”থাক না আমার হাতে।” দীপ অনুযোগ জানাল।
”উৎপলা কর্ণপাত না করে ওর কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে শুরু করল। বাড়িগুলো পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় এসেই দীপ সুটকেসটা চেপে ধরল।
”আমায় দাও। আমাকে তুমি বাচ্চচা ছেলে ভাব কেন?”
ওর কণ্ঠস্বরে জেদ আর চাপা রাগ ছিল। উৎপলা তাইতে অবাক হয়ে বলল, ”তুই তো বাচ্চচাই।”
”কত বাচ্চচা, সাত, আট, নয়? আমার হাইট তো ওদের থেকেও কম…চার, পাঁচ, ছয়? আমাকে কি অতোটাই বাচ্চচা ভাব? আমার বয়স তো এখন ষোলো, তাই না?
দীপ দাঁড়িয়ে পড়েছে। এরকম বিশ্রী মেজাজে উৎপলা ওকে আগে দেখেনি। তার মনে হল, নিশ্চয় কিছু একটা আজ হয়েছে। শান্ত গলায় প্রায় অনুনয়ের সুরে সে বলল, ”মায়ের কাছে ছেলে তো চিরকালই বাচ্চচা, এজন্য তুই অমনভাবে বলছিস কেন!”
কথা না বলে সুটকেস থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে দীপ বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে হাঁটতে শুরু করল উৎপলাকে পিছনে ফেলে। লম্বা পায়ে উৎপলা ওর পাশে পৌঁছে বলল, ”কেউ কিছু বলেছে তোকে?”
দীপ জবাব দিল না।
”বল না, কিছু কি হয়েছে?”
”স্কুলে স্পোর্টস হবে, নাম দিতে গেছলুম। নিল না।”
”কেন!”
”সমরবাবু বললেন বড়োদের সঙ্গে দৌড়ে আমি পারব না। আমি বললুম সবাই তো আমারই বয়সি, বড়ো আবার কে?…উনি বললেন, বয়সে নয় মাথায় বড়ো। ওদের এক পা নাকি আমার তিন পায়ের সমান, আমি হেরে যাবই তাই মিছিমিছি নেমে লাস্ট হয়ে কী লাভ!”
”ঠিকই তো বলেছেন উনি।”
দীপ মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল। ক্ষোভ জিজ্ঞাসা বিস্ময় মিলিয়ে অদ্ভুত হয়ে আছে মুখটা। ভিতরের অব্যক্ত এক যন্ত্রণায় গালের পেশি কুঁকড়ে রয়েছে, দুই চোখে অভিযোগ এবং ভর্ৎসনা।
”আমি পারব না?”
ছেলে কি বলতে চায়, ওর মনের মধ্যে কি জ্বলছে সেটা উৎপলা ধরতে পারল না। সান্ত্বনা দেবার মতো ভঙ্গিতে বলল, ”সব জায়গায় সব মানুষ কি পারে?”
”তাহলে আমি কোনোদিনই পারব না।”
দীপ সামনে তাকিয়ে আপনমনে কথাটা বলল কিছুটা হতাশ কিছুটা উদাসস্বরে। কাল্লুকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। দু-তিনটি কুকুর ধাঙড় বস্তির ভিতরে ঘোরাঘুরি করছে। এখানে খোলা আকাশ দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। একটা মুখপোড়া ঘুড়ি টাঙ্কির টানে আকাশে লাফাচ্ছে। দীপের চোখ ঘুড়িতে আটকাল। অনুমান করতে চেষ্টা করল কোন ছাদ থেকে ওটাকে ওড়াচ্ছে।
ঘুড়ি ওড়াবার শখ তার খুবই কিন্তু উৎপলা এই একটি ব্যাপারে ছেলের প্রতি বাৎসল্য দেখাতে শত কান্নাকাটিতেও রাজি হয়নি। ছোটোবেলায় সে সামনের বাড়ির একটি যুবককে চোখের সামনে চারতলার ন্যাড়া ছাদ থেকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখেছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায় কিন্তু তার আগে শরীরের খিঁচুনি এবং ফাটা মাথার রক্তে মাখামাখি মুখটির দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছিল। এর পর বহু রাতে ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে উঠে সে বিছানায় বসে থেকেছে। ঘুড়ির প্রতি তার আতঙ্ক আজও কাটেনি।
হাঁটার গতি কমিয়ে দীপ ডানদিকে তাকাল। এখন তারা মণিদের গলিটার সামনে। গরাদগুলোর ফাঁক দিয়ে বারান্দার ওপারে কী আছে বোঝা গেল না। একটু ইতস্তত করে সে বলল, ”মা এক মিনিট, আমি আসছি।”
সে দৌড়ে বারান্দার কাছে গিয়ে দেখল কেউ নেই। আস্তে ডাকল, ”মণি।”
ঘরের ভিতর থেকে হালকা একটা খটখট শব্দ আসার জন্য সে কান পেতে রইল।
ঘরের পর্দা সরিয়ে মণি উঁকি দিতেই সে পকেট থেকে কাগজে মোড়া একটা ডেলা বার করে গরাদের ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে ধরল।
”কী ওটা?”
”দেখই না খুলে।”
মণি একপায়ে ভর দিয়ে ছোট্ট একটা লাফে বারান্দায় বেরিয়ে এল দেয়াল ধরে। চেয়ারের পিঠ, টেবল তারপর গরাদে পৌঁছে গেল দু-তিনটে লাফে। দীপের হাত থেকে নিয়ে কাগজ খুলেই সে চেঁচিয়ে উঠল, ”ইইইই হজমি! দারুণ, আমার খুব ভালো লাগে।”
”কাল তাহলে, আবার।”
দীপের মুখ ঝলমল করে উঠল। সে এক দৌড়ে অপেক্ষমাণ মায়ের কাছে ফিরে এল।
”এই মেয়েটিই?”
”হ্যাঁ।”
সন্ধ্যায় রঞ্জনবাবু পড়াতে আসেন। প্রায় সত্তরবছর বয়সি, ধীর স্বভাবের এই প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক যে-মমতায় ও যত্নে দীপকে গ্রহণ করেছেন তাতে কৃষ্ণচন্দ্র ও উৎপলা উভয়েই কৃতজ্ঞ। রঞ্জনবাবু পড়াতে শুরু করার পর থেকে স্কুল-পরীক্ষায় প্রথম চারজনের মধ্যে দীপ গত চার বছর ধরে রয়েছে। সে মেধাবী নয় কিন্তু পরিশ্রমী। এই বৃদ্ধের সে অত্যন্ত অনুগত, ওকে খুশি করার জন্য সে পরীক্ষার ফল ভালো করার দিকে যত্নবান। গৃহশিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক ধীরে ধীরে গড়ে উঠে দুজনকে আত্মিক ঘনিষ্ঠতার স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।
দীপ পড়তে বসেই তার আজকের অভিজ্ঞতার কথাটা বলল।
”ওরা মাথায় বড়ো বলে কি ওদের সঙ্গে আমি পারব না?”
রঞ্জনবাবু হাসিমুখে এতক্ষণ দীপের কথা শুনছিলেন, এবার গম্ভীর হলেন।
”তুমি দৌড়তে পার?”
”নিশ্চয়ই পারি।”
”পড়াশুনোর মতো দৌড়টাও শিখতে হয়, প্র্যাকটিস করে করে উন্নতি ঘটাতে হয়, তুমি কি কখনো তা করেছ?”
দীপ চুপ করে রইল।
”দৌড়তে তো সবাই পারে কিন্তু ওলিম্পিকে কি সবাই প্রথম হয়? যে হয় সে বছরের পর বছর কষ্ট করে ঘাম ঝরিয়ে দৌড় শিখে তবেই প্রথম হয়। স্কুলের মাস্টারমশায় ঠিকই তো বলেছেন।”
”উনি আমার হাইটের জন্য বলেছেন। ওরা একপা ফেলে যতটা যাবে আমি নাকি তিন পা ফেলে ততটা যাব।”
