দ্রুতপায়ে সে কুকুরটিকে পেরিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করল ওর চোখ তার সুটকেসের উপর এবং শুনতে পেল চাপা একটা গরগরানি। এরপরই সে ছুটতে শুরু করল বাড়ির দিকে।
পিছনে কয়েকবার ক্রুব্ধ ডাক এবং রাস্তার ইটের উপর নখের আঁচড়ের শব্দ থেকে সে বুঝে গেল কাল্লু তার দিকে ছুটে আসছে। সে ডানদিকে দুটো বাড়ির মাঝখানে ঘাসের সরু পথ দেখে ঢুকে পড়ল এবং কয়েক মিটার যেতে-না-যেতেই প্রায় পায়ের কাছে কাল্লুর মাথা দেখতে পেয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একতলায় লোহার গরাদ ঘেরা একটা বারান্দা, সে গরাদে পিঠ লাগিয়ে প্রাণভয়ে বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল সুটকেসটা মুখের কাছে তুলে ধরে।
কাল্লু থমকে গেছে। কুঁজো হওয়া ঘাড়ের রোঁয়া ফুলে রয়েছে। উপরের পাটির দাঁতগুলো বেরিয়ে। ওর পিছনে খর্বাকৃতি আরও দুটো কুকুর এসে গেছে। তারা অবিরাম চিৎকার করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এগিয়েও আসছে।
ও দুধারে তাকিয়ে দেখল। গরাদে পিঠ ঘষড়ে ডানদিকে এক পা এক পা করে সরে যেতেই কাল্লু তার জুতোর কাছে দাঁত নিয়ে এগিয়ে এল। ‘না না না’। সে ভীত কান্না জড়ানো স্বরে কাতরে উঠে সুটকেসটা পায়ের কাছে নামিয়ে আনল।
”চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক, একদম নড়বে না।”
ঠিক তার পিছনে কে বলে উঠল কথাটা।
ও পলকের জন্য পিছনে তাকাল। মনে হল একটি মেয়ে।
গরাদের ফাঁক দিয়ে একটা ক্রাচ বেরিয়ে এল।
”এটা হাতে নাও আর সুটকেসটা আমায় দাও।”
একগাছি সোনার সরু চুড়িপরা হাত পিছন থেকে এগিয়ে এল। সে সুটকেসটা হাতে তুলে ক্রাচটা নিল।
”ওটা সামনের দিকে বাড়িয়ে ধর। কুকুরগুলো তাহলে ওটাকে কামড়াতে যাবে। আর তুমি সেই ফাঁকে আস্তে আস্তে ডানদিকে সরে এসো। দরজা খুলে দিচ্ছি, চট করে ঢুকে পড়বে।”
কথামতো সে কাঠের দণ্ডটি সামনে বাড়িয়ে ধরতেই কাল্লু একহাত পিছু হটেই হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে ক্রাচের ডগাটা কামড়ে ধরল। সে হ্যাঁচকা টানে সেটি ওর দাঁত থেকে ছাড়িয়ে নিয়েই পাগলের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে ডানদিকে পিছু হটতে হটতে খোলা দরজা পেয়েই ঢুকে পড়ে পাল্লা বন্ধ করে দিল।
হাঁফাচ্ছিল সে। শরীর থরথর করে কাঁপছে। কপাল থেকে চিবুক বেয়ে ঘাম টপটপ করে ঝরে পড়ছে। দরজার বন্ধ পাল্লা দু-হাতে চেপে ধরে সে বাইরে কুকুরদের চিৎকার শুনছে।
”আর ভয় নেই।”
ও ঘুরে দাঁড়াল। হাসিমুখে একটি মেয়ে তার থেকে পাঁচ-ছ হাত পিছনে দাঁড়িয়ে। পরনে খয়েরি ও হলুদ প্রিন্টের সালোয়ার আর ছোটো হাতা কামিজ। মাজা রং, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল, শীর্ণ এবং লম্বা। বাঁ বগলে একটা ক্রাচ। মুখটি ডিম্বাকৃতি, চোখের মণিদুটো ঝকঝকে এবং গাঢ়।
ক্রাচটা ফিরিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে ধরল। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে নিয়ে ডান বগলের নিচে রাখল।
”খিলটা লাগিয়ে দাও। কিছুক্ষণ চেঁচাবে তারপর চলে যাবে।”
খিলটা ধরে ও লাগাবার জন্য তুলে নাগাল পেল না। মুখ ঘুরিয়ে বিপন্নদৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটি দুই ক্রাচে ভর দিয়ে এগিয়ে এসে খিল লাগাল তার পিছুপিছু সে। বারান্দায় কাঠের ছোটো টেবল আর একটা চেয়ার। টেবলে খোলা একটা বই উপুড় করে রাখা।
”এখন একটু বসো।” মেয়েটি বারান্দার দিকে এগোল।
”এত কুকুর ডাকছে কেন রে মণি?
পাশের বাড়ির দোতলার এক মাঝবয়সি গৃহিণীর মুখ দেখা গেল।
বারান্দার গরাদের ধারে সরে এসে মেয়েটি মুখ তুলে বলল, ”তাড়া করেছিল।”
”কাকে?”
”আমার এক বন্ধুকে।”
মণি হাসল ওর দিকে তাকিয়ে। বন্ধু শব্দটি ব্যবহার করার জন্য যেন চোখদুটি অনুমোদন চাইছে। ও বাইরে তাকাল। কাল্লু হতাশ হয়ে তার দল নিয়ে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ ওর মনে হল সে এখন নিরাপদ এবং ধীরে ধীরে একটা হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বরফের মতো ভয়টা ভেঙে গিয়ে শরীরে যেন রোদ ছড়িয়ে যাচ্ছে।
”বসো এখন। একটু পরে যেয়ো।” বাধ্য ছেলের মতো ও চেয়ারে বসেই উঠে দাঁড়াল।
”না না, তুমি বসো, আমি মোড়া আনছি।” সে আবার বসল।
বারান্দার লাগোয়া ঘরটায় মেয়েটি ঢুকে গেল পর্দা সরিয়ে। ওর ক্রাচের খটখট শব্দে সে কান পেতে রইল। দু-হাতে যদি ক্রাচটা বগলের নিচে ধরে থাকতে হয় তাহলে মোড়াটা আনবে কী করে! চিন্তাটা তার মাথায় আসামাত্র সে উঠে দরজার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে ভিতরে তাকাল। মাঝারি আকারের ঘর। ছিমছাম, বাহুল্যবর্জিত। জানালাগুলিতে পর্দা, একটা কাচের আলমারি। তাতে বই আর পুতুল। দেয়ালে বড়ো আকারের হাস্যোজ্জ্বল যুবকের একটি ছবি টাঙানো। ছোটো টেবলে দেয়ালে হেলান দেওয়া গেরুয়া কাপড়ের খোলেভরা তানপুরা। মেঝেয় জলচৌকিতে লক্ষ্মীর পট। প্রথম নজরে এগুলিই তার চোখে পড়ল।
মণি খাটের তলা থেকে নিচু একটা মোড়া বার করে সেটাকে পা দিয়ে ঠেলেঠেলে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। ওকে দরজায় দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হাসল। ও এগিয়ে এসে মোড়াটা তুলে বারান্দায় এনে নিজে তাতে বসল। চেয়ারটা উঁচু, ওর মনে হল এজন্য মণির বসতে সুবিধা হবে।
”তোমাকে আমি অনেকদিন স্কুল থেকে ফিরতে দেখেছি…এই চেয়ারটায় বসলে রাস্তার খানিকটা দেখা যায় তো। তোমরা নতুন এখানে তাই না?”
”হ্যাঁ, জানুয়ারিতে এসেছি।”
”আমরা দু’বছর প্রায়। তোমাদের নিজেদের বাড়ি?” ও মাথা হেলাল।
”আমরা ভাড়া। শোবার ঘর আর এই বারান্দাটা এরমধ্যেই আমার ঘোরাফেরা, প্রায় বন্দিই বলতে পারো।”
