কিন্তু কি অদ্ভুত দেখাচ্ছে এখন রমাকে। বসার ভঙ্গী, হাত নাড়ার ভঙ্গী, রমার সবকিছুর মধ্যেই বেশ ভারিক্কি ভাব। ওইটুকু মেয়েটা কেমন গিন্নী-গিন্নী চাল শিখে গেছে। একটা নাকছাবি থাকলে মানাতো ভাল। নাকের ঘাম এখনো ঝিকঝিক করছে। মুছতেও ভুলে গেছে। খাটে খুব মেয়েটা। দিনরাতই খাটে। সাধ-আহ্লাদগুলো বলে না। বোঝদার মেয়ে, সামলে সুমলে চলে। আজ মনটা ওর খুশি, তাই বোধ হয় ভুলে গেছে বাপের রোজগারের কথাটা। আহা ভুলে থাকি। কোন কালেই যেন ওকে দুর্দশার কথা না ভাবতে হয়। ওকে কেন, কাউকেই যেন না ভাবতে হয়। চিরটাকালইতো অনিশ্চিত ভাব নিয়ে ভয়ে ভয়ে কাটাতে হ’ল। এমন করে দিন কাটাতে কি ভাল লাগে। আজকের মত সহজ সুখ রোজ আসুক। ওদের হাসিখুশি মুখ দেখেও আনন্দ হয়।
-আজতো ইলিশ হচ্ছে, ও হপ্তায় পারিতো আনব।
-আবার পারি কেন?
-মাসটা কাটুক।
কান্না-কান্না গলায় সানু বলে উঠল।
-না, কালকেই আনো।
-থাম।
ধমক দিল রমা।
-বলা মাত্রই অমনি চাই। তোর ইস্কুলের মাইনে বাকি রয়েছে না?
সানু নয়, দিনেশও অপ্রতিভ বোধ করল। হাঁটুতে মুখ ঘষে ঘাম মুছে ফেলেছে রমা। ওর খুশি-খুশি ভাবটা নিমেষে মাধবীর মুখের মত হয়ে উঠেছে। বিশ্রি লাগছে এখন দিনেশের। একটু আগের মনের আনন্দটুকু মাটি করে দিল। সুখ কতটুকু থাকে জীবনে? দুঃখটাই যেন অনন্তকাল ধরে চলে আসছে। আর তাতেই জ্বলে পুড়ে ভাজাভাজা হয়ে শেষ হতে হবে।
কড়া নামাল রমা। চমৎকার গন্ধ বেরোচ্ছে ভাজা ইলিশের। সানু এখনই একটা খেতে চাইল। এখন খেলে ভাতের সঙ্গে পাবে না। তাইতেই সানু রাজী। গরম মাছটা হাতে লোফালুফি করতে করতে ঘরে চলে গেল।
দিনেশও উঠে পড়ল। মহিম এক পাত্রের খবর দিয়েছে। এখানে বিয়ে হলে অনেক সুবিধে। মাধবীকে রাজী করাতে হবে। সংসারের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। চিনু রোজগার করে মাছ এনেছে। দালালির কাজে পয়সা আছে। যদি লেগে থাকে তাহলে দু’পয়সা আসবে, সংসারটা দাঁড়াবে। মাছ-টাছ খাওয়াটা এখন বাবুগিরির সমান। চিনু বাড়ি নেই, মাধবীকেই বুঝিয়ে বলতে হবে।
মাধবী সেই একভাবেই শুয়ে আছে। আলো জ্বেলে টেবিলের কাছে দাঁড়াল দিনেশ। বইয়ের গাদার ওপরেরটা ওল্টাল একবার। শরৎ গ্রন্থাবলী। চোখ বোলাল। কতকগুলো অক্ষর শুধু, দু একটা নাম, দাঁড়ি কমা, প্যারা। বই বন্ধ করল দিনেশ।
-চিনুকে বোলো না মন দিয়ে লেগে পড়তে। কিছুইতো করে না, শুধু শুধু,-
-কিসে লাগবে?
মাধবী কাত হয়ে দিনেশের দিকে তাকাল। মুখোমুখি হয়ে দিনেশ চেয়ারে বসল।
-যাহোক একটা কিছুতো করতে হবে। যে কাজটা ধরেছে তাই বা মন্দ কি।
-কি কাজ ধরেছে?
-বাড়ি ভাড়ার দালালি!
আবার শুয়ে পড়ল মাধবী। রাগ ধরছে তার দিনেশের ওপর। মানুষটার এখনো বুদ্ধিশুদ্ধি হল না। বিশ্বাস করে নিয়েছে ব্যাপারটা। চিনু যে ধাতের ছেলে তাতে দালালি করা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে মনে একটু সন্দেহ পর্যন্ত ওঠেনি। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করাটা বোকামি। অনেকে ঠকিয়েছে তবু আক্কেল হয়নি। সন্দেহ থাকাটা খুব দরকার। ওতে মাথাকে সব সময় চালু রাখতে হয়। বুদ্ধিতে ধার পড়ে।
মাধবীকে চুপ করে থাকতে দেখে অস্বস্তি বোধ করে দিনেশ। বইটই বন্ধ করে তাড়াতাড়ি আর একটা বই খুলে ধরল চোখের সামনে। এখুনি মাধবীর মুখোমুখি হতে হবে আবার। দিশাহারা হলে চলবে না। মাধবী হয়তো রেগে উঠবে কিন্তু তাকে দাবিয়ে দিতে হবে। এতদিন ওর অনেক কথাই মানতে হয়েছে, সে শুধু চীৎকার অশান্তির ভয়ে। কিন্তু তাতে শান্তি আসেনি। মনের মধ্যে শুধু নিজের অভিযোগগুলোকে পুষে, গুমরে মরতে হয়েছে। জীবনে কৃতকার্য সবাই হয় না। আর কৃতকার্য কাকে বলে। টাকা-পয়সা, মান-সম্মান। লোকের ওইটেই ধারণা। আসলে খুব ভুল নয় ধারণাটা। সাধারণ জীবনে সুখ শান্তিটাকেই বড় বলে ধরা হয়। টাকা পয়সা না হলে সুখশান্তি আসে না। এটাকে যুক্তি, ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ করতে হয় না। নিজের সংসারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সম্মান দুর্লভ জিনিস। সুখী মানুষই সম্মানিত। সুখটা যে কি দুর্লভ বস্তু হয়ে উঠেছে এর থেকেই বোঝা যায়। একটু ভাল চাকরি পেলেই মানুষ সম্মানিত হয়ে পড়ছে।
মাধবী অসম্মান করে, দ্রুত বইয়ের পাতা ওল্টায় দিনেশ। হাত কাঁপছে। দেয়ালে শব্দ উঠল। টিকটিকি আরশুলা ধরেছে। আছড়াচ্ছে। মাধবী শুয়ে আছে চোখের ওপর হাত রেখে। পাঁজরার পাশ দুটো ফুলে ফুলে উঠছে নিশ্বাসের সঙ্গে। আরশুলাটার মতো ওকে আছড়ালে কেমন হয়।
দ্রুত পাতা ওল্টায় দিনেশ। মাধবী অসম্মান করে।
.দুটি মাত্র মাছের টুকরো। তাইতেই খুশি হল আশা। বিশ্ব মাছ ভালবাসে কিন্তু সংসারের যা হাল, কতদিনতো বিনা মাছেই খাওয়া সারতে হয়। মাছ একা বিশ্বই খায়, তবু টাকা পয়সার জন্য একটুকরো মাছও বাজার থেকে আনে না। ভাইয়ের প্রশংসা করার সময় আশার মুখের ভাব এমন হল যেন সে প্রশংসাই শুনছে। বিশ্বর গুণ যেন তার কৃতিত্বেই সম্ভব হয়েছে।
চুপ করে রমা শুনছিল। বিশ্ব টিউশনি থেকে এখনো ফিরেনি। উনুন কামাই যাচ্ছে। ফিরে আসছিল রমা, ওকে ডেকে আনল আশা সিঁড়ি থেকে।
-আসল খবরই তো দেওয়া হল না। বিশ্ব চাকরি পাচ্ছে জান।
ফ্যালফ্যাল করে রমা বুঝতে চেষ্টা করে প্রথমে। পায়ে পায়ে সে আবার ঘরে ঢোকে। আচমকা কথাটা বলেছে আশা। চাকরি মানেই টাকা, কতকগুলো দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি, একটু হাঁপছাড়া, সামান্য সাধ আহ্লাদ মেটান। একটা চাকরির সঙ্গে অনেক কিছু জড়িয়ে থাকে। হঠাৎ চাকরি পাওয়ার খবর আচমকাই মনে ধাক্কা দেয়। কেননা চাকরি আর মুড়ি-মুড়কি কেনা এক ব্যাপার নয়।
