”বাইরে যাও না? যেতে তো পার?”
”যাই, ওই রাস্তা পর্যন্ত। আর বেশি গিয়ে কী হবে, এখানে আমার সমবয়সিতো কেউ নেই।”
মণি হাসল। করুণ বিমর্ষ হাসি। দেখে ও দুঃখবোধ করল।
”স্কুলে যাও না?”
মণি মাথা নাড়ল।
”এখানে ধারেকাছে কোনো স্কুল নেই আর বাসে চেপে দূরে কোথাও…”
টেবলে হেলিয়ে রাখা দুটো ক্রাচের দিকে তাকিয়ে মণি মাথা নাড়ল।
দুজনে আর কথা বলল না কিছুক্ষণ। ও মেঝের দিকে তাকিয়ে আর মণি গরাদের বাইরে তাকিয়ে।
”আমারও বাসে খুব অসুবিধা হয়। ধরে দাঁড়াবার মতো কিছুতো হাতে পাই না।”
মণির সঙ্গে একটা ব্যাপারে নিজেকে সমান করে কৃতজ্ঞতা জানাতে পেরে ও স্বস্তি পেল।
”কুকুরটা মারাত্মক ফেরোসাস, ওকে মেরে ফেলা উচিত। অনেককে কামড়েছে।”
”না না, মেরে ফেলা ভালো নয়। জীবজন্তুকে মারতে নেই।”
মণির স্বরের কোমলতা, ভঙ্গির আন্তরিকতা ওকে অপ্রতিভ করল।
”যদি আমাকে কামড়াতো তাহলেও এই কথা বলতে?”
মণি চুপ করে রইল। তাইতে ও একটু দমে গেল। এমন কিছু বলা ঠিক হবে না যাতে মণি বিব্রত হতে পারে।
”তুমি গান করো?”
মণি ওর মুখের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর হাসি ছড়িয়ে বলল, ”তানপুরাটা আমার নয়, মায়ের। তবে এখন আমিই শিখি। মা রেডিয়োয় গাইত। বাবাও গাইত, রেডিয়ো অফিসে ওদের প্রথম আলাপ।”
”কী নাম মায়ের?”
”রেবা দত্ত। অবশ্য খুব একটা নামী গাইয়ে ছিল না। বাবা মারা গেছে আট বছর। মাকে একবারের জন্য গুনগুনও করতে শুনিনি এই আট বছর।”
”কী গান গাইতেন?”
”কীর্তন। আর মাঝেমাঝে গাইতেন রবীন্দ্র-সংগীত।”
”আর তুমি?”
”মাস্টারমশায়ের কাছে এখন খেয়াল শিখছি।”
”পড়াশুনো কর না?”
”পড়ি, রাত্রে মা’র কাছে।”
”মা কোথায়?”
”অফিসে। বাবার অফিসেই চাকরি পেয়েছে। আসতে সন্ধে হয়ে যায়, ট্রেনে যা ভিড়।”
”ট্রেন!”
”শ্যামনগরে হনুমান জুট মিলের অফিসে মা কাজ করে। ওদের কোয়ার্টার আছে, মা চেষ্টা করছে পাবার জন্য।”
ওরা আবার কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইল। নির্জন নিস্তব্ধ এই এলাকাটা। কোথা থেকে ঘুঘুর ডাক ভেসে আসছে। একটা শালিক বারান্দার গরাদের ফাঁকে খুব কাছেই উড়ে এসে বসল। দুজনে শালিকটার দিকে তাকিয়ে হাসল।
”একটা শালিক দেখতে নেই।”
”ধারেকাছে ওর জোড়াটা নিশ্চয় আছে। রোজ আসে এই টেবলে এঁটোকাঁটা খেতে।”
”আমি এবার যাব।”
”মা ভাববেন?”
”হ্যাঁ।”
”আর কে কে আছেন?”
”বাবা।”
বলেই সে পাংশু হয়ে গেল। বাবা থাকাটা তার কাছে এই মুহূর্তে অস্বস্তিকর লাগল।
”আর কে আছে ভাই, বোন, ঠাকুমা?”
”না, আর কেউ নেই। বাবা মা আর সেবক আমাদের চাকর। তোমার কেউ নেই?”
”আছে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, কাকারা। ওরা আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি, ওদের অমতে বাবা বিয়ে করেছিল তো।”
”আমার জ্যাঠা জয়পুরে থাকেন। কাকা আছে মিলিটারিতে, মেজর।”
”বাবা কী করেন?”
”ডেকরেটিংয়ের ব্যবসা। সিমলেয় দোকান। জানো, কোথায় সিমলে?”
মণি মাথা নাড়ল।
”আমি কিচ্ছু চিনি না। আগে থাকতাম টালায়। সেখানেও বাড়ি থেকে বেরোতাম না।”
”তোমার কী হয়েছে?”
”ডান পা-টায় পোলিয়ো, চার বছর বয়স থেকে। একদম সরু কাঠির মতো।”
”ডাক্তার দেখাও না?”
মণি ম্লানভাবে হাসল। ও তীক্ষ্নদৃষ্টিতে মণির মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ”আমাকেও অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে, ওষুধ, ইঞ্জেকশন অনেক নিয়েছি।”
”মা রোজ রাতে আমাকে মালিশ করে দেয়। কিছুই হয়নি, তবু মা হাল ছাড়েনি।”
”আমারও কিছু হয়নি।”
ও উঠে দাঁড়াল। সুটকেসটা মেঝে থেকে তুলল। মণি ক্রাচ দুটো বগলে লাগিয়ে দু’পা গিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, ”ওই দ্যাখো ওই দ্যাখো জোড়াটা।”
পাশের বাড়ির কার্নিসে পাশাপাশি দুটো শালিক। ও বলল, ”এদুটোই কি রোজ খেতে আসে?”
মণি নিশ্চিত-ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। দরজার খিল খুলে সে বলল, ”চলো, রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিই।”
”কি দরকার?”
”কুকুরগুলো যদি কাছাকাছি থাকে?”
ও মেনে নিল। রাস্তায় এসে দেখল কোথাও কুকুরদের চিহ্নও নেই।
”মিনিটখানেক গিয়ে রাস্তাটা ডানদিকে যেখানে বেঁকেছে সেখানে একটা লাইটপোস্ট, তার পাশ দিয়ে সরু একটা ইঁট বাঁধানো রাস্তা, একটু এগোলেই বাঁদিকে আমাদের একতলা বাড়ি। তুমি আসবে?”
”আমি একা, কি করে যাব বাড়ি ফেলে রেখে। তুমিই বরং আবার এসো…তোমার নাম এখনও জানা হল না।”
”দীপাঞ্জন, ডাকনাম দীপ। তোমার ভালো নাম কী?”
”রতনমণি।”
”বাঃ, নামটা তো তোমার সুন্দর। কে রেখেছে?”
”আমার বাবা।”
”এবার আসি, কেমন?”
দীপ কয়েক পা গিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখল মণি তার দিকে তাকিয়ে। কী ভেবে সে ফিরে এল।
”তোমাকে আমি একটা কথা বলব, হাসবে না?”
”না।”
”ঠিক বলছ?”
মণি মাথা কাত করল।
”তোমার সঙ্গে আমার অনেক মিল রয়েছে।” এই বলেই সে ছুটতে শুরু করল বাড়ির দিকে। ঝাঁকড়া চুল আর চার ফুট উচ্চচতার বামন ছেলেটির চর্বিভরা থপথপে দেহ নিয়ে অদ্ভুত দৌড় দেখতে দেখতে মণির মুখ একটা চাপা আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দীপ কিন্তু একবারও পিছু ফিরে তাকাল না।
বাড়ির সদর দরজায় কলিং বেলের বোতাম মেঝে থেকে চার ফুট উপরে। দীপের জন্য নানান ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে সে সমস্যায় না পড়ে। বাড়ির সব খিল, ছিটকানি, বিদ্যুতের সুইচবোর্ড, জলের কল, লেটার বক্স দীপ যাতে হাতের লাগালে প্রায় এমনভাবে লাগানো। চৌবাচ্চচার দেয়াল নিচু, খাবার টেবলে তার চেয়ারটি উঁচু এবং তাতে একটি ধাপ আছে পা রেখে উঠে বসার জন্য। দীপের জন্য আলাদা ঘর সেখানেও বাচ্চচাদের মতো ছোট্ট খাট। চেয়ার, টেবল, আলমারি তো বটেই জানলাও নিচু। বস্তুত একতলা এই বাড়ির মধ্যেই যেন আর একটা বাড়ি। বাড়ির সকলেরই উচ্চচতা স্বাভাবিক শুধু একজনের ছাড়া।
