে দুই ঊরুর মধ্যে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল।
হাততালি আর সহর্ষ চিৎকারে জায়গাটা ফেটে পড়ল। পাথর হয়ে থাকা শ্রীরামকৃষ্ণ পর্যন্ত সন্তর্পণে একবার মুখ ঘুরিয়ে বিমর্ষ দৃষ্টিতে ব্যাপারটা দেখে নিল। হারিয়ে-যাওয়া বালককে সান্ত্বনা দিতে মুড়িওয়ালা এক-ঠোঙা মুড়ি উপহার দিল। হঠাৎ কয়েকটি ছেলে রবির নেতৃত্বে ছুটে গিয়ে বালককে কাঁধে তুলে নিল।
”ছোটবাবু…ছোটবাবু।”
দীপের দুটি চোখ উত্তেজনায় ও আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। এখন সে সবার মাথা ছাড়িয়ে, সবার থেকে লম্বা।
”খাওয়াবি তো আজ?”
”খাওয়াব।”
বাড়ি ফেরার সময় দীপ ইতস্তত করে পায়ে পায়ে মণিদের বারান্দার কাছে গেল। কাউকে দেখতে পেল না। রঙিন কাগজে-মোড়া লাল ফিতেয় বাঁধা প্রথম পুরস্কারের স্টিলের বড়ো রেকাবিটা গরাদের ফাঁক দিয়ে সে মেঝেয় নামিয়ে দিল। সামান্য একটু শব্দ হয়েছিল। ঘরের ভিতর থেকে মণির গলা শোনা গেল, ”কে”?
দীপ ছুটে পালিয়ে গেল। সে জানত না মণির মা হঠাৎ-ই শ্যামনগরে কোয়ার্টার পেয়ে তিনদিনের মধ্যেই মণিকে নিয়ে চলে যাবে।
দুই
দীপাঞ্জন রায় যখন বি.এ. পড়তে কলেজে এল প্রথম দিনেই আলাপ হল দেবুর সঙ্গে।
