কিছুক্ষণ পর সিঁড়ির দু-ধাপ উপরে উঠে ভিড়ের মধ্য দিয়ে সে আড়চোখে দেখল বারো ক্লাসের সেই ফুটবলার যাকে স্কুলে সবাই ‘রিভা’ বলে ডাকে, পাদানিতে দাঁড়িয়ে শরীরটা বাইরে হেলিয়ে রাখা ডানহাতে রড ধরা বাঁ হাতে দুটো বই আর খাতা। ভিতরে এসে দাঁড়াবার মতো জায়গা রয়েছে কিন্তু ও ঝুলেই চলেছে। ওর মুখে অদ্ভুত একটা প্রসন্ন বীরত্বের আভা। রিভা এগারো ক্লাসে একবার ফেল করেছে। গতবারের উচ্চচমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। রিভা নামে খুব নামী একজন ফুটবলার আছে ইতালিতে। তারই নামে ওর এই নাম।
রিভা একবারের জন্যও বাসের ভিতরের দিকে তাকাচ্ছে না। সে অবশ্য চাইল একবার অন্তত তাকাক তাহলে চোখ দিয়ে হেসে কৃতজ্ঞতা জানাবে। লোকেদের চাপে এবং ঠেলায় সে ক্রমশ বাসের ভিতরে ঢুকে যেতে যেতে আবার ভয় পেল। ধরে দাঁড়াবার মতো কিছু একটা সে পাচ্ছে না। সিটের পিঠে বা মাথায় হাত রেখে দাঁড়ানো ছাড়া তার উপায় নেই। কিন্তু নিকটতম সিটের কাছে যাওয়াই এখন দুঃসাধ্য। বাস থামা বা যাত্রা শুরু করলেই পাশের লোকের গায়ে সে হেলে পড়ছে। দুটো পা ফাঁক করে কন্ডাক্টরদের মতো যে দাঁড়াবে তেমন জায়গাও নেই। মেয়েদের সিটের সামনে সে দাঁড়িয়েছিল। একজন নামবার সময় পিঠে চাপ পড়তেই সে হুমড়ি খেয়ে মাঝবয়সি এক মহিলার কোলের উপর পড়ল। তিনি ‘আঃ, বলে উঠেই তাকে ঠেলে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সে করুণমুখে মহিলার দিকে তাকিয়ে বোঝাতে চাইল, আমি নিরুপায়। মহিলা অবশ্যই বুঝলেন এবং মুখ জানালার দিকে ঘুরিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
বাস থেকে নামার সময় রিভা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। তাতে ও খুব খুশি হল। অনেকেই তাকে দেখে অনেকভাবে। হাসে কিন্তু সে তাতে দুঃখ পায়, লজ্জা পায় এমনকি রেগেও যায়। কিন্তু সে জানে তার দুঃখ, লজ্জা বা রাগ দিয়ে অন্যের কিছুই আসে যায় না। রিভার হাসিটার মধ্যে অন্য কিছু ছিল। সেটা যে কি তার ষোলো বছর বয়স দিয়ে সে বুঝতে পারছে না। বাবা-মা ছাড়া আর কারুর কাছ থেকে এমন স্নেহ-মাখানো যত্ন বা হাসি সে পায়নি।
বাস থেকে সে যেখানে থামল সেই অঞ্চলটা নতুন। বছর পনেরো আগে কলকাতার এদিকটা আধা-গ্রাম ছিল। ঝোপজঙ্গল-বাগান-ডোবা-টালির ঘর আর মাঝে মাঝে একতলা পাকা বাড়ি। ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট পাকা চওড়া রাস্তা বানিয়ে, মাটি ফেলে জমির উন্নতি করে খণ্ডে খণ্ডে বিক্রি করেছে নিলামে। বাস রাস্তার দু-ধারে বাড়ি উঠে গেছে। রাস্তা থেকে মিনিট পাঁচেক ভিতরে হাঁটলে পুরনো জীর্ণ পাকা বাড়ি, পুকুর, মন্দির, নারকেল বা কাঁঠাল গাছ দেখা যাবে।
বাস স্টপ থেকে গলিতে ঢুকে লোহার ফটকওয়ালা বাড়িটা এবং লাগোয়া আরও দুটি বাড়ি ছাড়ালেই অসমান, ভাঙা গর্তে-ভরা খোয়ার রাস্তা। ধাঙড়দের একটা বস্তি সেই রাস্তার শুরুতেই। বাঁয়ে এবং ডাইনে আরও দুটি রাস্তা চলে গেছে। সদ্য তৈরি হওয়া বা তৈরি হচ্ছে এমন কয়েকটা বাড়ি সেই রাস্তায়। এছাড়া পড়ে আছে কয়েকটা ফুটবল মাঠ হয়ে যাবার মতো শুকনো আর জলা জমি। ধাঙড়দের পোষা শুয়োর আর গোয়ালাদের মোষ প্রায় সারাক্ষণই এইসব জমিতে ঘুরে বেড়ায়, কখনো-বা রাস্তার উপরেও। এতে সে ভীত বা বিব্রত বোধ করে না।
তার একমাত্র ভয় ধাঙড় বস্তির কুকুরগুলোকে। সাত-আটটা থাকে ঠিক মোড়টায় যেখান থেকে তার বাড়ির দিকে যাওয়ার রাস্তাটা শুরু হয়েছে। ওর মধ্যে সবথেকে হিংস্র হৃষ্টপুষ্ট কালোটা যার দুই চোখের উপরে বাদামি ছোপ এবং কানদুটো খাড়া। ওরা কাল্লু বলে ডাকে। কাঁধে থলি বা হাতে ব্যাগ নিয়ে কাউকে দেখলেই কাল্লু ঘেউঘেউ করে তেড়ে যায়। কয়েকজনকে কামড়ে হাত-পায়ের মাংস তুলে নিয়েছে। পাড়ার লোকেরা কুকুরদের বিরুদ্ধে থানায় নালিশ করে ফল পায়নি। বস্তির লোকেরা দলবেঁধে পুলিশকে শাসিয়েছে, কুকুরদের গায়ে হাত দিলে ভদ্রবাবুদের এখানে বাস করতে দেবে না।
সুটকেস হাতে সে থমকে দাঁড়াল। দূর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে মোড়ের উপর কাল্লু হাত-পা ছড়িয়ে বসে। আর এগোবে কি এগোবে না ভাবতে ভাবতেই দেখল কাল্লু তার দিকে তাকিয়ে সম্ভবত বোঝার চেষ্টা করছে, লোকটা কে? ভয়ে তার গায়ে কাঁটা দিল।
একজন সাইকেলে তার পাশ দিয়ে এবং কাল্লুকে অতিক্রম করে সোজা চলে গেল। দুটি স্ত্রীলোক নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কাল্লুর প্রায় গা ঘেঁষেই হেঁটে এল। দেহটা মুচড়ে মুখ ঘুরিয়ে কোমরের কাছে দাঁত দিয়ে কামড়ে কামড়ে পোকা তোলায় কাল্লু ব্যস্ত। সে ভাবল এই সুযোগ, কুকুরটার এখন অন্যদিকে তাকাবার ফুরসত নেই। তাছাড়া ধুতি-পাঞ্জাবিপরা এক প্রৌঢ় তার পিছনদিক থেকে আসছে, তার সঙ্গে পাশে-পাশে হেঁটে গেলে কাল্লু হয়তো কিছু করবে না।
সে লোকটিকে ডানদিকে রেখে প্রায় গা ঘেঁষেই হাঁটতে লাগল। দু-তিনবার তার দিকে লোকটি তাকাল এবং হাসল। সে যে ভয় পেয়েছে এটা বুঝে গেছে লোকটি। সারা শরীরের স্নায়ু এবং পেশি টানটান। পা দুটি থরথর করছে, শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ, আড়চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে কাল্লুর কাছাকাছি এসে গেছে।
”কুকুরকে ভয় পাও বুঝি?” লোকটি বলল।
ও মাথাটা অল্প নাড়ল। গলা শুকিয়ে গেছে।
”ভয়ের কী, আমি আছি।”
তখনই কাল্লু মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই তার সঙ্গে চোখাচোখি হল। কুকুরটির চাহনিতে সে সন্দেহপরায়ণ সজাগতা দেখল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সুটকেস ধরা মুঠিটা শক্ত হয়ে গেল, মুখ থেকে অস্ফুটে একটা কাতর শব্দ বেরিয়ে এল।
