দুজনের কেউই কথা বলতে পারল না বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে না ওঠা পর্যন্ত।
”তুমিও ভোরে বেরোও? মণির মুখ ঝলমল করে উঠল।
”আজই প্রথম। কিন্তু তুমিতো বলোনি?”
”এই ভোরে বেড়ানোর কথা? বলব কী করে, তুমিতো আর আসোইনি।”
”যাব কী করে সময় কোথায়?”
”খুব কাজের লোক।”
মণির বলার ভঙ্গিটা দীপের ভালো লাগল। ঈষৎ অভিমান চেপে রাখতে পারেনি। ওরা দুজন বাড়ির দিকে চলতে লাগল।
”আমার রোজ একটু নড়াচড়া দরকার, সারাদিনই তো বাড়িতে বন্দি। মা এখন ঘরে রয়েছে তাই বেরিয়েছি। ডাক্তারও বলেছেন।
”আমারও রোজ দৌড়নো দরকার। যা মোটকা আমি, এজন্য আরও বেঁটে দেখায়। বড্ড চর্বি, এবার থেকে ব্যায়ামও করব।”
তার জন্য দীপকে মন্থরগতিতে হাঁটতে হচ্ছে লক্ষ্য করে মণি চলার গতি বাড়াতেই দীপ হাত দিয়ে ওর ক্রাচ চেপে ধরল।
”তাড়া নেই। জোরে চললে তোমার বগলে লাগবে।”
”একটুও লাগবে না। আমার অভ্যেস হয়ে গেছে, দেখবে?”
মণি জোরে চলার জন্য ক্রাচ দুটো লম্বা পা ফেলার মতো দূরে ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেল। দীপ অবাকচোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দৌড়ে ওর পাশে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে লাগল। এরপর ইচ্ছে করেই সে মণিকে ছাড়িয়ে গজ দশেক এগিয়ে গেল।
উপরের ঠোঁট দাঁত চেপে ধরা, চোখে তীব্রতা, ক্রাচদুটো বড়ো করে সামনে বাড়িয়ে শরীরটা দোলাতে দোলাতে মণি তাকে ধরার জন্য এগিয়ে আসছে। দীপ আবার কিছুটা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছনে তাকাল।
মণির চোখে জেদ। সে আরও বেশি দূরত্বে ক্রাচ বাড়িয়ে দ্রুত আসার চেষ্টা করতেই ডান ক্রাচটা হড়কে গেল একটা আলগা ইঁটের উপর পড়ে। মুখ থুবড়ে মণি পড়ে যেতেই, চাপা একটা চিৎকার করে দীপ ছুটে এল।
উবুড় হয়ে ডান হাতটা সামনে ছড়ানো, বাঁ হাতের ক্রাচটা শক্ত মুঠিতে ধরা। মুখ রাস্তায় ঘষড়ে গেছে। দীপ ওর বগলের নিচে দু হাত রেখে টেনে তুলে বসাল। দৌড়ে গিয়ে ক্রাচটা কুড়িয়ে আনল।
মণির নাক কপাল আর কানের পাশে ছড়ে গেছে। কিন্তু ও হাসছে অপ্রতিভের মতো। দুজন স্ত্রীলোক, সম্ভবত মজুর, ওদের পিছনেই আসছিল। তারা দাঁড়িয়ে পড়তেই মণি তাড়াতাড়ি বলল, ”আমার কিছু হয়নি।”
সে ক্রাচ ধরে উঠে দাঁড়াল। স্ত্রীলোক দুজনের একজন চলে যেতে যেতে মন্তব্য করল: ”রাস্তার যা মরণদশা।”
”রুমাল আছে? তোমার মুখে ধুলো লেগে রয়েছে।”
মাথা নেড়ে মণি মুখটা তার কাঁধে ঘষতে লাগল।
”উহুঁ দাঁড়াও, মুখটা নামাও তো।”
মণি গলা নিচু করে মুখ ঝুঁকিয়ে দিল। তার হাঁটুঝুল কামিজটা তুলে সন্তর্পণে ধুলো মুছিয়ে দিতে দিতে দীপ চোখবন্ধ করা মুখের প্রতিটি অংশ অবাক হয়ে দেখল। মা ছাড়া আর কোনো মেয়েকে সে আগে কখনো এত কাছের থেকে দেখেনি। মণির ত্বক, রোমকূপ, চোখের পাতা, ঠোঁটের চামড়ার কুঞ্চন, নাকের নিচে ঈষৎ ঘন রোম এবং চিবুকের তলায় ছোট্ট তিল দীপকে নতুন ধরনের অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করল। নিজের অজান্তেই সে মণির বুকের দিকে তাকাল এবং আড়ষ্ট হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
”হয়েছে? কিছু বোঝা যাবে নাতো?”
”মা কিছু বলবে?”
”যদি আর না বেরোতে দেয়!”
”মাকে ভয় কর?”
”কেন তুমি কর না?”
”না। তোমার পায়েটায়ে লাগেনি তো?”
মণি তার পঙ্গু পায়ের দিকে একবার তাকাল।
”হাঁটুর কাছটায়…ও কিছু না, চলো, মাকে সাতটায় বেরোতে হয়।”
আবার ওরা চলতে শুরু করল। রোদ লেগেছে গাছের মাথায়। ওদের ছায়া পড়েছে রাস্তায়। দীপ মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে মণির মুখের দিকে। চামড়া ছড়ে গিয়ে লালচে আভা ফুটেছে আঘাতের জায়গায়।
”তোমার বাড়িতে ওষুধ আছে, মলম?”
”আছে।”
”গিয়েই লাগিয়ে দিয়ো।”
মণিদের বাড়ির বারান্দার কাছে দীপ থেমে গেল।
”আর যাব না।”
”কেন, এসো না।” মণি আন্তরিকভাবে বলল।
”মা’র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব, অবশ্য মা এখন ব্যস্ত থাকে। অন্তত চা খেয়ে যাও।”
”চা খাই না।” দীপের অস্বস্তি হচ্ছে। মণির মুখের দিকে তাকালে যে কেউ-ই বুঝে যাবে ও রাস্তায় পড়ে গেছল। মা নিশ্চয় ওকে বকবেন। তখন সামনে থাকলে বিশ্রী লাগবে।
বারান্দায় বেরিয়ে এলেন এক মহিলা। দীপ সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
স্কুল যাবার সময় দীপ রাস্তা থেকে যথাসাধ্য দেখবার চেষ্টা করল বারান্দাটা। কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে এসে গরাদের ফাঁক দিয়ে তাকাল।
”মণি।” প্রায় ফিসফিসিয়ে সে ডাকল।
”আসছি।” ঘরের ভিতর থেকে সাড়া এল।
মণি বেরিয়ে আসতেই সে উৎকণ্ঠিত হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল। আঘাতের জায়গাগুলোয় কিছু একটা লাগানো হয়েছে। তেলতেলা দেখাচ্ছে। চামড়া লাল হয়ে উঠেছে।
”মা কিছু বলেছেন?”
”বলবে না আবার! এবার একা বেরোন একদম বন্ধ।”
দীপের বুকটা ভারী হয়ে গেল। সে বিষণ্ণমনে মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
”তোমার তো কোনো দোষ নেই, আমিই তো ব্যাপারটা করলাম।”
দীপ ম্লান হেসে বলল, ”এখন কী করছ?”
”মা অঙ্ক দিয়ে গেছে। এত শক্ত লাগছে…একটাও বুঝতে পারছি না।
দীপের মুখ উৎসাহে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ”অঙ্ক! কী অঙ্ক? কই দেখাও তো।”
”ঐকিক নিয়মের।”
”এ তো খুব সোজা অঙ্ক। আচ্ছা তোমায় বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
দীপ সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে দিয়ে মণি প্রথমেই বলল, ”তোমার স্কুল আছে না?”
”রোজই তো যাই। আজ যাব না। একদিন না গেলে কিছু হবে না।”
