অন্যদিনের তুলনায় আজ স্কুল থেকে ফিরতে দীপের দেরি হয়েছে। ওর মা উৎপলা উদ্বিগ্ন হয়ে সেবককে বাস স্টপে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য বলেছিল, ঠিক সেই সময়েই দীপ ফিরল। দৌড়ে আসার জন্য তখনও সে হাঁফাচ্ছে। মুখ লাল।
উৎপলা ওর মুখ-চোখের অবস্থা দেখে আরও উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল। পাড়ার লোকের, প্রতিবেশীদের, এমনকি বাড়ির সহ ভাড়াটেদের উত্যক্ত করার, যেটা কখনো কখনো অত্যাচারে পরিণত হত বা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্যই তারা এখানে বাড়ি করে উঠে এসেছে। অঞ্চলটা ফাঁকা ফাঁকা, এখনো অনেক জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। লোকজন বিশেষ করে দীপের বয়সিদের সংখ্যা কম।
ওকে সবথেকে বেশি জ্বালাতন করে সমবয়সিরাই। দীপ যেন অন্য গ্রহের জীব এইভাবে সবাই তাকায়, ওর পিছু নিয়ে দেহ সম্পর্কে অপমানকর মন্তব্য করতে করতে হাঁটে, কেউ কেউ ঢিলও মেরেছে। বহুদিন দীপ বাড়ি ফিরে কেঁদেছে, স্কুল যেতে চায়নি, অসুখের ভান করে শুয়ে থেকেছে। তিনবার স্কুল বদল করেছে, শুধু এইজন্যই।
কৃষ্ণচন্দ্র সকাল আটটায় বেরিয়ে দুপুরে খেতে আসে, আবার বিকেলে বেরিয়ে যায় এবং রাত্রে ফেরার কোনো ঠিক নেই। ব্যবসা খুব বড়ো নয় তাই পরিশ্রম প্রচুর। ছেলের সঙ্গে বাবার সারাদিনে অল্পক্ষণই দেখা হয়। দীপ বাড়ি থেকে বেরোতে চায় না, বাড়ির বাইরে গিয়ে খেলতে চায় না। তাই একসময় কৃষ্ণচন্দ্র খেলনা, রেডিয়ো আর ঘরে বসে খেলার জন্য দাবা, ক্যারম প্রভৃতি কিনে দিয়েছে। এছাড়া গল্পের বই আর ম্যাগাজিনে দীপের ঘর ভরা। উৎপলা ছেলেকে নিয়ে ঘরে বসে খেলত। কিন্তু একসময় তাও একঘেয়ে হয়ে যায়। দীপ ছাদে উঠত কিন্তু পাঁচিল তার মাথার উপরে। টুলে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বিকেল কাটাত। নিঃসঙ্গ থাকতে থাকতে সে স্বল্পবাক হয়ে গেছে। অপরিচিতদের দিকে সে সন্ধিগ্ধ চোখে তাকায়।
দীপ তাদের একমাত্র সন্তান। ওকে সুখে এবং নিরাপদে রাখার জন্য তাদের ব্যাকুলতা ও দুর্ভাবনা অপরিসীম। বহুদিন স্বামী-স্ত্রী কপালে হাত রেখে বিষণ্ণমুখে বসে থেকেছে নির্বাক হয়ে। কেন এমন হল, এই প্রশ্ন একসময় পরস্পরকে করত এখন আর করে না। উৎপলা জাগ্রত দেবদেবীর কথা শুনলেই ছুটে গেছে। হত্যে দিয়েছে মানত করেছে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ জায়গায়। কৃষ্ণচন্দ্র চেয়েছিল আর একটি সন্তান হোক। উৎপলা রাজি হয়নি। যদি দীপের মতোই বামন হয়। তার থেকেও মারাত্মক যদি সে স্বাভাবিক আকৃতির হয়? দীপের পক্ষে সেটা মর্মান্তিক হবে। উৎপলা বলেছিল, ”আমার একটিই ভালো। জানি না কী পাপ করেছিলাম যেজন্য ভগবান এমন শাস্তি দিলেন!”
দীপকে লম্বা করার জন্য চার-পাঁচজন ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। কিছুদিন ইঞ্জেকশন, ট্যাবলেট, অর্থব্যয় ছাড়া কোনো ফললাভ হয়নি। ওরা এখন মেনেই নিয়েছে দীপ এরকমই থাকবে। এক ডাক্তার বলেছিলেন, ইউরোপে হিউম্যানগ্রোথ হরমোন ইঞ্জেকশন করে চিকিৎসা শুরু হয়েছে। এই হরমোন সদ্যমৃত মানুষের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে সংগ্রহ করা হয়। টানা দু’বছর চিকিৎসা করতে দরকার পঞ্চাশ থেকে একশোটা পিটুইটারি গ্রন্থি যেগুলো সংগ্রহ করতে হয় মানুষের মস্তিষ্ক থেকে। এই চিকিৎসায় দেখা গেছে বছরে উচ্চচতা বাড়ে দুই থেকে ছয় ইঞ্চি।
শুনে ওরা একসঙ্গে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠেছিল ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তারবাবুর পরের কথাটিতে ওরা ঢোঁক গিলে চুপ করে বসে থাকে।
”এই হরমোন কিনে চিকিৎসা করতে বছরে খরচ পড়ে ছ’লাখ টাকার মতো।”
”আজ আমাকে কাল্লু তাড়া করে কামড়ে দিচ্ছিল।” দীপ উত্তেজিতস্বরে বলল বাড়ির মধ্যে ঢুকেই।
”কে কাল্লু?” উৎপলা অবাক হয়ে দীপের জুতোর ফিতে খোলা বন্ধ রেখে তাকিয়ে থাকে।
”একটা কুকুর, ওই মোড়ে বসে থাকে আর সবাইকে কামড়াতে যায়, বড়োদেরও।”
”কী সর্বনাশ! তুই কী করলি?”
”একটা মেয়ে আমায় বাঁচিয়ে দিল।”
উৎপলা প্রশ্ন করে জেনে নিল কিভাবে সে বাঁচাল। এক সময় মন্তব্য করল, ”মেয়েটি খুব ভালো তো!” তারপর বলল, ”কাল থেকে আমি বাস স্টপে থাকব, সঙ্গে করে নিয়ে আসব।”
রাতে মশারি গুঁজে দিচ্ছিল উৎপলা। তখন দীপ ফিসফিস করে বলল, ”আমার জন্য কালিকাপুরে পুজো দিতে যাবে বলেছিলে, কই গেলে না তো?”
উৎপলার মনে পড়ল দিন সাতেক আগে এক সকালে ঠিকে ঝি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, কালিকাপুরে শিব ও কালীর জোড়া মন্দির আছে। ওখানে মানত করে, হত্যে দিয়ে অনেকের অনেক মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। উৎপলা বলেছিল তাকে একবার নিয়ে যেতে। দীপ যে কথাগুলো তার ঘর থেকে শুনেছে তা জানত না।
”যাব।”
”তাহলে মণির জন্যও পুজো দিয়ো। কাল্লুকে মেরে ফেলতে ও বারণ করেছে, মনটা ওর খুব নরম।”
উৎপলা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল আলো নিবিয়ে দীপ ডাকল।
”দশটা টাকা দেবে।”
”কেন? ইদানীং প্রায়ই তুই পাঁচ-দশ টাকা নিচ্ছিস।”
”এমনি।”
”এইটুকু ছেলের এমনি এমনি টাকার দরকার হয়?”
”খাওয়াব।”
”কাকে?”
দীপ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ”বন্ধুদের। ওরা আমাকে খুব হেল্প করে।”
”আচ্ছা।”
উৎপলা চলে যাবার পর চিত হয়ে বুকের উপর দুই হাত রেখে দীপ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় যখন ঘুমিয়ে পড়ল দুই চোখের কোল তখন ভিজে।
পরদিন দীপ বাস থেকে নামতেই উৎপলা তার হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে নিল।
