”ভুল বলেননি।”
দীপ তাকিয়ে রইল মুখে তার একটা অভিমানী প্রশ্ন-আপনিও! রঞ্জনবাবুর সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না। তিনি ওর কাঁধে হাত রাখলেন।
”তুমি যে ছোটো মানুষ এটা অস্বীকার করে কোনো লাভ হবে না। এটাকে স্বীকার করো, মেনে নাও।”
”আমি মেনে নিয়েছি।”
”তোমার চারপাশে সবাই তোমার থেকে লম্বা এবং সেটা এই জগতের সঙ্গে মানানসই।”
”আমি বেমানান!”
”হ্যাঁ।”
”আমি তা জানি।”
রঞ্জনবাবুর মনে হল বয়সের তুলনায় দীপের অনুভব ও চেতনা কখনো কখনো প্রবীণত্বের স্তরে উঠে আসে। এই কিশোর ছেলেটি জানে সে বামন, সে দৈহিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাবে তার পরিবেশের সঙ্গে এবং এই জ্ঞানটুকু সে ইতিমধ্যে ধীরভাবে মেনে নিয়েছে। রঞ্জনবাবু কষ্ট পেলেন দীপের জন্য।
”তুমি কি জানো পৃথিবীটা শুধু উপরের দিকেই লম্বা নয় পাশের দিকেও চওড়া।”
দীপ একদৃষ্টে বৃদ্ধের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে কথাগুলোর মধ্যে কিছু একটা গূঢ় অর্থ লুকিয়ে আছে। অবশেষে সে বলল, ”আমি দৌড় প্র্যাকটিস করব।”
রঞ্জনবাবু এমন কোনো কথা আর বললেন না, যাতে দীপ নিরুৎসাহিত হয়।
”নিশ্চয় করবে। আমি তো বলব ভাবছিলাম তোমার ওজন কমানো দরকার, তুমি দৌড় শেখো।”
পরদিন স্কুলে টিফিনের সময় দোতলার বারান্দা থেকে রিভাকে উঠোনে দেখতে পেয়ে দীপ নেমে এল। দুটি ছেলের সঙ্গে রিভা কথা বলছে। নিশ্চয় কোনো হাসির ব্যাপার, কেননা তিনজনেই হাসছে।
দীপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইল, রিভাকে একা পাওয়ার জন্য। সেই সময় পিছন থেকে বিকৃতস্বরে চেঁচিয়ে ‘এই যে আমার ছোটবাবু’ বলে রবি তাকে জড়িয়ে ধরল।
আশপাশে প্রচুর ছেলে, তারা মুখ ফিরিয়ে তাকাল। হাসল।
”খিদে পেয়েছে, খাওয়া।”
”পয়সা নেই।”
”রোজই বলিস পয়সা নেই, দেখি তো।” রবি ওর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুচরো বার করে আনল। গুনে দেখে হাসল।
”হয়ে যাবে।”
”এগুলো আমার বাস ভাড়ার পয়সা।”
”এইটুকু তো রাস্তা, বাসে না গিয়ে আজ হেঁটে যাবি। মাঝে মাঝে হাঁটবি চর্বি ঝরে যাবে।”
রবি দু-হাতে ওর বুকের চর্বি খামচে ধরে মুখে অশ্লীল শব্দ করল। অনেকে হেসে উঠল। ওকে ছেড়ে দিয়ে স্কুলগেটের দিকে এগিয়ে গেল। টিফিনের সময় ছাত্রদের বাইরে যাওয়া নিষেধ যদি না টিফিন পাস থাকে। কিন্তু রবি যেকোনো সময়ই বাইরে যায় দারোয়ান কিছু বলে না।
দীপের চোখে জল এসে গেছে। হেঁটে বাড়ি ফেরার কথা ভেবে নয়। এত ছেলের সামনে এইভাবে হতমান হওয়ার লজ্জা লুকোতে সে ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
একটু পরে লক্ষ্য করল রিভা একা দাঁড়িয়ে দাঁত দিয়ে শাঁখালুর খোসা ছাড়াচ্ছে। গুটিগুটি দীপ এগোলো।
”সেদিন আমায় হাত দিয়ে টেনে বাসে তুলে না নিলে আমি পড়ে যেতুম।”
রিভা শাঁখালুতে কামড় দিয়ে এক চাকলা মুখে ভরে চিবোতে লাগল। দীপের কথার জবাব দিল না।
”তুমি ভালো ফুটবল খেল শুনেছি সেইজন্য কি তোমাকে রিভা বলে ডাকে? তোমার নিজের নাম কী?”
”প্রশান্ত। তোমাকে যে ছোটবাবু বলে ডাকল আসল নাম কী?”
”দীপাঞ্জন। আমি তোমাকে কিন্তু রিভাই ডাকব।”
”ডেকো। কিন্তু তোমাকে ছোটবাবু বলল কেন, চেনা?”
”আমাকে দেখে কি বুঝতে পারছ না?” একটু থেমে দীপ ফিকে হেসে আবার বলল, ”আমাকে দৌড়নো শিখিয়ে দেবে?”
প্রশান্তর মুখে কৌতূহল ফুটে উঠল। চিবোন বন্ধ করে বলল, ”মানে। দৌড়ে কি করবে?”
”দেখব আমার থেকে অন্যরা কতটা এগিয়ে থাকে।”
”হুমম। শুধু দেখার জন্যই।”
”হ্যাঁ, আমাকে দিয়ে আর কি হবে?”
”ছুটির পর এই সামনের চিলড্রেনস পার্কে এসো।”
চেনা কাউকে দেখতে পেয়ে প্রশান্ত হাত তুলে চেঁচিয়ে এগিয়ে গেল স্কুলবাড়ির মধ্যে। দীপও নিজের ক্লাসে এসে অঙ্কের খাতাটা খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে দিল। তার মাথায় এখন চিন্তা, হেঁটে বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। মা বাস স্টপে দাঁড়িয়ে থাকবে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে।
ওরা পার্কে এল একসঙ্গে। প্রশান্ত ছুটির পর অপেক্ষা করেছিল স্কুলের ফটকে। দীপ অন্য দিনের মতো আজও দেরি করে বেরিয়েছে।
”আমি ইচ্ছে করেই দেরি করি। ছুটির ঘণ্টা পড়লেই ছেলেদের মন-মেজাজ কেমন বদলে যায়, এটা কি তুমি লক্ষ্য করেছ?”
প্রশান্ত অবাকচোখে ওর দিকে তাকাল। তার মনে হল, এই বামনটি একটু বেশিই যেন মাথা খাটায় বয়সের অনুপাতে।
”সারা দুপুর স্কুলে যা একঘেয়ে লাগে। ছুটি হওয়া মানে যেন জেলখানা থেকে বেরোনো। তখন পেছনে লাগতে ওদের ভালো লাগে!”
”তোমার পেছনে লাগে দেখেছি।”
প্রশান্তর পাশাপাশি হাঁটার চেষ্টা করে দীপ প্রায় দৌড়চ্ছেই। প্রশান্ত হাঁটার গতি কমাল।
”ওদের খুব খিদে পায়, আমি বুঝতে পারি।” দীপ নরম স্বরে বলল। রবি বা তার সঙ্গীদের সম্পর্কে কোনো উষ্মা সে প্রকাশ করল না। দু-ধার দেখে প্রশান্তর সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে সে আবার বলল, ”আমি ওদের সঙ্গে ভাব করতে চাই…সকলের সঙ্গেই চাই। সেটাই উচিত, তাই নয়?”
প্রশান্ত জবাব দিল না। পার্কটা ছোটো। তিনদিকে বাড়ি দিয়ে ঘেরা। পার্কের ভিতরে কংক্রিটের রাস্তার পাড়। মুখোমুখি চারটি সিমেন্টের বেঞ্চের উপরে পাকা ছাদ। রেলিংয়ের অনেকখানি অংশ অন্তর্হিত।
পার্কটি এমনিতেই নিরিবিলি। বিকেল সবে শুরু হয়েছে তাই লোক এখন যৎসামান্য। তবে ফেরিওয়ালারা এসে গেছে। ছ’সাত বছরের কয়েকটি ছেলে চোর-পুলিশ খেলায় ব্যস্ত বেঞ্চগুলিকে ঘিরে। দীপের দিকে নজর পড়তেই ওরা থমকে তাকাল। নিজেদের মধ্যে চাপাস্বরে বলাবলি করল।
