”আমি দৌড়চ্ছি, বডিটা কেমন কোমর থেকে সোজা রাখছি হাঁটু কতটা ভাঙছি, পায়ের পাতা কীভাবে পড়ছে, হাত দুটো কীভাবে রাখছি, মাথাটা কেমনভাবে রয়েছে, সব আগে লক্ষ্য করো, কেমন।”
পার্কটাকে তিন চক্কর দৌড়ে প্রশান্ত একাকী দৌড়তে বলল দীপকে। সুটকেসটা প্রশান্তর জিম্মায় রেখে জুতো খুলে সে যখন একা দৌড়তে আরম্ভ করল, বাচ্চচা ছেলেগুলি খেলা বন্ধ রেখে ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল।
এক চক্কর দিয়ে দীপ থেমে গেল।
”তোমার মতো হচ্ছে না জানি তবে প্র্যাকটিস করতে করতে হয়ে যাবে …কিছুটা হবে, তাই নয়।”
”কিন্তু আমি আর থাকতে পারব না, এবার যাব।”
”আর একবার।”
দীপ আবার দৌড় শুরু করল। এবার তার সঙ্গে বাচ্চচারাও নেমে পড়ল। তারা ওর প্রায় গা ঘেঁষে দৌড়চ্ছে আর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। দীপও হাসতে শুরু করল। সে মুখ ভ্যাংচাল, বাচ্চচারা জোরে হেসে উঠল। সে মজা পেল।
একটা সুখবোধ তার সারা অঙ্গে প্রবাহিত হয়ে তাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। সে অন্যদের মজা দিয়ে আনন্দ দিতে পারে, এটা সে আবিষ্কার করছে।
দীপ মাঝপথে দাঁড়িয়ে গেল। লেফট-রাইট করার ভঙ্গিতে সে পা ওঠানামা করতে লাগল। ওরাও তাকে নকল করল। সে জোরে হেসে উঠতেই ওরাও হাততালি দিয়ে উঠল। আবার সে দৌড় শুরু করল।
”ওরে ওরে দ্যাখ একটা বামন কেমন দৌড়চ্ছে।”
প্রশান্ত মুখ তুলে দেখল বারান্দায় একটি বউ দুহাতে একটি শিশুকে তুলে ধরে দেখাচ্ছে। আর একটি কমবয়সি বউ ছুটে বেরিয়ে এল ভিতর থেকে। প্রশান্তর চোয়ালদুটি শক্ত হয়ে উঠল। সে চিৎকার করল, ”দীপ, দীপ…থাম আর দৌড়তে হবে না।”
সুটকেসটা তুলে নিয়ে প্রশান্ত পার্কের ভাঙা রেলিংয়ের ফাঁক গলে রাস্তায় এসে হাঁটতে থাকল।
”রিভা দাঁড়াও, রিভা…”
হাঁফাতে হাঁফাতে দীপ ছুটে তার পাশে এল।
”একটু আস্তে হাঁটো…বারণ করলে কেন ছুটতে?”
”মজা দেখছিল বারান্দা থেকে।”
”দেখুক না, তাতে কি হয়েছে!”
”তোমার অপমান লাগে না?”
প্রশান্ত সুটকেসটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে পাশের রাস্তায় ঢুকল লম্বা পায়ে দীপকে পিছনে ফেলে।
”রিভা।”
দীপের ডাকটা আর্তনাদের মতো প্রশান্তর কানে ঠেকল। সে দাঁড়াল।
”না, আমার আর অপমান লাগে না, দুঃখও লাগে না। আমার এই শরীর আমিতো বানাইনি। ভগবান করে দিয়েছেন। অপমান যদি কারুর হয়তো তাঁরই হবে। আমি যেটা পারি…”
”কী পার?”
”মজা দিতে। ছোটবাবু হয়ে আনন্দ দিতে। আমি তাই করব, সারা জীবন।”
দীপ থরথর কাঁপছে একঝোঁকে কথাগুলো বলে। মুখটা লাল, গোল চোখদুটি আরও বড়ো হয়ে উঠেছে। টসটস ঘাম ঝরছে চিবুক থেকে।
”আমার এক দাদা ছিল তোমার মতো। চার ফুট চার ইঞ্চি। তোমার মতো ষোলো-সতেরো বয়সে বেলগাছিয়া রেলের লাইনে গলা দিয়ে আত্মহত্যা করে।”
প্রশান্তর মুখ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল কথাগুলো বলতে বলতে। দীপের চোখে বিষণ্ণতা নেমে এল।
”তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি দীপ।”
দীপ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে। এক চিলতে হাসি তার পাতলা গোলাপি ঠোঁটদুটিতে হালকাভাবে লেগে রয়েছে।
”আমার ওরকম কিছু হবে না।”
”ভালো।”
প্রশান্ত হনহনিয়ে চলে গেল। ওর দীর্ঘ সুঠাম দেহ-কাঠামোর দিকে যতক্ষণ পারল দীপ তাকিয়ে রইল। তারপর হাঁটতে শুরু করল বাড়ির দিকে, দীর্ঘ পথ।
উৎপলা বাস স্টপে অপেক্ষা করে করে বাড়ি ফিরে আসার প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর দীপ ফিরল।
”এত দেরি হল?”
”পকেটে যা ছিল পুওর ফান্ডের বাক্সে ফেলে দিয়েছি। খেয়ালই ছিল না যে সঙ্গে আর পয়সা নেই। বাসে ওঠার আগে পকেটে হাত দিয়েই চক্ষু চড়কগাছ …হেঁটে এলুম।”
”আর আমি এদিকে ভেবে ভেবে…”
”এত ভাববার কি আছে, আমি তো বড়ো হচ্ছি। চিরকালই কি পুতুপুতু করে আমাকে আগলাবে?”
উৎপলা বিপর্যস্ত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”কী করে তুই বড়ো হবি! বয়স বাড়লেই কি বড়ো হয়?”
দীপ কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল। অসম্ভব ক্লান্ত সে। খাটে গা এলিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম আপনা থেকেই ভেঙে যায়। ঘরে আলো জ্বলছে, জানলার বাইরে অন্ধকার। মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই দেখল রঞ্জনবাবু চেয়ারে বসে বই পড়ছেন।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে লজ্জিতস্বরে বলল, ”ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।”
রঞ্জনবাবু শুধু হাসলেন। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে দীপ বলল, ”এবার থেকে ভোরে আমি দৌড়ব।”
”চোখে জল দিয়ে এসো আর খেয়ে নাও, স্কুল থেকে ফিরে না খেয়েই তো ঘুমোচ্ছ।”
পরদিন ভোরে হাফ প্যান্ট, গেঞ্জি আর কেডস পরে দীপ যখন বেরোল তখন পুব আকাশ ছাই রঙ থেকে ফিরে হলুদে রূপান্তরিত হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে ছুটতে থাকল যেদিকে কাঁচা রাস্তাটা ঘন গাছপালার ফাঁকে মাটির ঘর, ঝিরঝিরে বাতাস আর মাটির গন্ধের লোভ দেখিয়ে ক্রমশ মাঠ পেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে। প্রশান্তকে যেমন দেখেছে চেষ্টা করল সেইভাবে দৌড়তে। লোক চলাচল শুরু হয়েছে। হাঁসের দল পুকুরে নেমে গেছে, মোরগের ডাক তখনও অব্যাহত, বাসনহাতে বউয়েরা পুকুরঘাট থেকে ফিরছে, ভ্যানরিকশায় আনাজের ঝুড়ির উপর বসা চাষি, সবাই তারা অবাক হয়ে তাকাল দীপের দিকে।
দম ফুরিয়ে হাঁফিয়ে পড়তেই সে দৌড় বন্ধ করে যখন হেঁটে ফিরে আসছে তখন মধুর এক বিস্ময়ের সামনে পড়ে গেল।
মণি দুই ক্রুচে ভর দিয়ে একটা পুকুরের ধারে পাঠশালার চালাঘরের পাশ থেকে আচমকা বেরিয়ে এল।
